
।। ভূমিকা ।।
[বাংলা উপন্যাসের এরকম হিন্দি নামকরণের কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে যদি পুরোটা একটু ধৈর্য্য ধরে পড়া যায়। বস্তুত এর থেকে জুতসই নাম হয়তো আর দেওয়া যেতে পারত না। এখন গল্পটা কেন লেখা হল তার প্রেক্ষাপটটাও একটু খতিয়েও দেখা দরকার। আমি নিশ্চিত যে হয়তো এই একই সময়ে পৃথিবীর কোনো না কোনো মানুষ এ বিষয় নিয়ে ভাবছেন, লিখেও ফেলছেন বা ফেলবেন খুব শিগগিরি। কারণ বিষয়টা নিয়ে লেখা দরকার। যেসব অর্থনৈতিক ঘোটালা অহরহ ঘটেই চলেছে দেশজুড়ে দুনিয়াজুড়ে আমরা যেগুলোর ভুক্তভোগী হচ্ছি আর কিছু করার নেই বলে পাশ কাটিয়ে চলেও যাচ্ছি, অল্পদিনে বুকে খচখচানি নিয়ে ভুলেও যাচ্ছি সেসব, আমি আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি সেই 'ভুলে যাওয়া'গুলোর ওপরেই।
রাষ্ট্র 'এগুলো' আমাদের বেমালুম ভুলে যাওয়ার কথাই বলে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনের হাতিয়ার হিসেবে এইসব ভুলে যাওয়াগুলোকে ইচ্ছেমতো সুবিধেমতো কেচ্ছা বানায় বা ইস্যু বানায়! স্বাধীনতার পর থেকে এখন অবধি যে পরিমাণ আর্থিক দুনীর্তি হয়েছে তার সিকিভাগও জনতার পকেটে আর ফেরৎ আসেনি। এটাই বাস্তব! আর এখান থেকেই শুরু আমার গল্পের!
এই উপন্যাসের আলাদা করে কোনো পাত্র-পাত্রী নেই ইচ্ছে করেই করা হয়নি কারণ গোটা উপন্যাসটিকেই একটা 'চরিত্র' বানানোর সচেতন প্রচেষ্টা করে গেছি। টুকরো টুকরো চরিত্রের ছবি ফোটানোর চেষ্টা করেছি আর সেইগুলোর আর পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। তবে চরিত্রগুলোর সমন্বয়ে একটা গল্প বলার চেষ্টা করেছি। কোনো চরিত্রকে পূর্ণতা দেবারও চেষ্টা করিনি। এটা একটা সচেতন ভাবে করা নিরীক্ষা। বাকিটা আপনাদের ওপর। প্রতিবারের মতো এবারও মুখিয়ে থাকব প্রতিক্রিয়ার জন্য।]
"আপনি, আপনার স্বপক্ষে কিছু বলতে চান?"
"ধর্মাবতার আমি অনেককিছু বলতে চাই, আমরা সাধারণ মানুষেরা অনেকটাই বলতে চাই... আগে স্যার আগে আপনি বলুন আপনি আমাকে কতটা বলতে দেবেন? কতদূর বলতে দেবেন? রাষ্ট্র একজন সাধারণ নাগরিককে কতটা অবধি বলতে দেয়? আইন কতক্ষণ পর তার টুটি টিপে ধরতে পারে? এই ট্রায়াল কতযুগ ধরে আরো চলতে পারে? আমি সবটা বলার পর এই আদালত থেকে বেরিয়ে নিরাপদভাবে বাইরে দাঁড়ানো প্রিজন ভ্যানে উঠতে পারবো তো? সে গ্যারান্টি আপনি নিচ্ছেন তো? আপনি বলুন আমাকে এখানে স-অ-ব-টা বলতে দেওয়া হবে তো? নাকি তার আগেই ওই পক্ষের উকিলবাবু 'মহামান্য আদালতে...' বলে মাঝপথেই আমার বলা থামিয়ে দেবেন? আর স্যার আপনিও ঢোক গিলে আমার বক্তব্য খারিজ করে দেবেন? না না স্যার ঢোক গেলাটা দোষের না... ইন্ডিয়ান পেনাল কোড, যেটা বৃটিশদেরই তৈরী এই আদালতটার মতোই... সেখানে ঢোক গেলার কোনো ধারা নেই, শাস্তি নেই স্যার! ঢোক গেলাটা আমাদের একমাত্র সামাজিক অধিকার যা ওই পেনাল কোড বা সংবিধানের মতোই আজ অবধি সুরক্ষিত! আমরা, গোটা জাতিটা... একটা জগাখিচুড়ী অবস্থান, যার না আছে অস্তিত্ব, না আছে অবয়ব, না আছে স্বপ্ন... গোটা সমাজটাই যে 'ঢোক গিলে' বেঁচে আছি স্যার! হুজুর, বেঁচে আছি বলাটা হয়তো সবচেয়ে বড় মিথ্যে একটা - একটা পচা গলা লাশের মতো নিজেদেরকে বয়ে নিয়ে চলাকে, হিঁচড়ে নিয়ে চলাকেই আপাতত বেঁচে থাকা বলে!
