গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

দিব্যদৃষ্টি (দিব্যদাস সিরিজ ১)



ড. শুভায়ন মাইতি


মহাষ্টমীর সন্ধ্যায় নদীর ধারে বসে হাওয়া খাচ্ছি আর খেয়া পারাপার দেখছি। এমন সময় দেখি একদল কমবয়সী যুবক-যুবতী হৈ হুল্লোড় করছে জেটি ঘাটের ওয়েটিং রুমে, কয়েকজনের হাতে ক্যামেরা, অধীর উল্লাসে অপেক্ষারত পরবর্তী খেয়ার। একটি সাউন্ড বক্সে আধুনিক গান চালিয়ে অনেকে নৃত্য করে সময়টা উপভোগ করছে। ওদের চেঁচামেচিতে কিছুটা বিরক্ত বোধ করলাম। সদ্যজাত গো শাবক যেমন মুক্তির স্বাদ পেয়ে তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে শুরু করে, ওদের কাঁচা মনও তেমনি এই অনাবিল অসীমতায় নিজেদের হারিয়ে ফেলেছে। ওদের কিছু বলতে যাবো এমন সময় আমার মনে হলো থাক না যৌবনের ধর্ম চাঞ্চল্য। ওদের নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা শুনে মনে হলো ওরা ওপারে মহিষাদলের গর্গদের রাজবাড়ির বনেদী দুর্গাপুজোর ভ্লগ করতে যাচ্ছে। ওদের মধ্যে একজন মেয়ের দিকে আমার চোখ পড়ল। ও কেমন যেন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে নদীর ওপারে। হঠাৎ এই আনন্দের মধ্যেও ওর চোখে মুখে কেমন যেন কোনো বিষাদময় ঘটনা দানা বেঁধেছে!

আমি একজন অঘোরী তান্ত্রিক - তন্ত্রাচার্য দিব্যদাস বিদ্যাবাগীশ। আমার পূর্বজন্মের অর্জিত পূণ্য ও গুরুদেবের কৃপায় আমি অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছিলাম। সেই অন্তর্দৃষ্টির বলে আমি যেকোনো মানুষের মনের বর্তমান ও অতীত পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পড়ে ফেলতে পারি। গুরুদেবের আদেশে কেবলমাত্র মানুষের কল্যাণ ব্যতীত অন্য কোনও অনিষ্টকারী উদ্দেশ্যে আমি এই ক্ষমতা প্রয়োগ কারি না।

মেয়েটির আচরণে আমার মনে হলো ওর মধ্যে কিছু একটা যেন পীড়ন চলছে। মেয়েটির দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে মনসংযোগের ইড়া-পিঙ্গলা সমন্বয় মুদ্রাটি অনুশীলন করতেই, সবকিছু স্পষ্টরূপে আমার মনের অন্তর্দৃষ্টিতে ভেসে উঠলো। আমি লক্ষ্য করলাম এই মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রক গোলকের কেন্দ্রবিন্দু মেয়েটির মনের সুষুন্না স্তরের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করে চলেছে। তার মনকে জুড়ে দিতে চাইছে সময়ের বিপরীত প্রবাহের কোনও এক অবচেতন স্তরের তরঙ্গ সত্ত্বায়। মেয়েটির মন এখন আংশিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তার বর্তমান ও অতীতের কোনও অবচেতন স্তরের উপরিপতিত তরঙ্গ গতির আন্দোলনে।

প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী মানব শরীর হলো তিনটি নদীর অববাহিকা। এই তিনটি নদী হলো ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুন্না। আমাদের শরীর ও মনের যাবতীয় শক্তি এই তিনটি নদী বা শক্তি-স্রোত-এর মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। মেরুদণ্ডের বাম দিকে থাকে ইড়া নদী যা আমাদের দেহকে চন্দ্রের সাথে সংযোগ ঘটায়। এটিকে চন্দ্র নাড়ীও বলা হয়ে থাকে। ডান দিকে থাকে পিঙ্গলা যা সূর্য নদী নামেও পরিচিতি। সূর্যের অসীম তেজ ও যস-এর প্রবাহ আমাদের শরীরে বয়ে আনে এই নাড়ী। সুষুন্না নদী আমাদের মেরুদন্ডের মধ্যদিয়ে যায় এবং এটি ইড়া ও পিঙ্গলার কেন্দ্রীয় নাড়ী। এটি সাতটি চক্রের মধ্যদিয়ে মেরুদণ্ডের গোড়া থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছয়। আমাদের মনের সুষুন্না স্তরে আমাদের ইহজাগতিক চিন্তাভাবনা, আবেগ, হর্ষ, বিষাদ ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণ হয়ে থাকে আর অবচেতন স্তর আমাদের মনকে নিয়ে যায় সময় ও স্থানের ব্যতিক্রান্ত প্রবাহে। এভাবেই মহাজাগতিক নিয়মে বিভিন্ন স্থান ও কালের সঙ্গে আমাদের ইহজগতের শারীরিক সমন্বয়সাধন হয়ে থাকে।

