বিবিধ

জেগে থাকা রঙ (মুক্তগদ্য)



মমতা বিশ্বাস


রঙের ধর্ম হল রঙিন করা। রঙিন হওয়া মানে প্রাণবন্ত হওয়া। বহির্মহলের রঙ কালের গর্ভে বিলীন হলেও ; অন্দরমহলের রঙ জেগে থাকে আমরণ। সেই যে 'যখন আমার নবম শ্রেণি, যখন আমার শাড়ি' - গৌরপূর্ণিমার দোলোৎসবের দিনে রঙ-আবীরে আপাদ-মস্তক রাঙিয়ে দিয়েছিল যে জন, তাকে এবং সেই মুহূর্তকে ভুলতে পারিনি কখনো। বন্ধু প্রাত্যহিকী একটু খোলসা করেই শোনায় আমার' জেগে থাকা রঙে'র গল্প। যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা আমার। মেয়েদের বয়স দশের কোটা পেরোনোর পর সবকিছুতেই 'না'-এর বাঁধনে বাঁধতে থাকে পরিবারের লোকেরা। দোলের দিন সকালে খাওয়াদাওয়ার পর বোনেরা সবাই দরজায় খিল এঁটে ঘাপটি মেরে বসে আছি। দাদা-ভায়েরা রঙ খেলতে বেরিয়েছে। ঠাকুরমা ছাড়া বাড়ির বড়োরা সবাই গোঁসাই বাড়িতে দোলোৎসবের গান শুনতে গেছে। আমাদের আর কোথাও যাওয়া কী, বাইরে বেরোনো বন্ধ। চুপচাপ কতক্ষণ বসে থাকা যায়? রঙিন সুতো দিয়ে কার্পেট অথবা আসন সেলাই - যার যেটা পছন্দ বেছে নিলাম। দুটো বেজে গেছে, আর কারো আসার সম্ভাবনা নেই ভেবে স্নান করতে যাবার জন্য দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়িয়েছি। ঠিক, তখনই সাইকেল বাহিনীর হুড়মুড় করে উঠোনে প্রবেশ। একনজরে কাউকে চেনার উপায় নেই। আপদমস্তক রঙিন তারা। ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দেওয়ার কোনো অবকাশ দিল না। অন্যরা দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। আমি হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। সম্বিত ফিরলে দুইহাত দিয়ে রঙবৃষ্টি রোধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। তাছাড়া যখন বুঝতে পারি রাঙিয়ে দিচ্ছে 'যে', সে তো বিশেষজন। প্রতিরোধের হাল ছেড়ে চোখ বন্ধ করে ভিজছি অন্তরে-বাহিরে। রোমাঞ্চিত সারা শরীর। পুলোকিত মন।

না, সে আর কখনো ওভাবে আমাকে রাঙিয়ে দেয়নি। 'অল্প যাহা, তাহাই তো পরম ধন।' ভিড়ের দলে হারিয়ে যায় না কখনোই।

রঙ মানে প্রাণবন্ত থাকা, সতেজ থাকা, সজীব থাকা, সচল থাকা। সময় বদলের সঙ্গে রঙের বিবর্তন ঘটে। প্রেক্ষিত পাল্টে যায়। পড়ন্ত বেলাতে এসে 'পলাশের কুঁড়ি'র ছবি হয়ে ওঠে মহামূল্যবান। বুকের মধ্যে বইতে থাকে রঙের ফল্গুধারা। আসলে, রঙটুকুই তো বাঁচিয়ে রাখে।