বিবিধ

ফিরে দেখা



চিরঞ্জীব হালদার


গ্রাম জীবনে সত্তর-আশি বা নব্বই-এর দশকে গণমাধ্যম বলতে রেডিও একমাত্র মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিল। 'গল্পদাদুর আসর' থেকে তরজা গান বা 'বিবিধ ভারতী'র সব মনকাড়া অনুষ্ঠান হতো।

খেলার মাঠ বা ফসল তোলার মরসুমে মারফি বা ফিলিপস রেডিও অপ্রতিরোধ্য জায়গা নিয়েছিল আপামর মানুষের হৃদয়ে। অনেক পুরোনো দিনের গ্রামের মিষ্টির দোকানে আবালবৃদ্ধকে জমা হতে দেখেছি রাত আটটায় স্থানীয় সংবাদ শুনতে। হ্যাজাক লাইটের মিঠে আলোয় দানাদার বা রসগোল্লার ফুটন্ত রসের ভিয়েনের আমোদে দেবদুলালের স্থানীয় সংবাদ শোনা পরম তৃপ্তির বিষয়। একটু রাত হলে বিভিন্ন যাত্রাপালার ট্রেলার অথবা পৌনে ন'টার ডিটেকটিভ শ্রুতি নাটক 'কালো ভ্রমর' এখনো স্মৃতিকে ধাক্কা দেয়। সব থেকে রোমাঞ্চ লাগতো বাংলাদেশের বিভিন্ন খবর বা পল্লীগীতি অথবা অনুরোধের আসর শোনা, এক অন্য অনুভূতি। যেন অনন্তলোক থেকে শব্দ তরঙ্গ ভাসতে ভাসতে বেতারকণিকা মগজে চারিয়ে যেত। কত যে প্রখ্যাত সাক্ষাৎকার আর সমীক্ষা বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে শুনেছি তার হিসেব নেই। মেহেদী হাসানের গজল বা ভীমসেন জোশীর গায়কি মনে পড়লে কাঁটা দেয়। তখন আমার মাধ্যমিক পরীক্ষা সমাপ্ত হয়েছে। দিনটার কথা মনে নেই। সম্ভবত বুধবার হবে। রেডিওর নভ ঘোরাতেই 'কলকাতা ক' কেন্দ্রের এক সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে আটকে পড়েছি। ১৯৭৮-এর মাধ্যমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানাধিকারীকে নিয়ে এক সাক্ষাৎকার চলছে। কে কিভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল। প্রিয় বিষয় ও শিক্ষক তাদের কিভাবে সহায়তা করেছে, অভিভাবকের কেমন ভূমিকা ছিল, কোন খেলা প্রিয় বা আদৌ খেলাধুলার প্রতি কোনো আকর্ষণ অনুভব করে কিনা এইসব আলোচনা চলছে। সঞ্চালক মহাশয় সাধারণভাবে প্রশ্ন করছেন পড়াশোনা বাদে অন্য কোনো শখ কারো আছে কিনা? যে ছেলেটি প্রথম হয়েছিল সে বলছিল যে আধুনিক বাংলা কবিতা তাকে কোনোভাবেই আকর্ষণ করে না। সব মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়। সেই বছর বা আগের বছর 'বাবরের প্রার্থনা' একাডেমি পেয়েছে। পাঠ্য বইয়ের বাইরে তখন কোনো বাংলা কবিতার বই আলাদাভাবে পড়া হয়নি। মাধ্যমিকে প্রথম হওয়া ছেলেটির 'আধুনিক বাংলা কবিতা কিছুই বুঝিনা' এই উত্তর যেন আমার মগজে এক দীর্ঘস্থায়ী হাতুড়ির আঘাত হয়ে ধাক্কা দিয়েছিল।

আমি স্কুলে নিম্নমেধার ছাত্র। ব্যাক বেঞ্চার। সবকিছুতে পিছিয়ে। বাংলায় কোনওক্রমে ৪৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে উতরে গেছি। সে বছর পাশের হার ছিল ৪৬ শতাংশ। প্রথম স্থানাধিকারীর এই কবিতা না বোঝার বাক্যাংশ যেন আমার নিয়ন্তা হয়ে উঠল জীবনে। আর কিছু পারি বা না পারি কবিতা কি ও কেন তার ব্যবচ্ছেদ না করা পর্যন্ত আমার নিস্তার নেই। অমন চৌকশ মেধার ছেলে বলে কিনা বাংলা কবিতা বুঝি না। যেভাবেই হোক এর মর্মস্থলে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমার নিস্তার নেই। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে শব্দের অপদেবতা আমার ঘাড়ে যে উঠে বসলো সেই থেকে আর নেমে আসেনি।