আমি তাই কিছুই বলতে চাই না, স্যার আমাকে কিছু বলতে দেবেন না, আপনার কাজ সোজা করে দিলাম, বেশিবার ঢোক গিলতেও হবে না আমার জন্য, বরং আপনার সামনে রাখা কোর্ট অর্ডারের কাগজটাতে আপনার বক্তব্যে শিলমোহর লাগিয়ে দিন। হ্যাঁ স্যার, এমন কাজ আপনাকে করতে হয়েছে, করতে হচ্ছে, করতে হবে যদ্দিন আপনি ওই চেয়ারটাতে বসে থাকবেন - চশমা এঁটে, শামলা পড়ে, স্যার! আমি কিছু বলতে চাই না স্যার, আপনি বলুন বরং টিয়াপাখির মতো... রাষ্ট্রের মতো, সরকারের মতো, যন্ত্রের মতো..."
।। মহিম সরকার ।।
মহিম এতক্ষণ পর একটা সিগারেট ধরালো। আকাশটা কেমন থমকে রয়েছে। ভেতরের মিটিংটার মতো। আজও মিটিং-এ কোনো সিদ্ধান্তে পৌছনো গেল না। অথচ এই নিয়ে প্রায় চারবার হল মিটিংটা। দু'বার ম্যাডামের অফিসে, একবার দীঘার বনবাংলোয় আর আজ খোদ জগুদার ডেরায়। দু'তিনটে টান মারতে না মারতেই বিরজু পার্কিং লট থেকে গাড়ি বের করে নিয়ে এল। জগুদার ওখান থেকে বেরোনোর সময় রিসেপশন থেকে ইন্টারকমে ডেকে নিয়েছিল ওকে। না, গাড়ির ভেতরে সিগারেট খাওয়াটা আবার বিরজু পছন্দ করে না। ও ড্রাইভার হতে পারে কিন্তু মনেপ্রাণে এই গাড়িটার মালিক ও'ই।
গুপ্ত আর রহিম শেখকে এতক্ষণে সিনে দেখা গেল। ওরা অন্যখানে ছিল হয়তো, গাড়িতে নয়। শশব্যস্ত হয়ে গাড়ির কাছে চলে এল ওরা।
"স্যার, আপনি কিছু না বলেই বেরিয়ে এলেন?" রহিমের কুঞ্চিত মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।
একটু হাসি পেল মহিমের। তার নিজের মর্জির মালিক এখন সে আর নয়। বডিগার্ডদেরও খবর দিয়ে বেরোতে হবে। হায় কপাল! লাল রঙের মার্সিডিজের পেছনের দরজা খুলে দিল গুপ্ত। সিগারেটে শেষ টানটা দিয়ে মহিম উঠে পড়লো গাড়িতে। সামনে ওরা তিনজন। পেছনে মহিম। কালো কাঁচ উঠে গেল। এখন আর মহিমকে দেখা যাচ্ছে না। মহিম কিন্তু গাড়ির ভেতর দিয়ে গোটা আকাশটাকে দেখতে পারছে। জগুদার বিশাল কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে একটা ইউ টার্ন থেকে সোজা ফ্লাইওভারে উঠে পড়লো মহিমের গাড়ি।
কমপ্লেক্সটার নাম 'স্কাইরাইজ'। বাড়িটার নাম আর আসার সময় ইউ টার্ন নিয়েও জগুদা মাঝেমাঝেই রসিকতা করে। যদিও আজকের মিটিংটাতে কারুর মুখে কোনো হাসিই ছিল না। গুরুগম্ভীর একটা বাতাবরণে শুরু হয়েছে শেষও হয়েছে গোটা আলোচনাটা।
"শোন মহামহিম, স্কাইরাইজ-এ আসতে হলে কিম্বা বেরোতে হলে, তোকে ইউ টার্নটা নিতেই হবে ভাই! সে ডানদিক দিয়েই হোক আর বাঁদিক দিয়েই হোক!" চোখ টিপে গ্লেন ফিডিকে বরফ দিতে দিতে বলেছিল জগুদা একদিন, ওঁর অফিসের একতলার বিশাল চেম্বারে বসে।
"মানে ইউ টার্নটা মাস্ট, তাই বলছো তো?"
