
কবি ও জমিদার
তুমি তো মস্ত ধনী, তোমার অপেক্ষা একজন কবি ধনী কেন? তোমার জগতের অপেক্ষা তাঁহার জগৎ বৃহৎ। অতো বড় জমি কাহার আছে? তিনি যে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ নক্ষত্র সমস্ত দখল করিয়া বসিয়া আছেন। তোমার জগতের মানচিত্রে উত্তরে অফিসের দেওয়াল, দক্ষিণে অফিসের দেওয়াল, পূর্বেও তাহাই, পশ্চিমেও তাহাই।
কবির ঘোষণা
সম্মানের জন্যে মানুষ শিরোপা প্রার্থনা করে, এবং তার প্রয়োজনও থাকতে পারে, কিন্তু শিরোপা দ্বারা মানুষের মাথা বড়ো হয় না। আসল গৌরবের বার্তা মস্তিষ্কেই আছে, শিরোপায় নেই; প্রাণের সৃষ্টিঘরে আছে, দোকানের কারখানা ঘরে নেই। বসন্ত বাংলার চিত্ত উপবনে প্রাণ দেবতার দাক্ষিণ্য নিয়ে এসে পৌঁছেছে, এ হল একেবারে ভিতরকার খবর, খবরের কাগজের খবর নয়; এর ঘোষণার ভার কবিদের উপর। আমি আজ সেই কবির কর্তব্য করতে এসেছি...
কবির পরিচয়
সায়েন্সের একটা ঠাট আছে, যতক্ষণ সেই ঠাটের মধ্যে কোনো একটা তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করা না যায় ততক্ষণ তার বৈজ্ঞানিক মূল্য কিছুই নেই। তেমনি বিষয়টি যত বড়োই হিতকর বা অপূর্ব হোক না কেন যতক্ষণ সে কোনো একটা সাহিত্য রূপের মধ্যে চির প্রাণের শক্তি লাভ না করে ততক্ষণ কেবলমাত্র বিষয়ের দামে তাকে সাহিত্যের দাম দেওয়া যায় না। রচনার বিষয়টি কালোচিত যুগোচিত, এইটেতেই যাঁর একমাত্র গৌরব তিনি উঁচুদরের মানুষ হতে পারেন, কিন্তু তিনি কবি নন, সাহিত্যিক নন।
কবি ও ভাষা
ভাষার তো হৃদয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ নাই, তাহাকে মস্তিষ্ক ভেদ করিয়া অন্তরে প্রবেশ করিতে হয়। সে দূতমাত্র, হৃদয়ের খাস মহলে তাহার অধিকার নাই, আম দরবারে আসিয়া সে আপনার বার্তা জানাইয়া যায় মাত্র। তাহাকে বুঝিতে অর্থ করিতে অনেকটা সময় যায়। কিন্তু সংগীত একেবারে এক ইঙ্গিতেই হৃদয়কে আলিঙ্গন করিয়া ধরে।
এইজন্য কবিরা ভাষার সঙ্গে সঙ্গে একটা সঙ্গীত নিযুক্ত করিয়া দেন। সে আপন মায়াস্পর্শে হৃদয়ের দ্বার মুক্ত করিয়া দেয়। ছন্দে এবং ধ্বনিতে যখন হৃদয় স্বস্তি বিচলিত হইয়া উঠে তখন ভাষার কার্য অনেক সহজ হইয়া আসে।
কবি ও মহাকবি
একলা কবির কথা বলিতে এমন বুঝায় না যে, তাহা আর কোনো লোকের অধিগম্য নহে, তেমন হইলে তাহাকে পাগলামি বলা যাইতে। তাহার অর্থ এই যে, কবির মধ্যে সেই ক্ষমতাটি আছে, যাহাতে তাহার নিজের সুখ-দুঃখ, নিজের কল্পনা, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া বিশ্বমানবের চিরন্তন হৃদয়াবেগ ও জীবনের মর্মকথা আপনি বাজিয়া উঠে।
এই যেমন এক শ্রেণির কবি হইল, তেমনি আর এক শ্রেণির কবি আছে যাহার রচনার ভিতর দিয়া একটি সমগ্র দেশ, একটি সমগ্র যুগ, আপনার হৃদয়কে, আপনার অভিজ্ঞতাকে ব্যক্ত করিয়া তাহাকে মানবের চিরন্তন সামগ্রী করিয়া তোলে। এই দ্বিতীয় শ্রেণির কবিকে মহাকবি বলা হয়।
সৌজন্যেঃ অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায়
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