যাই হোক আমি লক্ষ্য করলাম মেয়েটি কিছুক্ষণ পর তার পাশের আরেকটি মেয়েকে বলছে, "পায়েল শোন না, আমার কেন জানিনা মনে হচ্ছে এই জায়গাটা আমার খুব চেনা। আরেকটা ব্যাপার কি জানিস আমি এর আগে মহিষাদল-এর নাম পর্যন্ত শুনিনি কিন্তু যখন কোথায় যাওয়া হবে সবার কাছে মতামত চাওয়া হলো আমার মুখ থেকে যেন আপনা আপনি এই নামটাই বেরিয়ে এলো। মনে হলো আমি নয়, আমাকে দিয়ে কেউ যেন বলিয়ে নিলো।"

পায়েল যেন কিছুটা অবাক ও শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে উত্তর দিলো, "কি বলিস? ধুর, মজা করছিস হ্যা..."। মেয়েটি কিন্তু গম্ভীর ভাবেই বলল, "না রে! আমি গতকাল একটা স্বপ্ন দেখেছি। এই নদীর পাড়, হুবহু একই। একটি মেয়ে প্রাণপণে দৌড়ে চলেছে নদীর তীর বরাবর। আর হাঁপাতে হাঁপাতে করুণ স্বরে চিৎকার করে চলেছে বাঁচাও বাঁচাও। তারপর হঠাৎ এক করুণ আর্তনাদ। আর তখনই ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো, আমি ধড়ফর করে উঠে বসে পড়লাম। তুই তো দেখেছিস আমার বেডরুমের দেওয়ালে আমি একটা কুমিরের পেইন্টিং এঁকে বসিয়েছিলাম। আমার চোখ সেদিকে যেতে মনে হলো ওটা জীবন্ত হয়ে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। আমি ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম। পাশের রুম থেকে আমার মা দৌড়ে এলো। আমাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করল।"

তারপর দেখলাম না ওটা তো একটা পেইন্টিংই। আমি কি ভুল দেখলাম?"। পায়েল বলল, "আরে অনেক সময় ভুল হয়। তুই আজকাল এসব নিয়ে বেশি ভাবছিস তাই এসব উল্টোপাল্টা তোর মনে আসছে। ওসব ছাড় বেবি, আমরা একটা দিন মজা করতে এসেছি, এসব ভেবে খালি খালি সময় আর মুডটা বেকার নষ্ট করিস না, লেটস্ ড্যান্স।"

মেয়েটা কিন্তু এখনও নিজের মনকে শান্ত করতে পারছে না। ওর ভেতরে অস্বস্তিটা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ও ওর বান্ধবীকে আবারও ডাকলো, "পায়েল, এই পায়েল..."। এবারে পায়েল কিছুটা বিরক্ত হলো।

"আবার কি হলো?"

মেয়েটি জড়োসড়ো ভাবে বলল, "দেখনা এই চারিদিকে কেমন যেন কালো কালো মেঘ এসে জড়ো হয়েছে। ঘিরে আসছে আমার দিকে।"

এইবার পায়েলের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। সে কিছুটা জোর গলায় বলল, "লিসা, কি হচ্ছে এসব? মজা করার তো একটা লিমিট থাকে নাকি? কোথায় মেঘ, এই পরিষ্কার আকাশে তারারা জ্বলজ্বল করছে।"

মেয়েটি এবারে কিছুটা অনুনয়ের সুরে বলল, "পায়েল বিশ্বাস কর, আমি একটুও মজা করছি না। আমার মনে কেমন যেন একটা চাপা অস্বস্তি কাজ করছে। আমি ঠিক বোঝাতে পারছি না"।

পায়েলও দেখলো এমন নরম আবহাওয়ার মধ্যেও ওর প্রিয় বান্ধবীর শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে। সে কিছুটা চিন্তিত স্বরে বলল, "এই লিসা, কি হলো রে তোর"।