ব্যক্তিজীবনে কত কিছু ঘটনা এমন দাগ রেখে যায় প্রত্যেকের তা হাজার ঘটনা প্রবাহে কখনো ফিকে বা আবছা হয় হয় না। ৭০ দশকে কৈশোর অবস্থায় পাড়ার সব ঘরেই কমবেশি যাতায়াত ছিল। কখনো মা-কাকিমার সাথে কখনো সমবয়সী খেলার সঙ্গী হিসেবে বা কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে সব বাড়িতেই অবারিত যাতায়াত ছিল।

সমবয়সী পাড়ার দু'তিনজন মিলে এলেবেলে যাত্রার  নায়ক সাজা বা পুতুল নাচের আসর বসানো অতি সাধারন বিষয়। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি গ্রন্থাগারে প্রতি বিকেলে অনেককেই দলবেঁধে যেতে দেখেছি। হাতে তাদের নীল রেক্সিন কাপড়ের বাধানো বই। আমি গ্রন্থাগারের সদস্য ক্লাস এইট থেকে। মাসিক সদস্য চাঁদা দু' পয়সা লেরো বিস্কুটের সমান। ২/৩ বার বই পড়তে নিয়ে জমা দিতেও ভুলে গেছি। কেননা ওখানে গেলে যত খুশি বই ঘাঁটা যায়। আমার পিসতুতো দিদি ও তার বান্ধবীরা অনেকেই নিয়মিত পাঠক ছিল। গীতাপিসির কাছে আশাপূর্ণার উপন্যাস বা 'ন হন্যতে' সম্পর্কে আবছা অনেক আলোচনাও শুনেছি। আমাদের পাড়ায় সবার বাড়িতে অবাধ যাতায়াতের সুবাদে এক ঘর বাদ দিয়ে করো বাড়িতে কোনো বইয়ের আলমারির দেখা পাইনি। একেবারে পাশের বাড়িতে আলমারিতে থরে থরে সাজানো থাকতো শরৎ রচনাবলী, রবীন্দ্র রচনাবলীর সঙ্গে কিরীটি অমনিবাস-এর অনেক খন্ড। প্রচ্ছদের লেখাগুলো কালোজমিনের উপর গাঢ় হলুদ রঙের এক তীব্র টোন বেশ টানতো আমাকে। একদিন ভুল করে রবীন্দ্র রচনাবলী বের করে পড়ছিলাম। সহপাঠীর বাবা হঠাৎ দেখে ফেলে যে আমি রবীন্দ্রনাথ রচনাবলী আলমারি থেকে বের করে পড়ছি। আমি যেন স্পর্ধার সীমা একটু বেশি টপকে গেছি। এই ঘটনার পর থেকে ওই ঘরের ভিতর প্রবেশ করা নিষেধের আবর্তে চলে যায়।

প্রপিতামহের কাল থেকে আমাদের পরিবারের উপর তথাকথিত কলেজ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষজনের এক চাপা অবজ্ঞা ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য আমার নজর এড়ায়নি। দিন যত বয়ে গেছে এই অবস্থা আরো গাঢ় হয়েছে। আমি অনায়াসে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যেতেই যেন আরো অসহিষ্ণুতার প্রকোপ বাড়তে দেখেছি। আমার কবিতা চর্চার অনেক পজিটিভ ইন্ধন এইসব ঘটনাপ্রবাহ।  ক্রমাগত দানা বাঁধতে বাঁধতে কখন যে ১৯৯৫-তে প্রথম কাব্যগ্রন্থ করে ফেলেছি টেরই পাইনি। এমন সব নীরব অপমানের চমৎকার হাতিয়ার যেন আমার ভেতর কবিতা হয়ে জমে উঠেছে রক্তে। এটাই যেন উপরওয়ালার একান্ত চাহিদা আমার প্রতি। এই আবর্ত দিন দিন আমার ভেতর ক্রমাগত চরকি পাক দিতেই থাকে। আমি যেন সেই নাগরদোলার চোখ বাঁধা  ঘূর্ণ্যমান ব্যক্তি। কবিতার আসনে বসা শব্দকে ক্রমাগত পাক দেওয়াটাই আমার যেন নিয়তি।