
[বিঃ দ্রঃ - ঐতিহাসিক তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা, স্বচ্ছতা, প্রামাণিকতা ও স্পষ্টতা লেখক দাবী করেন না। পাঠক নিজ জ্ঞানে স্বাধীন বিবেচক। ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(এ), ১৪ ও ২১ নং ধারা মান্য।]
ধর্মাধর্ম সমুচ্চয়ম্
।। ২ ।।
ভারতবর্ষকে ভারতীয়রা আবিস্কার করে নি। ভারতবর্ষকে আবিস্কার করেছেন বিদেশী অনুরাগীরা। আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম, লুডার, ওটো অস্টিন, জি. ডব্লিউ. ব্রিজ, গয়সা দ্যতোসি, ম্যাক্স মুলার, ভাস্কো দ্য গামা, ফা হিয়েন, হিউয়েন সাং, মেগাস্থিনিস প্রভৃতি বিদ্বজ্জন।
অতীত ইতিহাসের পাতায় ক্রিস্টোফার কলম্বাস ভারত আবিষ্কার করতে সমুদ্র যাত্রা শুরু করে পৌঁছে যান আমেরিকায়। তিনি ইটালিয়ান ছিলেন এবং পর্তুগালের রাজার কাছে ইন্ডিয়া যাত্রার অনুমতি না পেয়ে স্পেনের রাজার কাছে আবেদন জানান এবং তাঁকে ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের ভাইসরয় নিয়োগ করা হয়। তিনি যেখানে নোঙর করেন, সেখানে গিয়ে যাদের দেখা পেয়েছিলেন, তাদের তিনি ইন্ডিয়ান বলে অভিহিত করেন।
সময়কাল: ১৪৯২ সাল
তারিখ: ১২ অক্টোবর
স্থান: আমেরিকার বাহামা দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ, যার নাম রাখেন 'সান সালভেদর' বর্তমানে ওয়াটলিং। এটাই কোনও ইউরোপিয়ের প্রথম পাশ্চাত্য আবিষ্কার। কলম্বাসের বিশ্বাস: তিনি মনে করেছিলেন তিনি ভারতে পৌঁছেছেন, তাই সেখানকার অধিবাসীদের 'ইন্ডিয়ানস' বলে ডাকতেন। আজ তাদেরকে রেড ইন্ডিয়ান বলে। কলম্বাসের এই অভিযান আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয়দের একটি নতুন যুগের সূচনা করে।

ক্রিস্টোফার কলম্বাস
প্যারিসে বসে গয়সা দ্যতোসি ভারতের সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে লিখছেন, আর সেখানে কবি, সন্ত রবিদাসকে নিয়ে লিখছেন, অথচ বেনারসের সন্ত রবিদাসকে অবহেলা করে এড়িয়ে গিয়েছেন হিন্দি সাহিত্যের ইতিহাস লেখক শিব সিং সিঙ্গর। ভারত থেকে অসংখ্য পুঁথি কপি করে নিয়ে গেছেন চীন, তিব্বত ও জাপানের পর্যটকরা, তাই ভারতবর্ষের পরিচয় মানে গান্ধী নয়। নেহেরু নয়। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নয়, জনসংঘ, আর এস এস নয়। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী নয়। আর্য জাতির ইতিহাস নয়। ভারতবর্ষের পরিচয় হল, আদিবাসী মূলনিবাসীর পরিচয়। সিন্ধু সভ্যতার পরিচয়। সিন্ধু নদীজোট, গঙ্গানদীজোট কৃষ্ণা-কাবেরী জোটের ইতিহাস। ভারতের পরিচয় হল, অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ গান্ধার মগধ অবন্তী কম্বোজের ইতিহাস। ভারতবর্ষের ইতিহাস হল বুদ্ধ, পৌরব, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও অশোকের ইতিহাস।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে বৈদিক সভ্যতার কোন আর্কিওলজিক্যাল এভিডেন্স নেই। ইতিহাসের সত্যতা যাচাই করার একমাত্র তুলাদন্ড হল উক্ত বিষয়ে এভিডেন্সের বিপরীতে ক্রস এভিডেন্স খতিয়ে দেখা। অর্থাৎ এই সভ্যতা গল্প কাহিনিতে আছে কিন্তু বাস্তবে ছিল না। আরও স্পষ্ট করে বললে - মননে আচরণে ছিল। কাল্পনিক রূপে আছে। আর্যরা ছোটনাগপুরের দুর্গম বনভূমি ও বিপদসঙ্কুল নর্মদা নদী পেরিয়ে দক্ষিণ ভারত পৌঁছাতে পারে নি। পরে অবশ্য ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার বিকাশ ঘটে, সেটাও আবার বর্ণ সংকর। বৈদিক সময়কাল ১৪০০ খ্রীঃ পূর্বাব্দ থেকে ৬০০ খ্রীঃ পূর্বাব্দ ধরলে, ৮০০ বছর ধরে। এর মাঝেই বিকাশ ও বিনাশ সংঘটিত হয়েছিল। সুকিতি বা গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবে বৌদ্ধ সভ্যতা পুনর্জীবিত হয়। যা পুশ্যমিত্র শূঙ্গের বৌদ্ধ হত্যার মধ্য দিয়ে আবার বৌদ্ধ সভ্যতা ভারতের মাটিতে হীন এবং ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