মেয়েটি আসলেই যেন কিছুই ব্যক্ত করতে পারছে না। ওর সেই অব্যক্ত অভিব্যক্তি ধরা পড়ল আমার অন্তর্দৃষ্টিতে। ওর চেতনার বিভিন্ন স্তরে গড়ে ওঠা পৃথক পৃথক আবেগ, চিন্তাভাবনা সব তালগোল পাকিয়ে কুণ্ডলী আকারে বয়ে চলেছে মহাবিশ্বের অন্তঃস্থলে আর সেখানে তা অতীতের কোনও একটি চেতনা স্তরের দ্বারা পরিশীলিত হয়ে পুনরায় ফিরে আসছে তার সুষুন্নাতে। মহাবিশ্বের তরঙ্গস্রোত তার চেতনায় অতীতের কিছুটা আভাস দিচ্ছে মাত্র কিন্তু পুরোপুরি উন্মোচন করছে না মেয়েটির ইহজাগতিক দৃশ্যপটে। আর সময়ের তরঙ্গপুঞ্জ যেন কালো কালো মেঘের ন্যায় জড়ো হয়েছে ওর অবচেতন মনে। আর মাঝে মাঝে ভেসে উঠছে আগের রাতে দেখা স্বপ্নের খণ্ড খণ্ড অংশগুলো। মেয়েটির মনে যেন কোনো গুপ্ত রহস্যের ধাঁধা খেলা করছে। মহাবিশ্ব মেয়েটিকে শক্ত প্রতিযোগিতা দিয়ে চলেছে সেই ধাঁধা সমাধান করার জন্য। আর মেয়েটির মনে হচ্ছে এই শক্ত ধাঁধা কোনো বিশেষজ্ঞের সাহায্য ছাড়া তার পক্ষে একা একা সমাধান করা সম্ভব নয়। আবার পরক্ষণেই তার মনে হলো এ তাকে সমাধান করতেই হবে নইলে তার মুক্তি নেই। সে নিজেকে অত্যন্ত অসহায় বোধ করতে লাগলো। চাতক পাখিরা যেমন জলের জন্য অসহায় আর্তি নিয়ে ক্রন্দন করে, ঠিক তেমনই মেয়েটির অন্তরাত্মাও যেন এই অজানা রহস্য সমাধানের বিফলতায় ডুকরে কেঁদে উঠলো। এমন সময় মেয়েটির দৃষ্টি পড়ল আমার দিকে আর আমি তৎক্ষণাৎ ওর থেকে দৃষ্টি সরাতে চেষ্টা করলাম। ওকে বলতে শুনলাম, "পায়েল দেখ ঐ দাড়িওয়ালা লোকটা আমার দিকে কেমন একদৃষ্টে চেয়েছিল এতক্ষণ, আমি তার দিকে চাইতেই চোখ সরিয়ে নিলো"। পায়েল এমনিতেই চিন্তিত ও বিরক্ত ছিল। সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "এই যে মশাই কি ব্যাপার কি শুনি? আপনি আমাদের দিকে এমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়েছিলেন কেনো? আগে কোনোদিন এমন সুন্দরী মেয়ে দেখেননি নাকি? কি চাই আপনার?"

আমি মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বললাম, "এই কিশোরী, এদিকে শোনো"। ও আমার দিকে এগিয়ে এলে আমি ওর উদ্দেশ্যে বললাম, "কিশোরী তুমি রাজবাড়ীর দুর্গাপুজো দেখতে যাচ্ছ, কুমীরে এত ভয় পেওনা, এই নদীতে এখন আর কুমীর নেই"। এটা শুনে মেয়েটার মধ্যে যেন কেমন একটা উত্তেজনা খেলে গেলো। সে অস্বাভাবিক ভাবে জোরে চেঁচিয়ে উঠল, "হ্যাঁ, হ্যাঁ কুমীর, কুমীরই তো"। এই আওয়াজ শুনে ওর সাথে আসা একজন ছেলে দৌড়ে এসে ওকে বলল, "কি রে, কি হলো তোর?" আর আমাকে উদ্দেশ্য করে তিরস্কারের ভঙ্গীতে বলল, "কে আপনি? ওকে বিরক্ত করছেন কেনো? পাগল ভণ্ড কোথাকার"। পায়েল আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "ও তাহলে এতক্ষণ আড়ি পেতে আমাদের কথাবার্তাও শোনা হচ্ছিল? আপনি নিজের চরকায় তেল দিন তো মশাই, আমাদের ব্যাপার আমরা সামলে নেবো।"

আমি নিজেকে শান্ত রাখলাম আর কিছুটা তফাতে চলে এলাম। ওরা আবার যে যার মতো স্বাভাবিক ছন্দেই উপভোগ করতে লাগলো। আমি ঐ মেয়েটিকে লক্ষ্য করলাম যে সে তার সাথে আসা অপর একটি মেয়েকে কিছু যেন বলছে। ওর চোখ মুখে নতুন করে যেন এক অমোঘ অনুসন্ধিৎসার সৃষ্টি হয়েছে, ওর অবচেতন মনে যেন আবার একরাশ ধোঁয়াশা জমাট বেঁধে উঠেছে। কিন্তু কিছুতেই যেন স্পষ্ট করে মনে করতে পারছে না। ওদের দলের কয়েকজন ছেলেকে দেখলাম ওর হাত ধরে ওকে নাচার জন্যে জোর করছে। কিন্তু সে ওদেরকে বলল, "না রে, তোরা এনজয় কর, আমার শরীরটা ঠিক ভালো লাগছে না। আমাকে একটু একা বসতে দে।" মেয়েটির প্রত্যাখ্যান শুনে ওরা একটু অপ্রস্তুত হলো। অন্য মেয়েটি বলল, "লিসা, তোর কি হলো হঠাৎ করে? এই তো দিব্যি এনজয় করছিলি - তুই আমাদের লিডার, তুই এমন করে গোমড়ামুখো হয়ে বসে থাকলে আমরা কি করি বল? লেটস্ কাম অ্যান্ড এনজয় দিস ইভনিং বেবি।" ও প্রত্যুত্তরে একটু খেঁকিয়ে বলল, "স্টপ দিস রাবিশ, আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না ব্যাস - জোর করিস না আমাকে, আমাকে একটু একা থাকতে দে প্লীজ লিভ।" এইরকম আচরণ ওর সঙ্গীসাথীরা প্রত্যাশা করেনি। ওরা হৈ হুল্লোড় থামিয়ে বসে পড়ল জেটি ঘাটের ওয়েটিং সিটগুলোতে আর ফিসফিসিয়ে কথা বলে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করল। কেউ কেউ ক্ষীণ স্বরে পাশের জনকে বলল, "কেসটা কি রে? বয়ফ্রেন্ড-এর সাথে ঝামেলা নাকি!"

