সম্পদ ভাগ্নেকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছে। ইদানীং যাদের সঙ্গে মিশছে, তাদের কেউ সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করে না। সব রোখা মেজাজ, চোখা প্যাণ্ট, সামনের রঙিন চুল কপাল বেয়ে নেমে, চোখের উপর একটা ছাউনি দিয়েছে। প্রয়োজনে ঘাড়ের ঝাঁকিয়ে একপেশে করে দেয়। এ গেল সন্মুখ মস্তকের কেশদামের কথা। ঘাড় থেকে টিকি পর্যন্ত সদ্য গজিয়ে ওঠা চুল, ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় পশ্চাৎ মস্তিষ্কের আকৃতি। কানে দুল, হাতে বালা। গভীর রাতে বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ে বাইরে। দীপনও ওদের মতো হয়ে যাচ্ছে। ভোরে মা যখন শয্যা ত্যাগ করে, ছেলে তখন ঘুমাতে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই সকাল নটা/দশটায় তার ঘুম ভাঙে। সূর্যোদয়ের সৌন্দর্য, সকালের নরম রোদ ওদের কাছে আদিখ্যেতা। সকালের রোদ গায়ে লাগালে ভিটামিন 'D'-এর অভাব পূরণ হয় - শুনলে দীপন তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তোলে। সুলতা, ছেলেদের সুশিক্ষা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। তাতে, শুধু অশান্তিই বেড়েছে সংসারে। সুলতা ছেলেদের নিয়ে মাঝের পাড়ায় থাকে। ওদের বাড়ির পিছন দিয়ে অঞ্জনাখাল কচুগাছ, কচুরিপানা ও প্লাস্টিকের ফাঁক-ফোকড় দিয়ে শহরের ড্রেনের নোংরা জল ধীর গতিতে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঘোষপুকুরে। সম্পদ বোনের বাড়ির প্ল্যান করার সময় দেখেছিল জমির বেশির ভাগটায় খাল বুজিয়ে বাড়িয়ে নেওয়া। বোনের শ্বশুরমশাই বুদ্ধিমান ছিলেন। দখলের জমির কাগজপত্র বের করে নিজের নামে রেকর্ড করে নিয়েছিলেন। শহরের একটি জায়গায় কাগজপত্রে অঞ্জনার বিস্তার ৫২ ফুট থাকলেও ক্ষমতাবানের প্রাচীরের চাপে ১৮ ফুট দাঁড়িয়েছে। এই আঠারো ফুট এখন আট ফুটে দাঁড়িয়েছে। বিয়ের পর সুলতা এসে দেখেছে বর্ষার সময় শ্বশুরমশাই, শাশুড়িমাকে অঞ্জনাতে স্নান করতে, শীতের সবজিতে জল দিতে। শেষ জীবনে কত আফশোশ ছিল ডুব দিয়ে স্নান করতে না পারার জন্য। এখন অতিরিক্ত বৃষ্টিতে খালের জল নালা দিয়ে সবজি বাগানে উঠে এলে, সে সবজি ছেলেরা কেন, সুলতা নিজেও খায় না। ঠাকুর পুজোর ফুলটা তুলে আনে শুধু। ডেটল সাবানে পা, চপ্পল ধুয়ে ঘরে ওঠে।
সম্পদের ভগ্নিপতি ব্যাঙ্ক ম্যানেজার। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পোষ্টিং। সম্পদকেই, এদের লোকাল অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে হয়। বড়ো ছেলেটা আশানুরূপ রেজাল্ট না করলেও, বাধ্য। বিএসসি পাশ করে দুই বছর চাকরির চেষ্টা করে এলআইসি-র চাকরিতে সফলতা পেয়েছে। অপরদিকে যত দিন যাচ্ছে, দীপনের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। অসৎ সঙ্গে প'ড়ে, যা সব কাণ্ড করেছে কহতব্য নয়। আলমারি থেকে মায়ের গয়না অন্যদের হাতে তুলে দিয়েছে। হুবহু একই ডিজাইনের নকল গয়না আলমারির যথাস্থানে রাখলেও সুলতা ধরে ফেলে। চাপে পড়ে দীপন স্বীকারও করে। তখন সেভেনে পড়ত। প্রত্যেকদিন রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়ার প্রলোভনে পড়ে এমন কাজ করে বসে। বয়স বাড়লে, বুদ্ধি হলে ভালো হয়ে যাবে, ভাবলেও, হল কই! ওর বাবা বাড়িতে অল্পদিনের জন্য আসে, তাই তেমন কিছুই বলেন না। কিছু বলতে গেলে, ছেলের আঙুল উঁচিয়ে কথা বলা সহ্য করতে পারেন না। তার বন্ধুদের বাইক আছে তাকে কেন কিনে দেওয়া হচ্ছে না? ছেলে এমন উদাহরণ টেনে প্রশ্ন করায় থ মেরে যান। মুষিন খেটে, টিউশনির আর বাস ভাড়ার টাকা জোগাড় করেছেন, তার ছেলের এমন অধঃপতন? এবার আসলে বায়না করেছে আই ফোন কিনে দিতে হবে। সময়ে খাওয়া নেই, স্নান নেই - খেলা আছে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। সন্ধ্যের পরে দোগাছির দিকে অঞ্জনা খালের ধারে টোঙে চলে যায় ফেরে রাত দশটা, এগারোটায়।