বেদ, ব্রাহ্মণ, দেবদেবী উত্তরমেরু থেকে এসে আরাবল্লী পর্বত ডিঙিয়ে ভারতবর্ষে অনুপ্রবেশ করেছিল।
বিতর্ক হল, হরপ্পা সভ্যতা নাকি বৌদ্ধ সভ্যতা! স্বামী শঙ্করানন্দ লেখেন - "রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯২২-২৩ সালে শরৎকালে একটি বৌদ্ধ বিহার খনন করেছিলেন" (বৌদ্ধ ধর্ম: হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো শহরের ধর্ম; স্বামী শঙ্করানন্দ, পৃষ্ঠা: ১৪৪) এখানে অনেক প্রশ্ন উঠে আসে যার উত্তর গিয়ে শেষ হয় হরপ্পার জীবন চর্চা ও সামাজিক কাঠামোতে। যার সাথে বৈদিক নামে কল্পকথিত সভ্যতার কোনও সামঞ্জস্যতা নেই। কাজেই বোঝা যাচ্ছে রামায়ণ, মহাভারত, বৈদিককাল সব কাল্পনিক ও মিথ্যা।
ঊনবিংশ শতকে হরপ্পা সভ্যতার খোঁজ মেলে। অবন্তী থেকে শ্রাবস্তী, খনন কার্য চালিয়ে দেখা যায়, সমস্ত স্থানে বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। খ্রীঃপূর্বাব্দ দেড় হাজার বা তারও আগেকার হরপ্পা সভ্যতার নিদর্শনগুলোর সাথে মৌর্যকালীন সভ্যতার অদ্ভুত মিল রয়েছে।হরপ্পা ও ঢোলাবীরা স্তূপ - মৌর্যকালীন স্তূপ। হরপ্পার স্তূপ - শ্রাবস্তী স্তূপ। হরপ্পার সিংহ - মৌর্য সিংহ। হরপ্পার হাতি - মৌর্য হাতি। এদের মধ্যে অদ্ভুত মিল!
আরও দেখা যায়, হরপ্পার মৃৎপাত্রে পাকুর গাছের পাতা উৎকীর্ণ। এই পিপল পাতা গৌতম বুদ্ধকে নির্দেশ করে। তার আগের কোনও কোনও বুদ্ধের প্রতীকও ছিল এই পাতা। বিহারে বারবারা বৌদ্ধ গুহা সম্রাট অশোক নির্মাণ করান আজীবকের উদ্দেশ্যে। গুহামুখে অসংখ্য পিপল পাতার ছবি।
হরপ্পার মৃৎপাত্রে সিংহ চিত্র বসে থাকা অবস্থায় দৃঢ় অথচ অহিংস্র যার সাথে মৌর্যকালীন বসে থাকা সিংহের অদ্ভুত মিল। হরপ্পায় প্রাপ্ত পুরুষ মূর্তির অর্ধ নিমীলিত চোখ, কপালে বিন্দু চিহ্ন, গায়ে চিবর মনে করিয়ে দেয় বুদ্ধের প্রতিকৃতিকে।
হরপ্পার স্তূপের সাথে মৌর্যকালীন শ্রাবস্তীর স্তূপের অদ্ভুত মিল। দুই সভ্যতার মধ্যে আড়াই তিন হাজার বছরের পার্থক্য তবুও। এগুলো প্রমাণ করে যে হরপ্পা সভ্যতা একটি বৌদ্ধ সভ্যতা ছিল। মৌর্যকালখণ্ডের চেয়ে দুই তিন হাজার বছর আগে ছিল হরপ্পা সভ্যতা। এই অদ্ভুত মিলের কারণ হল পরম্পরাগত অভ্যাস।

আর্যদের আগমন বা আক্রমণ ঘটে ১৪০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ নাগাদ। আর ২৩তম বুদ্ধ কাকুসন্দের আবির্ভাব ৩১০১ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে। অর্থাৎ আর্যদের আগমনের এক হাজার সাতশো বছর আগে। যাকে তস্করেরা ঋষি রূপে পরিচয় দিয়েছে। কোনাগামনা বুদ্ধের সময়কাল ২০৯৯ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ। একে কনকমুনি বলা হয়েছে। কাশ্যপ বুদ্ধের কাল ১০১৪ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ। আর্যানুপ্রবেশের পর এই বুদ্ধের আবির্ভাব। জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটির জুন সংখ্যায় মেজর ফোর্বস এই তথ্য দিয়েছেন। পরম্পরাগতভাবে বৌদ্ধিক সভ্যতার সাথে আর্য সভ্যতার ঘনিষ্ঠতা থেকেই বিভিন্ন বুদ্ধদের আর্যানুগত করে নেওয়া হয়েছে, যেভাবে আধুনিক কালেও বিভিন্ন বৌদ্ধ মঠ ও স্থলকে ব্রাহ্মণ্য আচারে পরিনত করা হয়েছে।