"রাইট, ইউ আর... তুমি তরতর করে আকাশে উঠবে আর ইউ টার্ন বা 'পাল্টি' মারার আর্টটা জানবে না, তা কি হয়।"
"হুঁ বুঝলাম, আর যদি ঝর ঝর করে আকাশ থেকে পড়তে হয়, তখন?"
"স্যার, এই যে আপনার মোবাইলদুটো টোটাল বারোটা কল, তেইশটা হোয়াটস্অ্যাপ আর ছ'টা মেসেজ এসেছে।"
রহিম হাত বাড়িয়ে মোবাইলগুলো পেছন দিকে মহিমের কাছে চালান করে দিল। জগুদার অফিসে মহিম মোবাইলগুলো আজকাল নিয়ে যায় না। মোবাইলগুলো নিতে নিতে একটু অস্বস্তিই লাগছিল মহিমের? প্রচুর স্বাধীনতা দেওয়া আছে ওর এইসব কাছের লোকগুলোকে। ওগুলো ওরই দেওয়া। মহিম সরকারের আজ আর নিজস্ব বলে কিসসু নেই। ওর সব গোপনীয় গতিবিধি আজ ওদের কাছে উজাড় করা। ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে গেছে। ফ্লাইওভারের ওপর থেকে নীচের পৃথিবীটা দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টিকে স্বাগত জানাতে কিছু রাস্তার ছেলে নেমে পড়েছে বাঁপাশের লেকটাতে। হুটোপাটি করে স্নান করছে কয়েকটা ন্যাংটো ছেলে। কি আনন্দ ওদের চোখেমুখে। কালো কাঁচের অন্তরাল থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারছে সেটা মহিম। সেই ছোট্টবেলায় কাদামাঠে বৃষ্টিতে চুপচুপে ভিজে ফুটবলে লাথালাথি করার অনুভূতি! আঃ কি অনাবিল আনন্দ। কি নিশ্চিন্তি!
আজ মহিম সরকারের মতো কিছু ধনকুরের গোটা দেশে হয়তো নেই। ওর সমস্ত সম্পদ দিয়ে যদি ওই সোঁদা মাটি লাগানো তাপ্পি দেওয়া ফুটবলটাকে আবার ফিরে পেত মহিম।
মোবাইলদুটোতে একবার চোখ বোলাতেই হল। বারোটার মধ্যে দশটাই হল সুরমা আর বিদিশার মিলিয়ে মিশিয়ে। দুটোর মধ্যে একটা অফিসের, অন্যটা অচেনা। হোয়াটস্অ্যাপ আর চেক করলো না মহিম। ওদেরই হবে। অসহ্য লাগে এই ন্যাকামোগুলো মহিমের! জানে একটা ইম্পর্টান্ট মিটিং-এ গেছে আজকে - তবুও!
"গান চালাবো স্যার?" বিরজু জিজ্ঞাসা করল, আলতো করে।
"হুঁ - তবে ভল্যুম কম"
"কোই লওটা দে মেরে, বিতে হুয়ে দিন..."
