বগলে ভাঁজ করে রাখা খবরকাগজ দিয়ে বাতাসে হাওয়া করে ধনাইদা রকের ধুলো পরিষ্কার করে প্রথমে বসল। তারপর মুখভর্তি বিরক্তি নিয়ে বলল,
"এ: তোদের শহরে কী প্যাচপ্যাচে গরম। কোন ভদ্রলোকে থাকে?"
"ওরে বাবা, দুদিনের জন্যে দার্জিলিং বেড়িয়ে এসে এমন পোজ মারছো, যেন সুইজারল্যান্ডে থাকো।"
ন্যাপলার খোঁচাটা দিব্যি হজম করে ধনাইদা হাসছে।
"ছবির মতো সুন্দর শৈল শহর। ঠান্ডা, বরফ, পাইনগাছ, রঙিন বাড়ি, ট্রয় ট্রেন।"
"কথাটা টয় ট্রেন, ট্রয়-তে হেলেন থাকত।" ধনাইদার কথা শুনে টিপ্পনী কাটল সুজয়।
"পাহাড়ের বুকে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া কালো পিচ রাস্তা, তার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে খেলনা গাড়ি। অনেক নিচে সুতোর মত সরু রঙ্গিত নদী।"
"দেখো আবার সেই কবিতাটা ঝেঁপে দিও না - 'অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ, কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না'। কেলোর মুখের এই কথা কেড়ে নিল ধনাইদা। বলল,
"সত্যিই জিজ্ঞেস করেছিলাম, পাহাড় বিক্রি হয়? ওরা বলেছে হলে জানাবে।"
কীরকম একটা যেন ঘোরের মধ্যে আছে ওদের ধনাইদা। শরীর তার হরিতকি লেনের এঁদো গলির রকে বসে থাকলেও মন এখনও পড়ে আছে হিমালয়ের কোলে। মানুষটার এমন তিনশ ষাট ডিগ্রি পরিবর্তন ন্যাপলা, সুজয়, কেলো'র হজম হচ্ছে না। ধনাইদা দিনে দুপুরে কাঁচা কাঁচা গুল দেয়, তার কথায় একটু খোঁচা মারলেই বাপ বাপান্ত শুরু করে। উত্তেজনায় তখন তার মুখ দিয়ে ভুল ইংরিজির তুবড়ি ছোটে। রকে বসে বাকি সবাই ধনাইদার এই কর্মকাণ্ড উপভোগ করে। কিন্তু আজ কোনটাই সে করছে না। সব কিছুতেই সাধু সন্তের মতো নিস্পৃহ থেকে শুধু চওড়া ঠোঁটের হাসি হাসছে।
কয়েকটা বাচ্চা ছেলে গলিটার মধ্যে ইঁট সাজিয়ে উইকেট বানিয়ে ক্রিকেট খেলার তোড়জোড় করছিল। ন্যাপলা তাদের এক ধমক দিয়ে ভাগিয়ে দিল। সেই সময়েই সুজয়ের মাথায় আসে দুর্বুদ্ধিটা।
ধনাইদার দুর্বলতম জায়গা হচ্ছে সুলগ্নাদি। সুলগ্নাদি দেখতে ডানাকাটা পরী নয়, তবে রূপের আলগা চটক আছে। এই গলির শেষ বাড়িটার দোতলায় থাকে মা, বাবার সঙ্গে। মাস্টার্স পড়ে, রবীন্দ্রসংগীত গায় আর কালেভদ্রে বই আনতে যায় পাড়ার লাইব্রেরি থেকে। এই সুলগ্নাদিকে ধনাইদা ভালোবাসে। সুলগ্নাদি তাকে ভালোবাসে কিনা তা নিয়ে স্পষ্ট উত্তর কখনো পাওয়া যায়নি ধনাইদার কাছে। অবশ্য ন্যাপলাদের কাছে ধনাইদা সুলগ্নাদির টিকটিকি। কারণ সাতসকালে ঘুমচোখে সুলগ্নাদির বারান্দা থেকে পেপার কুড়নো থেকে শুরু করে রাতে তার শোবার ঘরের ল্যাম্প নেভানো, সব ঠোঁটস্থ ধনাইদার। সুলগ্নাদিকে নিয়ে কোন বেফাঁস কথা কখনো বরদাস্ত করে না সে।
ধনাইদাকে চাগিয়ে তুলে তাকে পাহাড়ের মোহভ্রষ্ট করতেই হবে। তাই বেফাঁস কথাটাই ইচ্ছে করে বলল সুজয়, "দাদা, সুলগ্নাদির নাভিতে আবার দার্জিলিঙের চাঁদ দেখতে পাওনি তো?"