পুরীর জগন্নাথ মন্দির আসলে বৌদ্ধ মঠ এবং এ বিষয়ে বিবেকানন্দ যা বলেছেন - "দুই এক বৎসর পূর্বে একজন রুশীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি পুস্তক প্রকাশ করেন; তাহাতে তিনি যীশু খ্রীষ্টের একখানি অদ্ভুত জীবনচরিত পাইয়ছেন বলিয়া দাবী করিয়াছেন। তিনি সেই পুস্তক খানির এক স্থলে বলিতেছেন, খ্রীষ্ট ব্রাহ্মণদের নিকট ধর্মশিক্ষার্থ জগন্নাথ মন্দিরে গমন করেন, কিন্তু তাহাদের সংকীর্ণতা ও মূর্তি পুজায় বিরক্ত হইয়া তথা হইতে তিব্বতের লামাদের নিকট ধর্মশিক্ষার্থ গমন করেন এবং তাহাদের উপদেশে সিদ্ধ হইয়া স্বদেশে প্রবর্তন করেন। যাঁহারা ভারতের ইতিহাসের কিছুমাত্র জানেন, তাহাদের নিকট পূর্বোক্ত বিবৃতি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পুস্তক খানি আগাগোড়া প্রতারণা। কারণ জগন্নাথ মন্দির একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির। আমরা ঐটিকে এবং অন্যান্য বৌদ্ধ মন্দিরকে হিন্দু মন্দির করিয়া লইয়াছি। এইরূপ ব্যাপার আমাদিগকে এখনও অনেক করিতে হইবে।" (বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা)
যিশুর জীবনের একটা সময়কাল রহস্যে ভরা। তার ক্রুশবিদ্ধ হবার তৃতীয় দিন তাকে স্বস্থানে পাওয়া যায় নি এবং তার সমাধি স্থলও নির্মিত হয় নি। কিন্তু কাশ্মীর ভ্যালির এক বৌদ্ধ মঠে তার সমাধি বর্তমান বলা হয়! এ বিষয়ে অজ্ঞাত বিবেকানন্দ উক্ত ঘটনাকে অস্বীকার করেছেন তার প্রমাণ কি!
জগন্নাথ মন্দির হল বৌদ্ধ মন্দির?
ভাবতে হবে এমন কী রহস্য আছে যে বেলুড়ে 'মঠ' করতে হল! এমন কি রহস্য আছে যে রামকৃষ্ণের নামে 'মিশন' করতে হল! মঠ হল বৌদ্ধ এবং মিশন হল খ্রিস্ট্রীয় উপাসনা ও কর্ম স্থল সেই নরেন্দ্রনাথ দত্ত, যাকে ভারতের হিন্দু ধর্মের মুখিয়া তৎকালীন শঙ্করাচার্য শিকাগোতে ভাষণের অনুমতি দেয় নি, শুদ্র হবার জন্য। ভারতে ফিরলে তাকে স্বাগত জানায়নি বাংলার উচ্চ বর্ণের পণ্ডিতবর্গ বরং তিরস্কার করেছিল। বিখ্যাত জজ সাহেব ও প্রখ্যাত সমাজসেবী গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় শিকাগো ফেরত স্বামীজির সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করতে অস্বীকার করেন। স্বামীজির মৃত্যুর পর শোক সভাতে সভাপতিত্ব করতে অনুরোধ করলে তিনি বলেন - "দেশে যদি হিন্দু রাজা থাকত, তবে শুদ্র হয়েও সন্ন্যাসী হবার অপরাধে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হত।" (বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ; শঙ্করীপ্রসাদ বসু; খণ্ড-৪; পৃষ্ঠা: ৬২)
এখানেই শেষ নয়, রামকৃষ্ণদেবের মৃত্যুর পর বিবেকানন্দ দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে প্রবেশ করলে, লেখকের ভাষায় - "স্বামী বিবেকানন্দ মন্দিরে ঢুকেছিলেন বলে দেবীর পুনরাভিষেকের প্রয়োজন হয়েছিল।" (সূত্র ঐ; পৃষ্ঠা: ১৫৫)
সেই জন যাকে শ্রীলঙ্কার ভিক্ষু অনাগরিক ধম্মপাল সেদিন শিকাগোতে নিজের সময় থেকে পাঁচ মিনিট না দিলে কি নরেন্দ্রনাথ বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনের মঞ্চে দাঁড়াতে পারতেন? কি উদ্দেশ্য নিয়ে মঠ ও মিশন নির্মাণ করান তিনি?