গানটা হুহু করে ঢুকে পড়েছিল মহিমের অন্দর মহলে, বুকের খাঁচায়।
গাড়ি গড়িয়ে নামছিল ফ্লাইওভার থেকে। নীচে, ডানদিকে দেখা যাচ্ছিল লম্বা বাড়িটা। 'সরোজিনী টাওয়ার্স'।
মহিম সরকারের বারো তলার বিশাল ইমারত। যার দশটা ফ্লোর জুড়ে মহিমের নানা ব্যবসার অফিসগুলো রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আর টপ ফ্লোর দুটো মিলিয়ে তার বিলাসবহুল ডুপ্লে। এই তিলে তিলে গড়া সাম্রাজ্য এমনই উদ্ধত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে তো?
মোবাইল ফোনে ফুটে উঠল সুরমার মুখ। ওর নামে 'সেভ' করা রিংটোন। বিরক্তিভরে কেটে দিল মহিম। গেট দিয়ে গাড়ি ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। পোর্টিকোতে গাড়ির দরজা খুলে দিল রহিম শেখ। সানগ্লাসটা চড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে লিফটের দিকে এগোল মহিম।
।। মাস্টার মশাই ।।
"আরে ত্যালডা এটু পড়তে তো দাও!"
বিরক্ত হয়ে কানু মাস্টারমশাই-এর দিকে তাকালো।
"মানে, ইসকা কেয়া মানে হোতা হ্যায় মাস্টারজি?"
"মানে দ্যাখতে পাও না! আরে, খোট্টা ভাই চট্টা হ্যায় কাহে? দেখতা নেহি পলাডাতে কতটা ত্যাল এহনো লাইগ্যা আসে? একটু তো সময় দাওন লাগবো ভাই, দ্যাখো এহনোও ক্যামন গড়াইতাসে শিশিডার ভিতর।"
কানু মুদিকে সবিস্তারে বোঝাচ্ছিলেন মাস্টারমশাই। তাঁর ধারনা তেলের পলাটা ঠিক যতক্ষণ ধরার দরকার ততক্ষণ ধরে না কানু। ধরলে পুরো তেলটাই তাঁর দু'শো মিলির কাচের বোতলে ঢুকে যায় - অনায়াসে।
"দেখুন মাস্টারজি, আপনাকে এতো ইজ্জৎ করি বলে, দুসরা কোয়ি হোতা তো সোজা রাস্তা দেখিয়ে দিতাম। এত ভিড় ভাড়মে এও টেম নাহি হমার!" কানু তেল শিশিতে দিয়ে অন্য কাস্টমারে মন দিল এবারে।
বিজয়ীর হাসি হেসে মাস্টারমশাই মুদিখানা থেকে বেরোলেন। বেরোনের সময় পেছন ফিরেই আলগোছে বললেন, "লিখা রাখো খো-ইসে কানুভাই"!
কাষ্টমারের ভিড়ে সেসব শোনার সময় নেই কানুর।
যাক্ বাবা নিশ্চিন্তে এ হপ্তাটা কাটিয়ে দেবেন হলধরবাবু। তিন পলা সরষের তেল, দু কেজি চাল, কিছুটা ডাল - বাড়িতে যা মশলা আর কাঁচা বাজার আছে তাতে সাত দশটা দিন কোনোরকমে চলে যাবে তাঁদের!
নিজেদের চার-চারটে পেট সঙ্গে ফাউ আরও একটা পেট। লক্ষণের ছেলে মনু। একরকম ভাইপোই বলা যেতে পারে।
বাজারের থলিটা বাঁহাতে ধরে নিয়ে ডানহাতে ছাতাটা খুলে ফেললেন হলধর। ছাতাটার ফুটোফাটা মিনতি শাড়ীর পাড় লাগিয়ে মেরামতি করে দিয়েছে বলে রক্ষে। নয়তো ছাতাটার আর নিজের হাল ঠিক একইরকম।
মনে মনে হাসলেন। কাঠফাটা রোদ্দুর পড়েছে বটে এ মরশুমে।
ছত্রধর সঙ্গে না থাকলে বেশ গলদঘর্ম হাল হতো তাঁর। হলধরের ছাতার নাম ছত্রধর। গিন্নীকে ছাত্রছাত্রী আর পাড়াপ্রতিবেশীদের রসিকতা করে বলেন, "আইডেন্টিক্যাল টুইন্স"। বলেন, "অর আর আমার কন্ডিশন একদম একই রকম বুঝলা না - অই তাই..."