দীপন ওপেন ইউনিভার্সিটিতে বিএসসি করছে। ম্যাথে অনার্স। সেকেন্ড ইয়ারে (থার্ড ও ফোর্থ সেমিস্টারে) সাপলি পেয়েছে দুটো বিষয়ে। একটা বছর আবারও পিছিয়ে যাবে; তাতে ওর কোনো আক্ষেপ নেই। ওর বক্তব্য, 'একটা বছর এমন কী আর? বারো ক্লাসের পর নীটের প্রিপারেশন করার জন্য দুই বছর গেছে। প্রতিযোগিতার বাজারে তিন বছর পিছিয়ে, সেটা বোঝে না, বুঝতে চাইও না।
অঞ্জনা টঙের আড্ডায় বিভিন্ন বয়সের ছেলেরা গ্রুপ করে চাকরির পরীক্ষার পড়াশোনা করে। অবশ্যই অনেক ছেলের উপকার হয়েছে। পড়াশোনার সঙ্গে নেশাভাঙের পাঠ ও চলে। উচ্ছন্নে যাওয়ার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। দীপন ছোটোবেলা থেকেই ক্রিকেট পাগল। ফুটবলও দারুণ খেলতো। ফুটবলের ভূত এখনো আছে। স্কুলের খেলার শিক্ষক ওকে ধীরে ধীরে কাবাডি খেলার দিকে ঠেলে না দিলে, দীপন এভাবে বকে যেত না। ডেঙ্গু হল যেবছর, ডাক্তারবাবু বলে দিয়েছিলেন বুকের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। সাবধানে থাকতে হবে। স্মোক তো একদম নয়। কাবাডি টিমের ছেলেদের কাছে বিড়িতে টান দিতে শেখে। এই খেলা করে নিম্নবৃত্ত পরিবারের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া ছেলেরা। ছোটোবেলা থেকেই বিড়ি ফুঁকতে শুরু করে। দীপনও সপ্তম শ্রেণি থেকে বিড়ি, সিগারেটে টান দিচ্ছে সেটা পরিবারের অনেকে বুঝতে পেরেছিল। টিউশন পড়ার নাম করে সাইকেল নিয়ে চলে আসত জেলা হাসপাতালের পিছনে অঞ্জনা খালের ধারে বকাটে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দিত। এইদিকটি ঘন ঝোপ-জঙ্গল ও নির্জন। পরিচিতদের চোখে পড়ার মতো জায়গা নয়। দীপনের মা শাসন করে ব্যর্থ হয়েছে। মামার কানে কথাগুলো উঠলে দীপন আরও বিগড়ে গেল। বেয়াড়াপানা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। সঙ্গ দোষে নষ্ট হয়ে গেল ছেলেটা। সুলতার আফশোশ স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষকের সিদ্ধানকে প্রাধান্য দিয়ে মস্ত বড়ো ভুল করেছে। ফুটবল খেলতো দুর্দান্ত, ধরে রাখলে বোধহয় এতটা খারাপ হতে পারত না। সুলতা ডিপ্রেশন কাটাতে পুরোনো বান্ধবীদের দলে যোগ দিয়েছে। সময়-সুযোগ বুঝে বেরিয়ে পড়ে তাদের সঙ্গে। অনেকটা অবসাদ কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।
সম্পদ কিন্তু কিছুতেই ভাগ্নের এই অধঃপতন মেনে নিতে পারে না, পারে না আরও অনেক কিছুই। দিন দিন হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ছে। কেমন যেন একটা ক্লান্তি এসে যাচ্ছে। অবসন্ন হয়ে পড়ছে মন। চারিদিকে স্বপ্ন ভঙ্গের দামামার ঝনঝনানি। হাজার কিলোমিটার দূরত্বে চলছে যুদ্ধ। সোস্যাল মিডিয়ায়, সংবাদপত্রে, টিভিতে ভয়ঙ্কর দৃশ্যে ভালো থাকতে পারছে না, যা সম্পদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়, কিন্তু সম্পদ এভাবে বাঁচতে চাইনি কোনোদিন। 'ছাড়পত্র' কবিতায় কিশোর কবির অঙ্গীকার সম্পদের মনে গুনগুনিয়ে ওঠে -
"চলে যাব - তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ,
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক'রে যাব আমি,
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার,..."
কিশোর বয়সেই সম্পদ, কিশোর কবির 'ছাড়পত্র' কবিতার অঙ্গীকারে, শপথ নিয়েছে। এবছর কবির জন্মশতবর্ষ। কবির স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার দায় তাঁর উত্তরসূরিদের। সম্পদকে এভাবে ভেঙে পড়লে কি চলে?
(ক্রমশ)