১৮৯৩ সাল। বিবেকানন্দ এক পত্রে আলাসিঙ্গাকে লেখেন - "হিন্দু ধর্ম যেমন পৈশাচিক ভাবে গরীব ও পতিতদের গলায় পা দেয়; জগতের আর কোনও ধর্ম এরূপ করে না।" এটা কি তার উপলব্ধি! নাকি ছলনা?ব্যক্তিগত ভাবে কোনও ব্রাহ্মণ বর্ণের সাথে আমার বিরোধ নেই। অসংখ্য কৃতি ব্রাহ্মণের সাথে আমার যথেষ্ট হার্দ্যতা আছে আজোবধি। বিরোধ হল গোঁড়মী আর শাস্ত্রীয় বিধি ও জেনেটিক অহমিকার চরম প্রদর্শনে। যাতে করে ব্রাহ্মণ জজ সাহেব বিবেকানন্দকে ফাঁসিতে ঝোলানোর ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। যে প্রকারে রামচন্দ্র ঋষি শম্বুককে হত্যা করে, তাও এক ব্রাহ্মণের ইচ্ছেই।আচ্ছা, মোগল আমলের বৈদিক ধর্মে সন্ন্যাস বলতে যা বোঝানো হত, তা ছিল জীবনের শেষ ভাগে স্বর্গ লাভের জন্য প্রার্থনা করা।প্রকৃত অর্থে সন্ন্যাস বলতে বৌদ্ধ জীবন দর্শনে ভিক্ষুরা একান্তে আত্ম সন্ধানে মত্ত থাকে। তাই আধ্যাত্মিক জীবন চর্চায় কারুর একার পৈতৃক অধিকার নেই। ব্রাহ্মণ্য মতে তো নয়, কারণ বৈদিক নামে কথিত সমাজে যজ্ঞই একমাত্র কর্ম। সেখানে ধ্যান ধারণা সমাধির কোনও তাৎপর্য নেই। পরে কঠোপনিষৎ এ যা কিছু নেওয়া হয়েছে তা বৌদ্ধ শ্রমণ জীবন ধারা থেকে। শম্বুক ব্রাহ্মণ্য ধর্মানুসারী ছিলেন মনে হয় না।

অনাগরিক ধম্মপাল-এর সাথে বিবেকানন্দ।

পুরীর জগন্নাথ মন্দির প্রসঙ্গে আরও বলা যায়। "বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ মূর্তি ভেঙে জগন্নাথ দেবের নবজন্ম হয়েছে।" (History of Ariyan power of India; এম. হুইলার; পৃষ্ঠা: ২১০, 1st edition)
"পুরীর বৌদ্ধ বিহার বিজয় সেনের আমলে ধ্বংস হলে সেখানে জগন্নাথ মন্দির গড়িয়া ওঠে মূলত বল্লাল সেনের আমলে।" (Ancient history of India; রজনী পাম দত্ত; পৃষ্ঠা: ৫৮, 11 edition)
"আনুমানিক ১০৯৫ খ্রীষ্টাব্দে হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন পাল রাজা কুমার পালকে গৌড় বঙ্গ হইতে সমূলে উৎপাটিত করিয়া জাঁকিয়া বসেন। প্রায় সাত হাজার বৌদ্ধ বিহার ভাঙিয়া ও অগণিত নর নারী হত্যা করিয়া তাঁহার বিজয় রথ থামে। ঠিক সেই সময় কালেই পুরীর জগন্নাথ মন্দির গড়িয়া ওঠে।" (ভারতের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পকলা; ননীগোপাল মজুমদার; পৃষ্ঠা: ১৯৩, 3rd edition)
"রাজার আদেশে রাজরক্ষীরা মঠ, বিহার ধ্বংস করিল, বুদ্ধ নামাঙ্কিত ম্লেচ্ছ - অন্ত্যজদিগকে হত্যা করিয়া গৌর বঙ্গে বৈদিক ধর্মের বিজয় তোরণ উড়াইল।" (দুর্গোৎসব নির্ণয়; সভাকবি বিজয় সেন, জীমূতবাহন, ৪র্থ অধ্যায়, শ্লোক নং. ২২)
ইতিহাসকার এ. এল. বাসাম ১৯১০ সালে বলেন কোণার্কের সূর্য মন্দির সম্রাট অশোক নির্মিত কনহক বুদ্ধ (কনকমুনি বুদ্ধ) স্তূপ। এবং পুন্ডরিক গৌতম বুদ্ধ স্তূপ সাদা পাথর নির্মিত। বুদ্ধের মাতাকে নৈঋত কোণে রাখা হয়েছে অন্যান্য স্তূপে, একই ভাবে কোণার্কের মন্দিরেও নৈঋতি মাতা নামে মহামায়াদেবীর মূর্তি আজ রামচণ্ডী। (Konark: The Black Pagoda of Orissa; Bishan Swarup; p. 65-71)