"আমার ভাই হইল গিয়া কুঁদঘাটের নলিনীশঙ্কর বিদ্যামন্দিরের অঙ্কের টিচার হলধরবাবু।"
বাংলাদেশ থেকে তাড়া খেয়ে এসে নানাঘাটের জল খেয়ে আপাতত এখানেই থিতু হয়েছেন তিনি আর তাঁর পরিবার। আজাদগড় কলোনীতে এক কাঠা জমির ওপর টিন, অ্যাসবেসটাসের শেড দেওয়া তাঁর ঘর। তাঁর সাম্রাজ্য। কুমড়ো ফলে, পুঁইশাক লতিয়ে ওঠে সেই শেডের ওপর।
এক চিলতে বাগানের বিলাসিতা। তাতে শিউলি, টগর রোজ হেসে কথা বলে হলধরের সঙ্গে। দুটো বড় ঘর। একটা টানা বারান্দা। সেখানে ছাত্র পড়ান তিনি। রাত্রে মনু শোয় সেখানে তাঁরই সঙ্গে। মা-বাপ মরা ছেলেটাকে বড্ড ভালবাসেন তিনি। বুক দিয়ে আগলে রাখেন।
ছেলেটা বেশী মেধাবী। নিজের ছেলে আর মেয়েটার মতো গাড়ল নয়। বাবলু মানে বড় ছেলেটা এর মধ্যেই পড়াশুনো লাটে তুলে এক লেদ মেশিনের ফ্যাক্টরীতে মজদুরী করে। আর রত্না, তাও স্কুল ফাইনালটা দু'বারে পেরিয়েছে। কিন্তু যৌবনের কুহকে উড় উড়ু মন। ধীরে ধীরে বুঝতে অসুবিধা হয় না হলধরের যে মেয়ে পা বাড়িয়েই আছে। যতই উদাসীন হোন না কেন - পাশের পাড়ার একটা ছেলের সঙ্গে যে কিছু একটা ব্যাপার চলছে সেটা বুঝতে পারেন তিনি।
"উফফ্ - বড্ড রোদের তাত আজকে!"
প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছে নিলেন হলধর। মাষ্টারমশাই হলেও 'সাহেবী' পোশাক ছাড়েন নি। ধুতি, পাঞ্জাবী, ফতুয়া এসব পড়েন - কিন্তু স্কুলে যান শার্ট প্যান্ট পড়েই।
দুটো প্যান্ট আছে তাঁর। সাকুল্যে। সারা মাসে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়েন। মিনতি সপ্তাহান্তে কেচে দেয়, ইস্ত্রি করিয়ে দেয়। শার্ট বরঞ্চ হলধরের খান চারেক। প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে বাবলু এটা কিনে দিয়েছে। চোখে জল এসে গিয়েছিল যেদিন মিনতি ওকে বলল যে ছেলে তার জন্য 'শার্ট' কিনে নিয়ে এসেছে।
সাদার ওপর নীল কল্কার শার্টটা তাই ভারি পছন্দের হলধরের, আজও পড়ে আছেন। কলোনীর কাঁচা রাস্তা ধরলেন হলধর। আর মিনিট পাঁচেক। সুবর্ণদের বাড়িটা এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে।
সুবর্ণ মল্লিকও ছিন্নমূল। তবে করিৎকর্মা লোক। এখানে এসে কিসবের ব্যবসা ফেঁদে কলোনীতেই একটা পেল্লায় দোতালা, পাকা বাড়ি বানিয়েছে। বছর পাঁচেকের ছোট হলধরের থেকে। খুব সম্মান করে। আপদে, বিপদে ও'ই ভরসা। যদিও এক জায়গার লোক নন, হলধর পাবনা আর সুবর্ণ খোদ ঢাকার। তবুও এখন এক সূত্রে বাঁধা। সুবর্ণর বউ মায়াও খুব ভালো মেয়ে। মিনতির মতো এত খিটখিটে নয়। অবশ্য 'দুধে-ভাতে' আছে বলেই বোধহয় মেজাজটা ধরে রাখতে পেরেছে।
মিনতিকে কি-ই বা দিতে পেরেছেন তিনি। অকালেই বেচারী বুড়িয়ে গেল। নানা জায়গায় প্রায় ভিখিরির মতো 'দূর দূর, ছাই ছাই', শুনতে শুনতে মেয়েটা কেমন একটা হয়ে গেল। সামান্য কথা বললেই এখন ঠেস মেরে কথা বলে। অথচ কুড়ি বছর আগের মিনতি - ঠিক যেন লক্ষ্মী প্রতিমা!
