চমকে উঠল সুবীর সৌমাল্যের কথায়। ফিজিক্সে মাস্টার্স কমপ্লিট করে সৌমাল্য যেদিন তার মার্ক-সিট হাতে নিয়ে সুবীরকে দেখাতে এলো, সেদিন একটা এফিডেভিটও সে দেখাল তার বাবাকে সুবীরকে।
সুবীর অর্থাৎ সুবীর কুমার চট্টোপাধ্যায়-চক্রবর্তী। এক নাম করা ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানির ডেপুটি ম্যানেজার।
সুবীর দেখল, এফিডেভিটের মাধ্যমে তার ছেলে এখন শুধু 'সৌমাল্য' নামে পরিচিত হয়েছে। কোন পদবি গ্রহণ করতে সে রাজি নয়। সুবীর মনে মনে সৌমাল্যের বয়সটা হিসেব করল। ২২ বছর ৫ মাস বয়স এখন তার। অর্থাৎ, আইনের ভাষায় সে এখন সাবালক।
কেন? কেন তোমার এমন সিদ্ধান্ত?" অস্বাভাবিক গম্ভীর কন্ঠে সুবীর প্রশ্ন করল সৌমাল্যকে। কিন্তু সৌমাল্য এক উত্তাপহীন কণ্ঠে উত্তর দিল - "পদবীর মধ্যে মিথ্যা অহমিকা ছাড়া আর কিছুর প্রকাশ নেই। পদবী ত্যাগ করা তাই সহজ হওয়ার লক্ষণ"। চমকে উঠল সুবীর। এ কার কণ্ঠস্বর শুনছে সে?
ছেলের দিকে তাকিয়ে সুবীর বলল, "শোনো, পদবী শুধু শব্দসমষ্টি মাত্র নয়, পদবী অতীত ইতিহাসের অংশ, ঐতিহ্যের বার্তাবাহী। তাইতো আমরা "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর" বলে গর্বিত হই, "সুনীতি চট্টোপাধ্যায়" বলে কিংবা "বিষ্ণু দে" বলে - এক মানসিক তৃপ্তি পাই। শরৎচন্দ্র না বলে, "শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়" বলতেই বেশি খুশি হই আমরা।
সৌমাল্য শান্ত নম্রভাবে সুবীরের মুখের দিকে তাকিয়ে, উচ্চারণ করলো - "আমরা কিন্তু, বাবা, ব্যাসদেব, কালিদাস, সুশ্রুত - এদের পদবীর খোঁজ করি না। রাম, লক্ষণ কিম্বা কৃষ্ণের পদবীর কথাও আমাদের মনে আসে না।'
সুবীর নির্বাক হয়ে যায়। এমন প্রশ্নের মুখোমুখি তাকে যে হতে হবে, তা সে কখনোই ভাবেনি। মুহূর্তের জন্য সুবীরের মন ফিরে যায় তার স্কুল জীবনের দিকে। বারবার তাকে যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে, হত, তা হল -
"তোমার পদবীতে চট্টোপাধ্যায়-চক্রবর্তী দুটোই কেন?"
সুবীর বেশ গর্ব করে বলত - "চট্টোপাধ্যায় আমার বাবার পদবী, আর চক্রবর্তী মায়ের। বাবা ছিলেন স্বাধীনচেতা। মেয়েদের সমান অধিকারে বিশ্বাসী। সে কারণেই ছেলের পদবীতে নিজের পদবীর পাশে স্ত্রীর পদবীও যুক্ত করেছিলেন।"
সুবীর নিজে এক নাম করা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ডেপুটি ম্যানেজার। ব্যস্ত জীবন।ভাবনায় সে আধুনিক। নারী স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সে নিজেকে বাবার পথিকৃৎ বলে মনে করে। বিয়ে করেছে এক নামকরা ইন্সুরেন্স কোম্পানির এক ম্যানেজারের মেয়েকে। সবিতা সেন।সবিতা উচ্চশিক্ষিতা, ঝকঝকে, স্মার্ট। মননে সেও আধুনিকা। আর সে কারণে সুবীর তার ছেলে সৌমাল্যের পদবিতে এনেছিল এক নতুনত্ব। সৌমাল্যের পদবি সে লিখিয়েছিল, "চট্টোপাধ্যায় - চক্রবর্তী-সেন"। সবিতাকেও সে দিয়েছিল উপযুক্ত মর্যাদা।
সৌমাল্য আবার বলে - "দেখো বাবা, দাদু কিন্তু ঠাকুমার নামের পদবিকে নিজের পদবির পরে বসিয়েছেন। আগে ঠাকমার পদবি বষাতে পারেননি তুমিও কিন্তু মায়ের পদবি বসিয়েছো সব শেষে। এটা কি নারী-অধিকারের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা হচ্ছে সবিতা স্বীকৃতির পরিচয় হলো?"
এমন সময় সবিতা অর্থাৎ সবিতা সেন, সৌমাল্যের মা হাজির হয় এদের দুজনের মাঝে। সবিতা সুবীরকে বলে, " সৌমাল্যের বিষয়টা মেনে নাও। এটা তোমার মেনে নেওয়াই উচিত। আর একটা কথা তোমায় বলি ওই এফিডেভিটে কিন্তু সাক্ষী হিসেবে আমিও সই করেছি"।
আর একবার চমকে গেল সুবীর। চারদিক নিস্তব্ধ। পিন পতনের শব্দও বুঝি শোনা যাবে। সুবীরের মনের ভেতরে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার দাপাদাপি। হঠাৎ সদর দরজায় শোনা গেল এক ভিখারি বাউলের কন্ঠ-নিঃসৃত গান -
"শ্যামা মা কি আমার কালো?"
পরিবেশটাই যেন বদলে গেল। সবিতা আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে স্বামীর পিঠে হাত রাখল। গান তখন চলছে -
"কালো রূপে দিগম্বরী হৃদপদ্ম করে আলো রে -
সবিতা মৃদু কন্ঠে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করল - "বলতো শ্যামা মায়ের পদবি কি?''
বাউল তখনও গাইছে -
"লোকে বলে কালী কালো,আমার মন তো বলে না কালো রে? "
গানের সুর তখন ওদের তিনজনকেই কোন এক অনির্দেশ্য পথে নিয়ে চলেছে, যেখানে কেবল প্রাণভরা আকুতি আর ভালোবাসা, যেখানে শুধুই নাম আর নাম, কোন পদবি নেই।