রকে বসা সক্কলে ভেবেছিল সশব্দ বজ্রপাত হবে। কিন্তু কী আশ্চর্য। এবারও ঠোঁট ফাঁক করে হাসতে হাসতেই ধনাইদা শান্ত গলায় বলল,
"সুলগ্না ভালো মেয়ে, পাড়ার মেয়ে। কুকথা বলে মেয়েটাকে চোখের জল ফেলতে দিস না। পৃথিবীর সব মুক্তো তাহলে হারিয়ে যাবে।"
ধনাইদার মুখে এমন দার্শনিক টাইপ কথা শুনে ন্যাপলারা হতভম্ব। তাদের ঝুলিতে থাকা শেষ তুরুপের তাসটাও ব্যবহার করে ফেলেছে ওরা।
রমেন চাকলাদার দু ব্যাগ ভর্তি করে মাছ সবজি বাজার করে যাচ্ছিল গলি দিয়ে। ধনাইদাকে দেখে বলল, "ধনাই, আজ তেলাপিয়া আর পাঙাশ মাছ কিনলাম।"
যদিও তার মাছের ব্যাগে আছে অসময়ের ইলিশ, গলদা চিংড়ি আর দেশি ট্যাঙরা।
দার্জিলিং যাওয়ার আগে হলে ধনাইদা বলতো,
"কাউন্সিলর হয়ে কী সব নালা ডোবার মাছ খাচ্ছেন। ভেটকি, ইলিশ, গলদা খান।"
সেই কথা শুনে খ্যাক খ্যাক করে খানিক হাসতো রমেনদা। কিন্তু আজ ধনাইদা যথারীতি একটা নিস্পৃহ ভাব দেখালো।
"বেশ করেছেন। দুটো মাছেই শরীরে রক্ত হয়।"
এমন বেমানান কথা শুনে চোখ সরু করে কয়েক মুহূর্ত ধনাইদার দিকে তাকিয়ে চলে গেল কাউন্সিলর। ন্যাপলারা খুশি হলো। এই ধুরন্ধর চাকলাদারকে সমুচিত শিক্ষা দিয়েছে তাদের ধনাইদা। কিন্তু তাদের সঙ্গে এমন অচেনা ব্যবহার করছে কেন দাদা, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না ওরা।
এইসময় একগাল হেসে ধনাইদা ন্যাপলাকে জিজ্ঞেস করল,
"আমার হাসিটা কেমন লাগছে রে?"
এমন বেমক্কা প্রশ্নে ন্যাপলা এবার বেশ ভয় পেল। সে এতক্ষণ ধনাইদার সবচেয়ে কাছে বসেছিল। একটু সরে গেল। সেটা লক্ষ করেছে ধনাইদা। বলল, "ভয় পাস না। দাঁত বের করে হাসছি বলে ভাবিস না কামড়ে দেবো।"
তারপর আবার একটা আলটপকা প্রশ্ন করল ধনাইদা, "তোরা কোনদিন নেপালি বাচ্চা দেখেছিস?"
নেপালি বাচ্চা দেখা আর না দেখায় কী হবে বুঝতে পারে না কেলোরা। তবু দেখা যাক ধনাইদা কী বলতে চাইছে। সুজয় বলে, "আমাদের পাশের গলিতে যে ফ্ল্যাটবাড়িটা হয়েছে তার দারোয়ান তামাং এর বাচ্চাদের দেখেছি।"
"ওদের মা তো বাঙালি। ও দিয়ে হবে না। পাহাড়ের পিওর নেপালি বাচ্চা।"
"না আমরা দেখিনি।"
"দেখলে বুঝবি নির্মল হাসি কাকে বলে। যা জিজ্ঞেস করবি হাসবে। 'তোমার নাম কেয়া?' হাসছে। 'কোন ক্লাসে পড়তা হ্যায়?' আবার হাসি। 'কি খাতা হায়' উত্তর দেওয়ার আগে কান এঁটো করে হাসছে।
ধনাইদার বেপরোয়া হিন্দি শুনে ন্যাপলারা একটু স্বস্তি বোধ করছে। তাদের ধনাইদার ঘোর মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে কাটছে।
এইসময় আচমকা চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠল ধনাইদার। কেলো বিস্ময়ের দৃষ্টিতে বলল,
"এটা কি?"