সুবর্ণর বাড়ির পেছন দিকে একটা বড় আমগাছ। তার পরেই হলধরের জমিদারী! নিজের মনে হেসে নিলেন একটু হলধর। জমিদারিই বটে। তালুক বলা চলে। এককাটা দু' ছটাক জমি এর জন্যেও মিনতির একটা আড়াইভরির গয়না এখনো বন্ধক আছে! দু' বছরেও ছাড়াতে পারেন নি।
বাড়ির একদম কাছাকাছি এসেই চোয়াল শক্ত হল হলধরের। কঞ্চি, বাখারীর গেটের পাশেই সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছেলেটা! পল্টন, গায়ে চকরা বকরা জামা, চোঙা প্যান্ট, চোখে সানগ্লাস আর তার প্রায় গায়ে ঢলে ঢলে পড়ছে রত্না। হাসতে হাসতে প্রায় এ ওর গায়েই পড়ে যাচ্ছে!
ছিঃ ছিঃ ছিঃ - ভরদুপুরে একি বেহায়াপনা!
ওঁকে দেখেই সাইকেলে প্যাডেল দিয়ে পাশ দিয়ে হুস করে বেরিয়ে গেল ছোকরা। "মাস্টারমসাই ভালো আছেন তো?" 'স'-এর উচ্চারণটা কানে লাগল হলধরের। কিছু না বলে গেট খুলে ঢুকলেন হলধর।
"হারামজাদা, শুয়ার।" মুখ থেকে বেরিয়ে এল তাঁর।
"একদম বাজে কথা বলবে না ওর সম্পর্কে।" রত্না শুনতে পেয়েছে ওঁর কথা। অবাক হলেন হলধর।
"তোমার থেকে ওর অনেক মুরোদ! হুঁ!" ঘরের ভেতরে চলে গেল রত্না মুখঝামটা দিয়ে।
ছত্রধরকে বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে পড়লেন সাতান্ন বছরের হলধর। বারান্দার পাশে ছোট্ট একফালি রান্নাঘর। মিনতি সেখানে রান্না করছে। একটা কথা পর্যন্ত ব্যয় করলো না। বাজারের থলে চৌকাঠে রাখলেন হলধর। তার মানে সে'ও একই ভাব পোষণ করে হলধরের সম্বন্ধে।
'মুরোদ' জিনিসটা আদতে কি বড় জানতে ইচ্ছে হয় হলধরের। জামাকাপড় ছেড়ে গামছা পরে উঠোনের বাইরের কলঘরে যেতে যেতে হলধরের মনে হল 'মুরোদ'টা বোধহয় কাঁটাতারের ওপারেই জন্ম-জন্মান্তরের জন্য ছেড়ে এসেছেন তিনি।
"এই যে জমিদারবাবু, তোমার এই গুণধর ভাইপোর অন্যত্র ব্যবস্থা করো বুঝলে, আপনি খেতে ঠাঁই পায় না শঙ্করাকে ডাকে!"
মিনতি এখন একটা দজ্জাল মেয়েমানুষ।
ফ্যালফ্যাল করে হলধর চেয়ে রইলেন রান্নাঘর থেকে উঠোনে বেরিয়ে আসা মিনতির দিকে। ওর চোখমুখ রাগে ফুঁসছে।
"জানো, এই ছ্যামড়া আজ কি করসে।" কাঠ বাঙালে চেঁচিয়ে উঠল মিনতি।
(ক্রমশ)
প্রচ্ছদঃ নীল মজুমদার