খেয়া আজকে অনেকটা দেরি করছে এপারে আসতে। মেয়েটি ঘাটে নামলো চোখমুখে জলের ঝাপটা নেওয়ার জন্য। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি আতঙ্কে চেঁচাতে চেঁচাতে উপরে উঠে এলো, "রক্ত... রক্ত...।" ওর সঙ্গীসাথীরা দৌড়ে গেল ওর দিকে। ওর চোখেমুখে গভীর আতঙ্কের ছাপ। ওর দুধে আলতা গাল উত্তেজনায় লালবর্ণ ধারণ করেছে। বৈশাখের অস্তগামী সূর্য যেমন অস্তাচলে কালবৈশাখীর আতঙ্কে লাবণ্য হারিয়ে ফেলে, মেয়েটিও কোনো সমূহ বিপদের আশঙ্কায় মুহ্যমান হয়ে গোঙাতে গোঙাতে বলতে লাগল, "নদীর জলে রক্ত, গাঢ় লাল নদীর জল..."। ওর দলের দুজন ছেলে নদীতে গিয়ে দেখলো সব স্বাভাবিক, রক্ত তো দূরের কথা, একদম স্বচ্ছ গঙ্গার পবিত্র জল কোনও লাল বর্ণের ছোঁয়া পর্যন্ত নেই। তারা এসে বলল, "লিসা, তুই মজা করছিস আমাদের সাথে? কি হয়েছে তোর বলনা আমাদের। আমরা তো তোর বন্ধু, বল সবকিছু খুলে বুঝলি।" মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না, খোলা আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে কিছু যেন মনে করার চেষ্টা করলো। এইসব ব্যাপার দেখে আমি এগিয়ে গেলাম ওদের দিকে। আমাকে দেখে মেয়েটি অপ্রকৃতস্থ ভাবে জিজ্ঞেস করল, "আপনি, আপনি সব জানেন, হ্যাঁ হ্যাঁ আপনিই, আপনিই জানেন সব, বলুন আপনি কেন এমন হচ্ছে!"

আমি দেখলাম ওপারে যাওয়ার খেয়া আগমনের ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে। আমি বললাম, "ছাড়ো, তোমাদের খেয়া আসছে।" ও উত্তর দিলো, "না, আমাকে জানতেই হবে। আমরা পরের লঞ্চ-এ যাবো, আপনি প্লীজ বলুন। যখন থেকে এখানে এসেছি, আমার মনের মধ্যে কেমন যেন একটা চাপা আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে। এমন কেন হচ্ছে প্লীজ বলুন, আমি জানি আপনি এর কারণ নিশ্চয় জানেন।" ওর সঙ্গীসাথী কয়েকজন বলছে, "পাগলের পাল্লায় পড়ে মেয়েটাও পাগল হয়ে গেল। হোক কি করা যায় আমরা না হয় পরের লঞ্চেই যাবো খন, ততক্ষণ অবধি একটা হরর স্টোরি শুনে নেওয়া যাক, বুড়োর কাছে! কি বলিস, বেশ হবে।"

ওদের কথায় আমি বা মেয়েটি কেউই আমল দিলাম না। আমি মেয়েটির উদ্দেশ্যে বললাম, "পূর্বজন্মে এমনই এক ঘাটে বসেছিলাম ব্রাজদুলালের সঙ্গে, হরিদুলাল হরীতকী এনেছিল, সচীদুলাল এনেছিল মুড়ি আর তেলেভাজা, কি হে সুন্দরী তুমিও কিছু এনেছ নাকি?" একটু মস্করা করেই বললাম শেষের কথাটা। দেখলাম মেয়েটির মধ্যে হাসির লেশমাত্র নেই। ও ধীর স্বরে বলল, "না..."। আমি বললাম, "তুমি আসলে সচিদুলালের কন্যা কমলাসুন্দরী।" মেয়েটি তখন উত্তেজিত ভাবে বলল, "না, আমি লিসা, লিসা হালদার। আমার বাবা সচিদুলাল নয় রামচন্দ্র হালদার। হটুগঞ্জ-এ বাড়ি আমাদের। আপনি কি যা তা বলছেন?" আমি খুব শান্ত ভাবেই জবাব দিলাম এ তো তোমার একালের পরিচয়। আমি বলছি পূর্বজন্মের কথা। তুমি একটু শান্ত হয়ে বোসো আর আমার কথাগুলো শোনো মন দিয়ে, মন দিলেই সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে তোমার সামনে। ও মাথা নেড়ে সায় দিলো। আমি বলতে শুরু করলাম সে আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগেকার কথা।