মৌর্য কালীন বৃষ। রাস্ট্রপতি ভবন প্রাঙ্গণ।
এই তথ্যগুলো বিবেকানন্দের বক্তব্যকে আরও দৃঢ় করে। ১৮৭২ সালে বোম্বের জনগণনা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, তখন ব্রাহ্মণরা হিন্দু নামে পরিচিত ছিল না। ব্রাহ্মণ বলেই পরিচিত ছিল। তাদের সাথে জৈনদের যোগ করে তারা সংখ্যায় ছিল মাত্র ৪%। অন্যান্য হিন্দু বলে একটি শ্রেণি ছিল ৫২.৯০%। জাতিবিহীন হিন্দু আউট কাস্ট নামে পরিচিত যারা ছিল তারা সংখ্যায় ৪.৮৬%। এদের অচ্ছূত রূপেই পরিচিতি ছিল। (Table 6.2; Bombay City GBCI, Vol. I; p.164) শিকাগোর বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনের আইকোনিক পোস্টারে হিন্দু ধর্ম বলে কিছু ছিল না। ছিল বৌদ্ধজম, ব্রাহ্মণ্যিজম, মোহম্মদিজম ইত্যাদি।
নিরঞ্জন, সনাতন, জগন্নাথ, দেবদেব (দেবাদিদেব), সামনেন (শ্রমণ), এই শব্দগুলো সব পালি প্রাকৃতে বুদ্ধকে নির্দেশ করে। ত্রিপিটকে বলা হয়েছে - "ন হি বেরেন বেরানি সম্মন্তীধ কুদাচনং। অবেরনং চ সম্মন্তি এস ধম্ম সনন্তনো।" অর্থাৎ শত্রুতার দ্বারা শত্রুকে জয় করা যায় না। মিত্রতার দ্বারাই শত্রুকে জয় করা যায়। এটাই সনাতন ধর্ম। এই বুদ্ধবানী আজ চুরি হয়ে গেছে। বেদে কোথাও এমন শত্রু জয়ের কথা নেই। শত্রুকে হিংস্রতার দ্বারা জব্দ করা আর্য সংস্কৃতির মূল স্বরূপ।

একটি অজ্ঞাত বুদ্ধ মূর্তি।
পালি ভাষায় তিপিটকে (ত্রিপিটক) মূল শব্দ বিদ্ > বেদ। বেদনা। বেদগু। বেদিয়তং। বেদয়ামি। বেদয়মানো। বেদ অর্থ সম্মক (সম্যক)। অর্থ অনুভব। পালি বিশেষণ। (বৈদিক যুগ কা ঘালমেল; রাজীব প্যাটেল; পৃষ্ঠা: ১৪০)। কেন বলা যাবে না, বৌদ্ধিক থেকে বৈদিক কথাটা আমদানি করা হয়েছে? এবং এটাই সত্য প্রতীতি হয়। আর্যদের অস্তিত্বই মিথ্যার উপর, মিথ্যাচারের উপর টিকে রয়েছে। রাম শরণ শর্মা লিখিত ডকুমেন্টারি থেকে জানা যায় আর্য কথার অর্থ হল দাস। এরা ফিনিশিয়দের দাস ছিল। সাধে কি আর.এস.এস. সংস্থাপক হেগড়েকার বলেছিল, আমরা উত্তর মেরুর লোক। (Branch of Thought; Hegdekad) ফিনল্যান্ড সেই উত্তর মেরু। আরও একজন জনপ্রিয় নেতা কাবুল গিয়ে বলেছিল আমি আমার পিতৃভূমি এসে গর্ববোধ করছি। আরেকজন রাজা তো লন্ডনে গিয়ে সেটাকে পিতৃভূমি বলেছিলেন। যাইহোক তারা যেখানেই বসবাস করুক সেই দেশ তার নিজের দেশ নয়। তারা দখলদার তাই পিতৃভূমির প্রতি এত টান ও আবেগ। যাইহোক অপরদিকে সংলগ্ন রাশিয়া। রুশী ভাষা ও শব্দের সাথে পালি প্রাকৃত শব্দের মিল না থাকলেও সংস্কৃত শব্দের গভীর মিল দেখা যাবে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি ফিনিশিয়রা রাশিয়া থেকে দাস সংগ্রহ করত?
