অভিনেতা হওয়ার আগে যে সব উদ্দীপক - কিন্তু প্রায়শই দুর্বোধ্য - কাজকর্ম করতে হয়েছিল, সেগুলোতে হাত দেওয়ার পর থেকেই আমি সেই দিনের স্বপ্ন দেখতাম, যেদিন আমি বিষয়টা যথেষ্ট বুঝে উঠতে পারব এবং আমার চেয়ে ছোটদের সঙ্গে তা ভাগ করে নিতে পারব - যারা কমবেশি আমার মতই দিশাহীন। গত চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে, আমার কাজের সঙ্গে জড়িত সবচেয়ে আনন্দময় ও শিক্ষামূলক সব অভিজ্ঞতা অনেকটাই এসেছে ছাত্রছাত্রীদের সাহচর্যে - বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, এমনকি ব্যক্তিগতভাবেও। আমি তাদের বিকাশে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছি, অনেক সময় সফল হইনি, কিন্তু কখনও আনন্দহীন ছিলাম না। স্বপ্নালু এবং প্রায়শই অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের কোন শ্রেণিকক্ষে অভিনয় বোঝানোর কাজ বছরের পর বছর ধরে আমার স্বভাবসিদ্ধ অধৈর্যতাকে কিছুটা হলেও সংযত করেছে। চলার পথে হয়তো আমি অনেক ভুল করেছি। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলতে পারি, অভিনয়ের ক্ষেত্রে কোন শিক্ষকের থেকে যতটা শিখেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি শিখেছি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কাজ করে।
মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের উদ্যোগে ১ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত জশন-এ-উর্দু অনুষ্ঠানে আমার আমন্ত্রণ শেষ মুহূর্তে প্রত্যাহার করা হয়। এই অনুষ্ঠানটির দিকে আমি অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। কারণ সেখানে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ ছিল। ৩১ জানুয়ারি রাতে আমাকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে আমার উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। কোনো কারণ দর্শানো হয়নি, ক্ষমা প্রার্থনা তো অনেক দূরের কথা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্পষ্টতই মনে করেছিল এই অপমান যথেষ্ট নয়। তাই কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মত তারা দর্শকদের জানাল যে আমি নাকি নিজেই সেখানে যেতে অস্বীকার করেছি।
এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে তারা এই সত্যটা বলার সাহস দেখায়নি যে আমি নাকি "দেশের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখি" (যদি গোপনে বলতাম, তবে বোধহয় সমস্যা হতো না)। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বরিষ্ঠ আধিকারিকের বক্তব্য বলে একথা জানা গেছে। তিনি যদি শুধু নির্দেশ মেনে কথা না বলে সত্যিই এমনটা বিশ্বাস করে থাকেন, তবে আমি সংশ্লিষ্ট ভদ্রলোককে চ্যালেঞ্জ করছি - আমার এমন একটি বক্তব্য তুলে ধরুন, যেখানে আমি আমার দেশকে হেয় করেছি।
নিশ্চয় যে আমি কখনও স্বঘোষিত 'বিশ্বগুরু'-র প্রশংসা করিনি। বরং তিনি যেভাবে নিজেকে পরিচালনা করেন, তার সমালোচনা করেছি। তাঁর আত্মমুগ্ধতা আমার বিরক্তির উদ্রেক করে। আর গত দশ বছরে তিনি যা করেছেন, তার কোন কিছুই আমাকে মুগ্ধ করতে পারেনি। শাসক গোষ্ঠীর বহু কাজের আমি আগেও সমালোচনা করেছি, এখনও করি। আমাদের দেশে নাগরিক বোধের অভাব ও অপরের প্রতি বিবেচনার ঘাটতি নিয়ে আমি বহুবার আক্ষেপ করেছি। আরও নানা বিষয়ে আমি সরব হয়েছি, কারণ এসব বিষয় আমার মত মানুষদের বিচলিত করে - ভাবায় আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি। এ কোন দেশ যেখানে ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের বছরের পর বছর বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়, কিন্তু দোষী সাব্যস্ত ধর্ষক ও খুনিদের জামিন পেতে কোন অসুবিধা হয় না; যেখানে গোরক্ষকদের অবাধে মানুষের ক্ষতি ও হত্যা করার সুযোগ দেওয়া হয়; যেখানে ইতিহাস নতুন করে লেখা হয়, পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু বদলে দেওয়া হয়; যেখানে বিজ্ঞানকে বিকৃত করা হয়; যেখানে একজন মুখ্যমন্ত্রী অনায়াসে 'মিঞাদের' হয়রান করার কথা বলতে পারেন। এই ঘৃণা আর কতদিন টিকিয়ে রাখা যাবে?
এটা সেই দেশ নয়, যেখানে আমি বড় হয়েছি এবং যাকে ভালোবাসতে শিখেছি। 'নীতি-পুলিশ' আর 'দ্বিচারিতা' পুরোদমে কাজে লাগানো হয়েছে, নজরদারিও চলছে। 'দু' মিনিটের ঘৃণা' এখন চব্বিশ ঘণ্টার ঘৃণায় পরিণত হয়েছে। জর্জ অরওয়েলের '১৯৮৪'-এর সঙ্গে এই পরিস্থিতির তুলনা করা কি খুব বাড়াবাড়ি হবে - যেখানে 'মহান নেতার' প্রশংসা না করাই রাষ্ট্রদ্রোহ বলে গণ্য হয়?

নাসিরুদ্দিন শাহ (প্রখ্যাত অভিনেতা)

(ভাষান্তরঃ গৌতম চক্রবর্তী)