সেকালে নদীর ওপারে দোর্দণ্ডপ্রতাপ গর্গদের রাজত্ব আর এদিকে সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের নিষ্কর জমিদারি। দুই পাড়ের প্রজারা তখন খুব সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাতো। বাংলাদেশের এই এলাকা থেকেই বেশিরভাগ বাণিজ্য পাট চলতো। দুই রাজাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। শুধু ছিল স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা। দুর্গাপুজোর সময় দুই রাজবাড়িতেই ধুমধাম করে পুজো হতো। গর্গরা সুররাজ তানসেন-এর সঙ্গীত আসর বসানোর আয়োজন করলে, সাবর্ণরাও কম যান না। তারাও এলাহাবাদ থেকে কোটি টাকা খরচ করে হিরাবাই-এর নৃত্যায়োজন করত। তখনও নদী পারাপারের কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যার মধ্যে ছিল ওপারে রঘু ডাকাতের বাড়বাড়ন্ত। জনার্দন উপাধ্যায় গর্গের সময়ে নদীর পাড়ের এই বিস্তীর্ণ এলাকায় রঘু ডাকাত হয়ে উঠেছিল এক ত্রাসের নাম। তারা ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষের উপর ব্যাপক লুটপাট চালাত এবং তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করত। শুধু তাই নয়, তাদের উপাস্য দেবতা কালী মায়ের সেবায়েত ছিল কাপালিক বর্গের মানুষ। রঘুর দল তাদের গুরু মানতো। কাপালিকরা সিদ্ধিলাভের জন্যে মায়ের কাছে নানান তান্ত্রিক মার্গে সাধনা করত যার একটি বিশেষ উপাচার হলো কুমারী মেয়ের বলি দেওয়া। আর এই কুমারী মেয়েদের ধরে আনার দায়িত্ব থাকতো রঘুর উপর। কাপালিকরা রঘু ডাকাত-এর দলকে বলত, "এ স্বয়ং মায়ের আদেশ"। শুরুর দিকে কাপালিকরা লোকালয়ের আশেপাশেই ডেরা বাঁধতো। তারা সাধারণ মানুষের সামনে নানাবিধ অলৌকিক শক্তি প্রদর্শন, যেমন বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগ নিরাময়, ঝাড়ফুঁক ইত্যাদির মাধ্যমে জনমানসে প্রভাবশালী তান্ত্রিক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তাদের পাশবিক খেলা চলতো কার্তিকী অমাবশ্যার দিন দীপাবলীর রাত্রে।

তখনও বঙ্গদেশে কার্তিকী অমাবস্যায় ব্যপক হারে শ্যামাপূজার প্রচলন হয়নি। তখন কালী উপাসনা শুধু শ্মশানচারী তান্ত্রিক ও কাপালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তন্ত্র সাধকদের কাছে মা কালীর রূপ সাধারণের পরিচিত রূপ অপেক্ষা ভিন্ন, বিদ্যারাগ্মী রূপ - অত্যন্ত ভয়ঙ্কর সে রূপ। কৃষ্ণবদনা অর্ধনগ্না দেবীর উন্মুক্ত বিশালাকায় স্তনযুগল যা এই মহাজগতের সকল শক্তির আধার। দেবী একাধারে মোহময়ী, অন্যদিকে বীভৎস তাঁর অভিব্যক্তি। দেবী যেন নিমেষেই গ্রাস করতে পারেন জগতের সকল অনিষ্ট। দেবীর অনল দৃষ্টিতে যেন ভস্মীভূত হয় সকল লোভ, লালসা ও পাপাচার।

বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে কুমারী মেয়ের পবিত্র রক্ত দিয়ে দেবীর স্তন যুগলকে ধৌত করলে দেবী খুবই সন্তুষ্ট হন এবং তাঁর ভক্তকে মহাশিস ও মহাদিব্যশক্তি প্রদান করেন। অন্যদিকে বেশ কয়েক বছর দেবীকে রক্তস্নাত না করাতে পারলে দেবী প্রচণ্ড কুপিত হন এবং তাঁর ক্রোসানালে ভক্তকুলের উপর নেমে আসে মারাত্মক প্রতিঘাত।

তান্ত্রিক মতে সূর্যের উত্তরায়ণ শেষ হয়ে দক্ষিণায়ন শুরু হলে সব দেবতারা ঘুমিয়ে পড়েন। উত্তরায়ণ হলো মহাবিশ্বের দিন ও দক্ষিনায়ণ হলো মহাবিশ্বের রাত। উত্তরায়ণ বা কর্কটায়ণ চলাকালীন জগতকে পাহারা দেন সূর্য পুত্র রেবন্তের স্ত্রী রেবতী। আর মকরায়ণ চলাকালীন জগতের সর্বময় দায়িত্ব থাকে নৈরিৎ দিকপালের স্ত্রী নৈরিতির উপর। এই দুজন মহাবলশালিনী দেবী যোগনিদ্রার অংশ এবং এরা দুজন মিলে এই ত্রিলোক বা ত্রিতত্ত্ব লোককে পাহারা দেন - আত্ম তত্ত্ব, বিদ্যা তত্ত্ব ও শিব তত্ত্ব। তন্ত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাত্রি জন্মাষ্টমীতে মোহ রাত্রি, দুর্গাপুজোর মহানবমীতে মহারাত্রী ও কার্তিকী অমাবস্যায় কালরাত্রিতে রেবতী ও নৈরীতি ডাকিনী ও সাকিনী হয়ে মিলিত হন। এই সময়ে তন্ত্রসাধকগণ বিশেষ উপাচার সহযোগে এই দুই দেবীর মিলিত রূপ মহাকালীকে সন্তুষ্ট করে সিদ্ধিলাভের চেষ্টা করেন।