"ভুবন ভোলানো হাসি। পাহাড়ের মেয়েদের থেকে রপ্ত করেছি।"
এসব কী করছে ধনাইদা। এনাফ এই এনাফ। সুজয় এবার বেশ রাগের সুরেই সরাসরি বলল,
"দ্যাখো ধনাইদা। আমরা ভুবন ত্রিভুবন কিছুই চাই না। আমরা চাই তোমার ঘাড় থেকে দার্জিলিঙ-এর ভূত নামুক। তুমি তোমার ফর্মে ফিরে এসো।"
"সেটি তো হচ্ছে না বৎস। ভুবন ভোলানো হাসিটা আমাকে যে হাসতেই হবে। হয়তো সারাজীবন।"
সেইসময় দেখা গেল গলি দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকছে সুলগ্নাদি। ন্যাপলাই প্রথম লক্ষ করেছে। কনুই দিয়ে ঠেলা মারল ধনাইদাকে। সুলগ্নাদিকে দেখে ধনাইদার এতক্ষণের রঙ ঢঙ অনেকটাই চোরা-লিক বেলুনের মতো চুপসে যাচ্ছে। সুলগ্নাদির হাসিমুখ আজ বেজার। রক থেকে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে ডাকল,
"ধনাইদা একটু এদিকে এসো না শিগগীর।"
ধনাইদা তখনো পুরোপুরি চুপসে যায়নি। দ্রুততার সঙ্গে সুলগ্নার কাছে গিয়ে সে চোখে মুখে ঢেউ খেলিয়ে হাসল পাহাড়ি রমনীর ভুবন ভোলানো হাসি। কিন্তু সমতলের মানুষ কি তার মর্ম বোঝে। সুলগ্নাও বুঝল না। সে ভুরু কুঁচকে বলল,
"ওরকম বোকার মতো হাসছ কেন?"
ধনাইদার ফানুস পুরোপুরি চুপসে গেল।
"তোমার বগল থেকে পেপারটা বের করো। কোণাটা ছেঁড়ো। কাগজের টুকরো দিয়ে আমার বাঁ কাঁধের নোংরাটা পরিষ্কার করে দাও।"
এখানে প্রেমিক তার প্রেমিকার কাছে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা এক আজ্ঞাবহ দাস যেন।
এই কর্মকান্ড যখন চলছে তখন 'ধনাই' 'ধনাই' ডাকতে ডাকতে হন্তদন্ত হয়ে কার্তিককাকু এলেন। একসময়ের বঙ্গশ্রী, অকৃতদার। ধনাইদাকে সুলগ্নাদির পাশে দেখে বললেন,
"রিমুর কাছে দাঁড়িয়ে কি করছিস?"
কেলো আর নিজেকে সামলাতে না পেরে বলেই ফেলল,
"কাকের গু মুছছে।"
"ওই করো হারামজাদা। কত উমেদারি করে হোটেলের একটা চাকরি দিয়ে পাঠালাম দার্জিলিঙে। উনি ওখানে গিয়ে মশারি টাঙিয়েছেন। কেন টাঙিয়েছেন? মশারির ছাদ না দেখলে নাকি ওনার ঘুম আসে না। দার্জিলিঙে মশারি! পাগল ভেবে সোজা ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।"
মুচকি হেসে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালো সুলগ্নাদি। ন্যাপলা, সুজয় আর কেলো শব্দ করে হাসছে। এই না হলে ধনাইদা। ওদিকে পাড়ার একটা ছেলের উপকার করার সুযোগ একটা ফালতু কারণে ফস্কে গেল বলে দাঁত কিড়মিড় করছেন কার্তিককাকু।
এসবের পরেও শেষ চেষ্টা একটা করবেই ধনাইদা। পাহাড় থেকে আনা অমূল্য সম্পদ ভুবনমোহিনী হাসি সে প্রয়োগ করল কার্তিককাকুর ওপর। কাকু বেশ কয়েকমুহূর্ত বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর একগাল হেসে জড়িয়ে ধরলেন ধনাইদাকে।
বললেন,
"তুই বড্ড ছেলেমানুষ।"