তাহানকারা (তীর্থংকর) বুদ্ধ হলেন প্রথম বুদ্ধ। এই নিরিখে হরপ্পা সভ্যতা ৪৫০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ থেকে আরও বেশি পুরোনো। সরংকারা বা শঙ্কর বুদ্ধই কি শিব শংকর এ নিয়েও অনেক ভিন্নমত দেখা যায়? দ্রাবিড় ভাষায় কজন বুদ্ধের নাম পাওয়া যায়। পুদুমা, পুদুমুত্তোরা, মংগালা, তিস্সা। এরা সব গৌতম পূর্ববর্তী।
কর্নেল টড ও অন্যান্য গবেষকগণ মনে করেন, হরপ্পা সভ্যতা শুধু মাত্র বৌদ্ধিক সভ্যতা নয়, এই সভ্যতার উত্তরসূরী 'চামার বংশ'। George Weston Briggs ১৮৭৪ সালে গবেষণা করে লেখেন 'The Chamar'. এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে, ক্যালকাটা অ্যাসোসিয়ান প্রেস থেকে। সংগ্রহক রবার্ট টরন্টো। 'History of the Chamar Dynasty'-তে ১২ থেকে ৬ষ্ঠ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ কালের কথা উল্লেখ করেছেন লেখক ড. রাজ কুমার। মহাভারতের অনুশাসন পর্ব ৩৫-এর ১৭-১৮ নম্বর শ্লোককে উদ্ধৃত করলে দেখা যায়, দুই কোটি ছাপ্পান্ন লাখ ৯৭ হাজার বর্ষ ভূমন্ডলে চঁবর বংশের রাজত্ব ছিল। চমর পুরাণে ভদ্রসেনের ৯৭২তম প্রজন্ম সূর্যসেন হলেও চমর সেনেই প্রথম রাজা ছিলেন। এসব কথা যুক্তিগ্রাহ্য নয়। তবে কিছু বাস্তবতা অবশ্যই আছে যার উপর ভিত্তি করে পুরাণ নামক কাল্পনিক গ্রন্থগুলো লেখা হয়েছে।
ব্রাহ্মণ (হিন্দু) ধর্মে পুরাণ ১৮টি । ১. ব্রহ্ম, ২. পদ্ম, ৩. বিষ্ণু, ৪. শিব, ৫. ভাগবত, ৬. নারদ, ৭. মার্কণ্ডেয়, ৮. অগ্নি, ৯. লিঙ্গ, ১০. ব্রহ্মবৈবর্ত, ১১. ভবিষ্য, ১২. বরাহ, ১৩. স্কন্দ, ১৪. বামন, ১৫. কূর্ম, ১৬. মৎস্য, ১৭. গরুড় ও ১৮. ব্রহ্মাণ্ড। ব্যাসদেবকে এগুলোর রচয়িতা মনে করা হয়। এই ১৮টি পুরাণের মধ্যে একটি হল হলো 'ভবিষ্যপুরাণ' যাতে মহারানী ভিক্টোরিয়া ও বৃটিশ শাসনের কথা উল্লেখিত। এবার প্রশ্নটা খুব সোজা,
১) পুরাণ কখন লেখা হয়েছে?
২) ব্যাসদেবের জন্ম কত সালে হয়েছে?
৩) ব্যাস কি বৃটিশ আমলে জন্মেছিল?
৪) নাকি পাঁচ হাজার বছর আগে ভারতে বৃটিশদের শাসন চলেছিল?
উত্তর আরও সহজ। ওই সব পুরাণ বৃটিশ সরকারের শাসনকালে লেখা হয়, আর সেগুলো যে পুরোনো তা প্রমাণ করতে নাম রাখা হয় পুরাণ। আগে একবার বলেছি বাল্মীকির রামায়ণে গৌতম বুদ্ধকে গালাগাল করা কি প্রমাণ করে না রামায়ণ আধুনিক সভ্যতায় লেখা গ্রন্থ। তাকে প্রাচীন প্রমাণ করতে বলা হয়েছে রাম জন্মের ষাট হাজার বছর আগে লেখা হয়েছে রামায়ণ! তাহলে প্রমাণিত হয় বুদ্ধ ষাট হাজার বছর আগে থেকে উপস্থিত। যদিও মানব সভ্যতার আধুনিক ইতিহাস সাড়ে তিনশো বছরের পুরোনো। আর চার হাজার বছর আগে তারা প্রথম তামা বা আরও পরে লোহা আবিস্কার করে।
চবঁর পুরাণের কথা ছেড়ে দিলে, কর্নেল টড ও জর্জ ব্রিজের গবেষণাকে অনুসরণ করে দেখা যায় বৃটিশ সরকার গোর্খা রেজিমেন্ট সহ 'চামার রেজিমেন্ট' গঠন করে যা ১৯৪৩-৪৬ সালে দুর্ধর্ষ জাপানি যোদ্ধাদের সাথে লড়াইয়ে অ্যাকটিভ ছিল ও কোহিমা, কামো, টোকিও, ইম্ফল, মান্ডালা, রেঙুন, সিঙ্গাপুর, বর্মা ব্যাটেলিয়নে বিভক্ত ছিল। এই রেজিমেন্টের প্রতীক চিহ্ন একটি দুর্ধর্ষ 'বৃষ'। তার অর্থ বৃটিশরা ভালোই জানত চামার সভ্যতা ভারতীয়দের মূল সভ্যতা। হরপ্পার 'ষাঁড়' বা বৃষ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক যার সাথে মহাদেব শিব সয়ম্ভূর সম্পর্ক রয়েছে।