এভাবেই প্রতিবছর দীপাবলীর কালরাত্রিতে মহিষাদল রাজ্যের কোনো না কোনো হতভাগিনী কুমারী মেয়ের জীবন উৎসর্গ হতো মা কালীর চরণে। পরে এসব ব্যাপার জনমানসে চাউর হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ কাপালিকদের এড়িয়ে চলতে শুরু করে। আর গর্গদের সেনাবাহিনীর তৎপরতায় রঘু ডাকাতের দলও বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারত না। কাপালিকগণ বাধ্য হয়ে ডেরা পরিবর্তন করে এই নদীর ওপারে শ্মশান পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে গোপন তাঁবু গাড়ে। আর তাঁরা ঐ বিশেষ যোগ উপাচারের দিন দীপাবলীর কালরাত্রির বদলে মহানবমীর মহারাত্রিতে পরিবর্তনের সিদ্বান্ত নেয়। রঘুর দলের ওপর দায়িত্ব পড়ে পথচলতি মানুষের মধ্যে সুলক্ষণা কুমারী মেয়েকে ধরে আনার। ওরা এই দুর্গাপুজোর সময় ঝোপে ঝাড়ে ওৎ পেতে বসে থাকে অভীষ্ট লক্ষ্যের।

নদী পারাপারের জন্য আরেকটা সমস্যা ছিল তখনকার দিনে এই নদীতে কুমিরের উৎপাত।

সেবারও ছিল মহাষ্টমী। সচিদুলাল আমাদের সাথে বসে আড্ডা মারছিল। গতরাতে হিরাবাঈ-এর চমকপ্রদ নৃত্যশৈলী নিয়েই আড্ডা বেশ জমে উঠেছিল। এমন সময় সচিদুলালের কিশোরী মেয়ে এসে উপস্থিত হলো ওখানে। ও বায়না ধরলো আজকেই গর্গদের রাজবাড়ীতে ঠাকুর দেখতে যাবে।

সন্ধ্যার পরে নদীতে নৌকা ভ্রমণে কুমীরের আক্রমনের ভয় ছিল। কোন মাঝিই রাজি ছিল না নৌকা বাইতে। সচিদুলাল তার মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করে আজ নয় কাল সকাল সকাল তাকে রাজবাড়ীতে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যাবে। কিন্তু মেয়ে নাছোড়বান্দা। সে আজকেই যাবে। সচিদুলালের একরত্তি মেয়ে ছিল তার প্রাণ। মেয়ের জেদের কাছে হার মানে সচীদুলাল। এক মাঝিকে কয়েকটি মোহরের প্রলোভন দেখিয়ে রাজি করায় নদী পারাপারের জন্য। ওদের নৌকো ওপারে পৌঁছতেই আক্রমণ করে রঘুর দলের লোকজন। নৌকার মাঝিকে তারা হত্যা করে আর সচিদুলালকে বন্দী করে দড়িতে বেঁধে ফেলে। আর তার কন্যাকে তাড়া করতে থাকে। একরত্তি কিশোরী মেয়ে প্রাণপণে দৌড়তে থাকে নদীর পাড় বরাবর। শেষে দিগ্বিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে ডাকাতদল থেকে প্রাণে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপ দেয়।

ভাগ্য আর বাস্তব দুটোই চরম সত্যের ন্যায় বড়ই নিষ্ঠুর। কিশোরীকে আক্রমণ করে একপাল কুমীর। কোমল দেহটাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দেয় নিমেষে। চাঁদের জোৎস্নায় দেখা যায় লাল হয়ে উঠেছে নদীর জল। গর্গদের নৌ বাহিনীর সেনাপতি কাফুর হাসানের নজর পড়ে সেদিকে আর তারা রঘুর দলকেও তাড়া করে সচিদুলালকে উদ্ধার করে। রঘুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা কাপালিকদের ডেরা অবধি পৌঁছয়।

পরদিন সকালে মহিষাদল রাজ্যে হুলুস্থুল কান্ড ঘটে যায়। কাপালিকদল ও তাদের সহযোগী ডাকাতদলের অধিকাংশই গ্রেপ্তার হয় গর্গদের সেনাবাহিনীর হাতে। সচিদুলালকে এপারে ফেরত পাঠানো হয়। সচি উদ্ ভ্রান্তের ন্যায় তার মেয়েকে ডাকতে থাকে। তার সেই আকুল ডাক যেন নদীর বুক ছিঁড়ে অনুনাদি কম্পন ঘটাতে থাকে একুল ওকূলে। সে বিশ্বাসই করতে পারে না যে তার প্রিয় কন্যা আর ইহজগতে নেই। তার সেই শোকাতুর করুণ আর্তি যেন নদীর তলদেশ ফুঁড়ে পৃথিবীকে এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যায় মহাজগতের প্রান্তবিন্দুতে।

