প্রবন্ধ/নিবন্ধ

যৌবনের বিষবনে জীবনের মর্মলীন ব্যথা



সৌমিক কান্তি ঘোষ


কবি নজরুলকে ঠিক গতানুগতিক কবি প্রতিভায় ধরা যায় না। আত্মসত্তায় এক অমিত যৌবন শক্তি, অনন্ত প্রাণের নিরবধি প্রতিশ্রুতি, দুরন্ত দুর্মদ অথচ অন্তর-গহনে লীন এক নিভৃত-স্বতন্ত্র আঘাত-বঞ্চনা জারিত দেবতার সংযমের অপার ব্যক্তিসত্ত্বা। এক চির অশান্ত egoism, শব্দের অনিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলাহীনতা, উদ্দাম স্বেচ্ছামুক্তি অথচ ভাব সচেতনতায় দুর্লঙ্ঘ অভিমুখীনতায় তিনি চির 'উন্নত শির'।

কবি না লেখক তখনও পরিস্কার নয়, তার প্রথম গল্প সংকলন 'ব্যথার দান' (১৯২২) মূলত গদ্য কাব্য হিসাবে প্রসংশিত হলো পরে কল্লোল পত্রিকা এই সংকলনের গল্পগুলিকে তুলনা করে ফেললেন চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়ের 'উদভ্রান্ত প্রেম'- এর সঙ্গে। কিন্তু তাতে কি আদৌ গল্পগুলিকে কোনো পরিচিত রূপকল্পের আধারে ধরা গেল? এ মূল্যায়ন কি অতি সরলীকৃত না অন্যকিছু? এ প্রশ্নের উত্তরে নিরুত্তর অনেকেই। আসলে জগৎ ও জীবনের পরিধি বহুদূর অবধি প্রসারিত। নিবিড় অতীন্দ্রিয়তা, যা অবাস্তবও না অলৌকিকও না। তাকে ধরতে হয় ইন্দ্রিয় গ্রাহ্যতার অতিরিক্ত অনুভব - উপলব্ধির গভীরে, অপার দুঃখ-যন্ত্রনার আর্তি অথচ আনন্দ পিপাসায় উন্মুখ আর এভাবেই নজরুলের গল্পে চলে আসে নর-নারীর প্রণয় সমস্যার দেহ-মনোগত যৌন জটিলতা অথচ বস্তু ভারহীন এক স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ মদির ইন্দ্রিয় গ্রাহ্যতায় তা হয়ে ওঠে বাস্তব সম্ভাব্যতার নিরুচ্চার উপলব্ধি। তাই বেদৌরাকে দারা ভালোবেসেছিলো আকৈশোর। নবীন জীবনের ভরা-যৌবনের স্বপ্নে দিন কাটছিল তাদের। ঠিক এ সময়েই এলো বেদৌরার দাম্ভিক মামা - গরীব চাষার ছেলের হাতে কিছুতেই ছেড়ে দেবেনা বেদৌরাকে, ঐতিহ্যের আত্ম অহংকারে অন্ধ তিনি। বেদৌরাকে চলে যেতে হয় মাতুলালয়ে দারা ছুটে যায় যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু একি হলো বেদৌরা সেখানে সয়ফুল- মুলুকের মোহে আত্মসমর্পণ করলো।প্রবৃত্তির অমোঘ আকর্ষণ এড়াতে পারলো না বেদৌরা। কিন্তু এ আকর্ষণে তো চরিতার্থতা নেই। আছে একরাশ অতৃপ্তি। কিভাবে ফিরবে সে দারার কাছে। কুণ্ঠা আর আত্মধিক্কারে জর্জরিত বেদৌরা জীবনের সংকটজালে দিশাহীন। এদিকে দারা ফিরে এলো সাফল্য নিয়ে। বেদৌরা তার অপবিত্র শরীর ও মন নিয়ে আত্মসমর্পণ করলেও দারা তা গ্রহণ করতে পারে না তখনই। যদি কোনোদিন কুন্ঠাহীনভাবে সে বেদৌরাকে গ্রহণ করতে পারে তবেই সেদিন সে গ্রহণ করবে। এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে দারা পুনরায় ফিরে যায় যুদ্ধক্ষেত্রে। সয়ফুল-মুলুকও তার অনুগামী হয়। অনুশোচনার্ত সয়ফুল-মুলুককে দারা তার সঙ্গী করে নেয়। যুদ্ধে স্বদেশের জয় হয়। দারা যেন তার জীবনশূণ্যতার মধ্যে দিয়েই এই জয় হাসিল করে । সয়ফুল-মুলুকও ক্ষমা পায় দারার কাছে, বেদৌরাকেও গ্রহণ করে দারা। দেহের পবিত্রতা দূরে সরিয়ে মনের পবিত্রতার আলোকে উজ্জ্বল হয় দারা। এখানেই নজরুলের যুদ্ধোত্তর নৈতিক পরাভব। আবেগের নিবিড় প্রকাশ। বিদ্রোহী চেতনার উচ্ছ্বসিত রূপ। প্রেম ভাবনায় যৌনতার যে অবাধ উৎসার তা থেকে কবি সরে যাননি, একই সঙ্গে 'মানসী' থেকেই প্রেমের মূল হতে শরীরের পরিস্রবণ চলেছে নিরন্তর, ক্রমান্বয়ে।

গল্পের মূল ভাবে কবি যে তার জীবন দর্শনে মানুষের শরীরটাকে উপেক্ষা করেছেন তা নয় বরং প্রেমের মূলে শরীর আসঙ্গলিপ্সাকে ভালোবাসার বীক্ষায় কিংবা চেতনায় যন্ত্রণা বিদ্ধ করে তুললেন। তাই ফ্রয়েড - এলিস - মরগ্যান এর ভাবনার জগতে এই গল্প সাবলীলভাবে বিচরণ করেও লেখকের ব্যক্তি চেতনার প্রত্যক্ষ বিদ্রোহে রেখে যায় ফাগুনের উদাস বাতাসে মনের পবিত্রতার অনিকেত রূপটি।

আসলে 'ব্যথার দান'- এর গল্পগুলি মোটামুটি একই রকমের। বিষয় বিন্যাসে এগুলির মধ্যে বিরাট কোনো পার্থক্য নেই। 'রিক্তের বেদন' গল্পটিও অনেকটাই এক। স্থান কালের পরিমার্জনায় তা একটু স্বতন্ত্র হলেও মূল ভাবটিতে নতুনত্ব কিছু নেই। তবু এই গল্পগুলির অদ্ভুত অভিব্যক্তি কিংবা জীবন সংকটে যৌন উৎকন্ঠা এক বিশেষ মাত্রা নিয়ে আসে। প্রিয় যেখানে অনুপস্থিত প্রিয়ার ভোগলিপ্সা সেখানে লালসার আকার ধারণ করে। রোমান্টিকতার এই বাস্তব- বিমুখতা ছিন্নভিন্ন করে লেখককে । অথচ শরীরটাকে তিনি অন্যায়ভাবে উপেক্ষা করবেন তাও না। স্বাভাবিকভাবেই রোমান্টিক যন্ত্রণাবিদ্ধতা তার লেখার পরতে পরতে। ফলে গল্পে ফুটে ওঠে কবিতার রূপ। ভালোবাসার স্নিগ্ধতা; ভৈরবী রাগিণীর করুণ গাম্ভীর্য। তাই বলা যায় লেখকের নিরানন্দ জীবনে বেদনার জ্বালাময় বিপ্লব-বাসনাকে অতলস্পর্শী ব্যঞ্জনায় উন্মচিত করে 'ব্যথার দান'।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।