পশ্চিম চম্পারণ জেলার বিহার নেপাল সিমান্তে রামপুরবা গাঁও। ১৮৭৬ সালে এ সি এল কার্লাইল দ্বারা খননের ফলে মৌর্যকালীন অশোক স্তম্ভের সহিত একটা 'ষাঁড়' ও একটা সিংহের মূর্তি পাওয়া যায়। সিংহটি কলকাতা যাদুঘরে স্থিত আর ষাঁড়টি রাস্ট্রপতি ভবনের সদর প্রাঙ্গণ, নয়া দিল্লিতে। ভারতের মূল রাজপাট চলে চামার বংশের নামেই। হরপ্পা থেকে দিল্লি। অশোক স্তম্ভ, অশোক চক্র, অশোক বৃষ। এগুলো তারই প্রমাণ। এখানে উল্লেখ্য যে "কালা বামন গোরা চামার" হিন্দি প্রবাদের অর্থ - চাণক্য আর চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কে নির্দেশ করে বলা হয়। চাণক্য ছিল কৃষ্ণ বর্ণ ব্রাহ্মণ অপরদিকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ছিলেন গৌরবর্ণ রাজা। আর আজও যে ভারতের সর্বোচ্চ সন্মান 'ভারতরত্ন' দেওয়া হয় তা মহারাষ্ট্রের জুন্নার অঞ্চলের সুলেমান বৌদ্ধ গুহায় খোদিত প্রতীকের প্রতিকৃতি। যা মূলতঃ মৌর্যকালীন।
পুরাণ মতে কাশ্যপ হলেন হৈহয় বংশের পঞ্চম পুরুষ। তার পুত্র সূর্য থেকে চঁবর বংশের উত্থান। যাকে আজ আমরা চামার বলে গালাগাল দিয়ে থাকি। অবশ্য আমরা সবাই হিন্দু বলে নিজেদেরই গালাগাল করি, সে অন্য কথা। পারসি ডিকশনারিতে হিন্দু শব্দের অর্থ এসেছে চোর, জোচ্চোর, নীচ; পারসি ভাষায় 'স' এর ছড়াছড়ি রয়েছে। শ-স-ষ, বাংলায় তিন প্রকার হলেও পারসিতে চার প্রকার। সিন স, শন শ, স্বদ ষ ও স' এর হাল্কা উচ্চারণ - ষা। তাহলে সিন্ধু থেকে হিন্দু উচ্চারণ আসেনি, একথা স্বতঃসিদ্ধ। সিন্ধু নাগরিকদের সিন্ধ্রি বলে। পারসি হিন্দু শব্দটার আভিধানিক অর্থ - ঠক, অবিশ্বাসী, প্রতারক। (হায়ত কুলষুম; খণ্ড ৩; পৃষ্ঠা: ৯৮-৯৯; বাহারে আযম; খণ্ড ২; পৃষ্ঠা: ৪৯৭-৪৯৮)
এদিকে 'চামড়া' আর 'চামরা' দুটি ভিন্ন শব্দ। যদিও বাংলায় প্রাচীন কালে 'র' লিখতে হত 'ড'। শব্দের শেষে হলে র' উচ্চারণ করতে হতো আর শুরুতে হলে ড' উচ্চারণ করতে হতো। কিন্তু বর্তমানে এর উচ্চারণগত পার্থক্য তৈরি হয়েছে। চামর নামে একটি বস্তু, সাধারণত চমরী গাইয়ের লেজের লোম দিয়ে তৈরি এক প্রকার পাখা বা ব্যজন বোঝায়, যা বাতাস করার জন্য বা রাজকীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একে 'চৌরি' বা 'ব্যজন'ও বলা হয়। চামড়া মানে ত্বক, ছাল বা বক্বল। চামড়া কথাটি প্রথম ব্যবহার করে ইব্রাহিম লোদি। সন্ত রবিদাস এর পরিভাষা বদলে দিয়েছেন এই বলে যে, "চা=চাম, মা=মাস, র=রক্ত (অরু)। - "অস্থি অরু মাস তনকা মিলে আকার, আঁখ পসারে দেখ সারা জগ চামার।"
"চাম কা হাতি চাম কা রাজা, চাম কা উট পর চাম কা বাজা।"
"চাম কা মন্দির বলে রাম।"
দেখুন, চামের শরীর রাম নাম গাইছে। চামের হাতিতে বসে রাজাও চামের। চামের উটে চড়ে যে বাদ্য যায় সেটাও চামের। আসলে রক্ত মাংস অস্থি দিয়ে তন বা শরীর নির্মিত। আমরা লাক্স, পন্ড সাবানগুলো চামড়াতেই ঘষি।যাইহোক, সূর্যের আর এক পুত্র মনু। মনুসংহিতার উদ্গাথা তিনি নন। তিনি সপ্তম পুরুষ। সূর্যের পিতা কাশ্যপ। যুবনাশ্ব পুত্র ইক্ষাকু বা ইক্ষুবাকু হলেন তেরোতম পুরুষ, যার থেকে ইক্ষাকু বংশের সৃষ্টি। যুবনাশ্ব (২য়) হলেন আঠারোতম, যার গর্ভে মান্ধাতার জন্ম। কেমন আশ্চর্য! পিতার গর্ভে পুত্র সন্তান! তার জন্ম হল জঙ্ঘা চিরে।এর পর আর্যাবর্ত চব্বিশতম যার পুত্র ভরতের নামে আজকের ভারত দেশ। মনে হয় এখান থেকেই আর্যদের আবির্ভাব। তার এভাবে ৩১তম সগর রাজা, তার পুত্র হরিশ্চন্দ্রকে নিঃস্ব করে ছেড়েছিল ঋষি বিশ্বামিত্র। উত্তরসূরী ভগীরথ ৩৭তম, যিনি গঙ্গাকে মর্ত্যে নিয়ে আসেন। তার উত্তরসূরী দশরথ পুত্র রাম ৪৩তম পুরুষ। চল্লিশ পুরুষ আগে পরশুরামের পিতা জামদগ্নীকে হত্যার অপরাধে একুশ বার ক্ষত্রিয় নিধন করে পরশুরাম। ইক্ষাকু বংশেরই কৃতবীর্যের পুত্র কার্তবীর্যার্জুনের পুত্রেরা পালিয়ে এসে এই মান্ধাতা দ্বীপে আশ্রয় নেয়। তাদের এখানে এসে হত্যা করে পরশুরাম। এখন প্রশ্ন হল - মান্ধাতার পঁচিশ পুরুষ পরে রামের জন্ম। রামের মৃত্যুর পর একটা কালখণ্ড আছে, যেখানে লবকুশ, ভরত পুত্র পুস্কলরা রাজত্ব করে। এর পরেই আসে দ্বাপর যুগ। তবে মান্ধাতার পঁচিশ পুরুষ পরে এই দ্বীপের জন্ম না পঁচিশ পুরুষ আগে?