আমরা ওকে শান্ত করার চেষ্টা করি। শেষে ও ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে আর চিৎকার করে বলতে থাকে, "আমার মেয়ে ফিরে আসবে, একদিন না একদিন ফিরে আসবে। সেদিন আমি থাকি বা না থাকি, এই নদী স্বাক্ষ্য রইল যে একজন পিতার বিশ্বাস কোনোদিন মিথ্যা হতে পারে না। হে মাতা গঙ্গা তুমি আমার মেয়েকে প্রমাণ দিও যে এই সচিদুলাল তার জন্যে অপেক্ষা করেছিল এই বিশ্বাস নিয়ে যে সে একদিন ফিরে আসবে।" এই বলে সে অকস্মাৎ নদীতে ঝাঁপ দেয় আর অচিরেই এই নদীর অকূল জলে হারিয়ে যায় সে। অন্যদিকে কাপালিক সহ সকল দস্যুকে শূলে চড়ানো হয় রাজার আদেশে। এর সাথে বঙ্গদেশের ত্রাস রঘু ডাকাতের নাম চিরতরে মুছে যায়। এই বলে আমি থামলাম।

এতক্ষণ সবাই চুপ করে বসে মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছিল। এরপর নীরবতা ভেঙে একজন ছেলে আমাকে ব্যাঙ্গ করে বলতে লাগলো, "তাই আপনি দুয়ে দুয়ে চার করে দিলেন। আমাদের ক্লাস-এর হার্টথ্রব লিসা নাকি কোনো এককালের কমলাসুন্দরী! আর লিসা তোকেও বলিহারি, ফিজিক্স-এর স্টুডেন্ট হয়ে এসব গালগল্প বিশ্বাস করছিস!" তারপর আবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমরা মডার্ন জেনারেশন দাদু, জেন জে়ড, আমাদের এসব গাঁজাখুরি গল্প খাওয়ানো যাবেনা। আমরা বিজ্ঞানচর্চা করি, কোনোরকম লজিক ছাড়া এসব ফাঁদানো কথাবার্তা আমরা মানব না। এরকম আবার হয় নাকি? হে হে হে।" আমি প্রত্যুত্তর করলাম, "সবই সম্ভব বাছা। এ জগতে কতকিছুই হয়, তার কতটাই বা বিজ্ঞান খবর রাখে বা চর্চা করে।" ছেলেটি আবার হেসে হেসে বলতে লাগলো, "আরে এ তো ফিজিক্স-এর কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট থিওরীকে গুলিয়ে খাইয়ে দিল রে! কোন ইউনিভার্সিটির গাঁজা খেয়েছো দাদু?" আমি স্বগতোক্তির সুরে বললাম, "আসলে কি জানো তো হে ছোকরা, পরগাছা স্বর্ণলতা আমগাছের কাণ্ডে শাখাপ্রশাখায় নিজের বিস্তার ঘটিয়ে রঙিন ফুল প্রস্ফুটিত করে। কোনও কোনও ডালে গোছা গোছা ফুলের ঝাঁক যখন শুকিয়ে যায় অন্য শাখাগুলোতে হয়তো তখন নতুন নয়নাভিরাম ফুলের কুঁড়ি দেখা দেয়। কিন্তু যখন দমকা হওয়ায় আমগাছটি নড়ে ওঠে, স্বর্ণলতার নবীন প্রবীণ মধ্যবয়স্ক প্রতিটি ফুলের থোকা তখন একসাথে কেঁপে ওঠে। আমাদের অবচেতন মনে মহাবিশ্বের স্থান কালও খানিকটা সেরকম। আলাদা আলাদা স্পেস-টাইম বলে কিছু হয়না। মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা এই স্থান ও সময়ের জালের মাধ্যমে মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণে থাকা অপর প্রতিটা ঘটনার সাথে সম্পর্কিত। আধুনিক বিজ্ঞানও এর অন্যথা বলেনা। তোমাদের বয়স এখন অল্প। বড় হও, একটু পড়াশোনা করো, তোমরাও এ' সকল বিষয় জানবে। তবে হ্যাঁ, এর জন্য চাই একটু কল্পনাশক্তি ও উদ্ভাবনী মানসিকতা। তবেই সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে তোমাদের কাছে, না হলে ওই পূর্বে আবিষ্কৃত বিষয়গুলিকেই চর্বিত চর্বন করে, নিজেদের বিজ্ঞানী সুলভ দাম্ভিক-এ পরিণত করা ছাড়া কিছুই হবে না।" আমার শেষ কথার অভিব্যক্তিতে ছেলেটি ক্ষান্ত দিলো।

এতক্ষণ অবধি লিসা চুপ করে বসে সব শুনছিল। সে অস্ফুটে বলে উঠল, "ওইজন্য আমার মহিষাদল রাজবাড়ির প্রতি আগ্রহ। বন্ধুদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কলকাতার এত বিখ্যাত পুজো ছেড়ে মহিষাদল যেতে চাইলাম।"

"হ্যাঁ কিশোরী, তোমার পূর্বজন্মের পিতার সেদিনের সেই অতৃপ্ত ইচ্ছাই আজ তোমাকে এখানে টেনে এনেছে, আর ভয় পেয়ো না।"

ইতোমধ্যে শেষ খেয়া আগমনের ঘণ্টা বেজে উঠল। ওদের সবাই খেয়াতে ওঠার তোড়জোড় শুরু করল। একজন মেয়ে ডাক দিল, "লিসা তাড়াতাড়ি আয়, নয় তো এই শেষ লঞ্চটাও মিস হয়ে যাবে। তুইনা মহিষাদল যাবার জন্য উতলা হয়ে উঠেছিলি! এখন দেরি করছিস কেন? তাড়াতাড়ি আয় বলছি।" আমিও বললাম, "কিশোরী এবারে এসো।"

সে জবাব দিল, "হ্যাঁ, আসছি, ধন্যবাদ আপনাকে..." এই বলে সে দ্রুত চলে গেল। যাবার আগে ও আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। আমি দেখলাম পূর্বজন্মের ভয়াবহ ঘটনা এ'জন্মেও তার চোখদুটোকে অশ্রুকণায় ভরিয়ে দিয়েছে। আমারও মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। ওদের দলের একজন সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বলল, "গাঁজাখুরি গল্প ফাঁদছেন, কই নদী তো কিছু প্রমাণ দিল না।" আমি উত্তর না দিয়ে নিশ্চুপ রইলাম। ওরা সবাই চলে গেল খেয়ায়। দূরে দুর্গাপুজোর চণ্ডীপাঠের মন্ত্র শোনা গেল। আর নদী তার আপন খেয়ালে কুলুকুলু ব্যাঙ্গধ্বনিতে ভরিয়ে দিল চারপাশ। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম, নদীরই বা দোষ কোথায়? হয়ত আবহমানকালের সকল ঘটনার, সকল বিয়োগের, সকল আবেগের স্বাক্ষ্য বহন করতে করতে তারও গা সওয়া হয়ে গেছে।

কিচ্ছুক্ষণ পর এই মেঘমুক্ত আকাশেও হঠাৎ যেন অকাল কালবৈশাখী দেখা দিল। ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ল নদীর পাড়ে আর অস্পষ্ট ভাবে যেন সচিদুলালের কন্ঠ আমার মনে অনুরণিত হতে থাকলো - "হ্যাঁ রে মা, আমি অপেক্ষা করেছিলাম এতদিন তোর জন্য। আজ থেকে আমি মুক্ত হলাম...।"

এই বলে দিব্যদাস তাঁর গল্প শেষ করলেন। আমার কাছে কাহিনীটা খুব ইন্টারেস্টিং লাগলো এবং মনে হলো এটাকে নিয়ে একটা সাসপেন্স স্টোরি লিখলে কেমন হয়? আমি তখন এক দোদুল্যমান সময়ের মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। চাকরি বাকরি নেই। শিক্ষাগত ক্যারিয়ারেও তখন ভাটা পড়েছে। ভাবছিলাম লেখালেখিতে হাত পাকালে কেমন হয়?

কিন্তু কিছুতেই স্ক্রিপ্ট খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সত্যি কথা বলতে দিব্যদাসের কাছে শোনা এই ঘটনাটা আমার কাছে একটা আষাঢ়ে অতিকল্পিত গালগপ্পো ছাড়া বিশেষ কিছু মনে হয়নি। কিন্তু সত্যি মিথ্যে যাই হোক, এই লোকটার সাথে থাকতে পারলে স্ক্রীপ্ট-এর যে অভাব হবে না, সেটা বিলক্ষণ বুঝতে পারলাম। আমি দিব্যদাসকে অনুরোধ করলাম আমাকে তার শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে। আমি এমন ভাব দেখালাম যেন আমি ওঁনার তন্ত্রজ্ঞানে মোহিত, ওঁনার মতো একজনকে গুরু হিসেবে না পেলে আমার জীবন বৃথা। সবকিছু শুনে উনি কিছুটা গম্ভীর হয়ে উঠলেন। তারপর অদ্ভুত একটা হাসি দিয়ে বললেন, "তুমি গুরুর খোঁজ না করে গরু খোঁজায় মন দাও বাছা, ওটাই তোমার দ্বারা হবে।" আমি থ বনে গেলাম! উনি কি করে জানলেন! তাহলে উনি কি সত্যিই অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন? আমি ওঁনার কাছে জেদ ধরলাম, আমাকে ওঁনার সাগরেদ হতেই হবে। আমার অনেক অনুনয়ের পর শেষে উনি সায় দিলেন। আর সেই থেকে আমি ওঁনার সাথেই ওঁনার ছায়াসঙ্গী হয়ে কাটিয়ে ফেললাম আমার জীবনের পরবর্তী কয়েকটি বছর। আর আমার পরিচয়ও আজ থাক না হয়। যেসব অত্যাশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি দিব্যাদাসের সাথে এসব কথাও না হয় অন্য কোনোদিন হবে।