অন্য গল্পে পরশুরাম বাণ নিক্ষেপ করছে, আর রেনুকা তার বউ বহুদুর থেকে বাণ খুঁজে এনে দিচ্ছে। রেনুকার বিলম্বে পরশুরামের খুব রাগ হচ্ছে, বউকে বকাবকি করছে। এতে স্ত্রী বলল আমি কি করব! এত রোদ! পা পুড়ে যায় যে। তাই ছায়ায় বার বার দাঁড়িয়ে তবে আসছি। একথা শুনে পরশুরাম সূর্যকে বাণবিদ্ধ করে নামাতে চাইলে, ভীত সন্ত্রস্ত সূর্য প্রপিতামহের সামনে উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে একটা ছাতা আর একজোড়া জুতো উপহার দিলেন। এখান থেকে চঁবর বংশের উত্থান। এই কাহিনী মহাভারতে আছে।
এখন পর্যন্ত হিন্দু শব্দ যেমন গালি সূচক শব্দ, চামার শব্দ ঠিক তেমনি হলেও আসলে সঠিক শব্দ হল - 'চঁবর'। এরাই হরপ্পা সভ্যতার মূলনিবাসী এতে সন্দেহ থাকে না। মহাভারত লেখক ব্যাস এদের ক্ষত্রিয় বলে উল্লেখ করেছেন। ক্ষত্রিয় শব্দটা পালি ভাষায় ত্রিপিটকে খত্তিয় বলা হয়েছে। যার অর্থ কৃষিজীবী আর আর্যরা কৃষিকাজ জানত না। যজ্ঞ করে অগ্নিকে হব্য দিয়ে ঝলসানো মাংসই ছিল ভক্ষ্য। এখন বৈদিক আচার আগে না শ্রমণ বিচার এটা ব্যাপক আলোচনার দাবি রাখে। রামায়ণ মহাভারতের কাহিনিতে বর্ণপ্রথার উল্লেখ মেলে। মজার বিষয় ঋষি বাল্মীকি গৌতম বুদ্ধকে অপমান জনক কথা বলেছেন রামায়ণে! আবার সেই অনুযায়ী তুলসীদাস মীননাথ ও গোরক্ষনাথকে অপমান করে রামচরিত মানস-এ, এবার তো অনেক প্রশ্ন চলে আসে, রামায়ণ মহাভারত কবে লেখা হল? সাতশো খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে ব্রাহ্মণ শব্দ ব্যবহার হত কি? তীর্থক শব্দের স্থান দখল করে নেয় না তো ব্রাহ্মণ শব্দ? যদি ব্রাহ্মণের ভাষা সংস্কৃত হয়, এবং সংস্কৃত থেকে সব ভাষার সৃষ্টি হয় তবে, সংস্কৃত বর্ণমালার কোন নিজস্ব পরিচয় কোথায়? কয়েক শতক আগে সৃষ্টি দেবনাগরী লিপিই বর্তমান সংস্কৃত লিপি। এর প্রাচীনত্ব আজও প্রমাণ হয় নি। 'ইউনেস্কো'কে ভারত সরকার যে তথ্য তুলে দিয়েছে তা ১৯৯৭ থেকে ২০১৭-র মধ্যে। ২০০৭ সালে, শৈব ও ঋগ্বেদের কিছু অংশ বিশেষ যা মূলত সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকের লেখা, দেবনাগরী হিন্দি হরফে; তার ক'টি শ্লোক জমা দেওয়া হয়েছে। কাজেই বোঝা সহজ যে একটা ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী ভারতের মূল ইতিহাসের সাথে প্রতারণা করেছে।
মহাভারতে যখন বলা হয়েছে ত্রেতা ও দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে মহেন্দ্র পর্বত উত্থিত, রামায়ণ ও মহাভারতের কালখণ্ড নিয়ে নানা জিজ্ঞাসা থেকে যায়।
