গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

তবুও ছিলো খেলা



অনিন্দ্য দত্ত


হালকা একটা ঝড় বয়ে গেল। শাল গাছের মাথাগুলো দুলে দুলে উঠে যেন গল্প শোনাতে চাইলো, পাতা পড়লো একরাশ।

সুচেতা হালকা ঘুমের পর রান্নাঘরে গিয়ে চা বসালো। একটু পরে বাবাকে চা দিতে হবে। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে দেখতে পেল অনেক পলাশফুল বাগানে পড়ে আছে, আর বাবার পেয়ারের ছাগল প্যালারাম সেগুলো খাচ্ছে। আরামে প্যালারামের চোখ বুজে গেছে।

বাগানের গেট খুলে অনীক আসছে দেখে সুচেতা প্যানে জলটা আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিলো।

কতইবা বয়স হবে অনীকের, পয়ত্রিশ-ছত্রিশ? একবছর আগে বউ অনিতা মারা যাওয়ার পর লোকটা কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। দুই তিনদিন অন্তরই বাবার কাছে আসে। খানিকটা গল্পস্বল্প করে আটটা নাগাদ চলে যায়।

এক এক দিন তর্কে জমে গেলে রাতে খেয়েও যায়। খুব আস্তে আস্তে খায় অনীক, রুটি ডালে ডুবিয়ে টুকরো করে মুখে ফেলতেও যেন আলস্য। টুকটুক করে সামান্য কিছু মুখে দিয়েই খাওয়া শেষ হয়ে যায় তার। অনীকের তুলনায় বাবা এখনো যথেষ্ঠ বেশি খান, এমনকি সুচেতাও।আচ্ছা, কম করে খেলে কি বউ ফিরে আসবে? তবে শুধুমুধু শরীরকে কষ্ট দিয়ে লাভ কি?

অনীককে বড বিরক্ত লাগে সুচেতার, কেমন যেন গোহারা হেরে যাওয়া মানুষ মনে হয়। ছিঁচকাঁদুনে পুরুষ দেখতে পারেনা সুচেতা, ওর থেকে আন্না মাসীর ছেলে সায়ন অনেক সুস্থ।

দু-তিন মাস পরে পরে আসে সায়ন, তিন চার দিন থেকে যায়। যতক্ষন থাকে, যেন ঝড় বইয়ে দিয়ে যায়। নতুন নতুন বই থেকে, নতুন যেসব মতবাদ সে হজম করেছে, উচ্চস্বরে সে সব সায়ন সুচেতার কাছে আওড়াতে থাকে, সুচেতার থেকে প্রায় চার বছরের ছোট হলেও, যেকোনো বিষয়, তা যত প্রাপ্তবয়স্কই হোকনা কেন, নিঃসংকোচে সে সেগুলো নিয়ে সুচেতার সাথে আলোচনা করে। সায়নের উত্তেজনায় মনে, মনে ভারি মজা পায় সুচেতা।

পুরুষেরা ভাবে, বিধবা মেয়েদের সংগে এইসব আলোচনা করলেই তারা উত্তেজিত হয়ে পড়বে।

সল্টেট কাজু, চানাচুর সায়নের প্রিয়, আর মাছভাজা পেলে সে আনন্দে আত্বহারা হয়ে যায়, মাঝে মাঝেই সে লুকিয়ে সুচেতার জন্য কাবাব নিয়ে আসে, সুচেতাও মনে মনে হাসতে হাসতে টুকটুক করে খায়। সায়ন কেমন যেন ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে আছে,তা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে।

বাড়ির ভেতর অনীকের গলা শুনতে পেল সুচেতা।

বাবা তাহলে উঠে সদর খুলেছেন। এ বাড়িটাও এমনি যে খুব আস্তে কথা বল্লেও শোনা যায়। অনীকের গলা অবশ্য ভারী।

চা হয়ে গেছে, নামিয়ে তিনটে কাপে ঢাললো সে। বড়টার গায়ে নীল দিয়ে এন.সি.সি লেখা আছে। ওটা বাবা অনিতেষবাবুর।

ল্যান্ড রেভিনিউ আপিসে চাকরি করা ছাড়া, বাবা জীবনে যে দুটো কাজ মন দিয়ে করেছেন এ.সি.সি. তার মধ্যে একটা, আর একটা হলো দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা গল্প পড়া। অনীকের ও ওই বিষয়ে পড়াশোনা আছে, তাই বাবার সংগে তার আড্ডাটা জমে। বেশির ভাগ সময় যতরাজ্যের খুন জখম নিয়েই আলোচনা হয়।

মন্দ লাগে না। তবে ঘন্টার পর ঘন্টা একঘেয়ে লাগে।

সুচেতা তখন উঠে চলে আসে।

তাছাড়া, রান্নাবান্না ছেড়ে বসে বসে গালগল্প করলে তো তার চলবে না।

বিরাট শব্দ করে বাড়ির উপর দিয়ে একটা প্লেন উড়ে গেল।

বকুলপুরে বোমারু বিমানের ঘাঁটি হবার পর থেকেই, বিকেলের দিকে ছোট ছোট প্লেনগুলো কান ফাটানো শব্দ করে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায়, আবার ঘন্টাখানিক পরে ফিরেও আসে - দেখেছে সুচেতা। রোজ, রোজ কোথায় যায় ওরা?

ওদের দেখলে হঠাৎ কালো ডানার মথের কথা মনে হয়।

শরীর এত ক্লান্ত লাগে কেন?আজ প্রায় এক বছর ধরে তলপেটে একটা ব্যাথা করে, সেটাও কেন করছে?

এখানে সুশান্ত ডাক্তার কে তো দেখানো হলো - সে তো কিছুই ধরতে পারলো না, শুধু শুধু একগাদা ওষুধ খাওয়ালো, আর টেস্ট করালো।

বাবা চিন্তিত হবেন, তাই সুচেতা বলেছিলো, তার ব্যাথা সেরে গেছে। কিন্তু যন্ত্রনা তো যায়নি।

বাবাকে আর চিন্তিত করাতে চায়না সে।

অনেক তো সইলেন।মার চলে যাওয়া, দাদার হার্ট ফেলিওর, সুচেতার স্বামী শোভনের এক্সিডেন্ট, নিজের ছোটবেলার বন্ধু সিতিকন্ঠকাকার ক্যানসার। যেন একটা মিছিল চলেছে।

এখানে আলো খুব দ্রুত পড়ে যায়, সূর্য ঢোবার আগেই ঘোর ঘোর হয়ে যায়। অস্তের পরই ঝপ করে আঁধার নামে।

আজ আবার মেঘে ছেয়ে থাকার জন্য আগেই মিশকালো হয়ে গেল।

হঠাৎ শন শন শব্দে বাতাস বয়ে জাম, কাঁঠাল আর গোলঞ্চ গাছটা শিউরে উঠলো। আর তার পরেই আকাশ ভেঙে জলের ধারা নামলো।

সুচেতার জানলার বাইরে সব ঝাপসা হয়ে গেল।

টুলে বসে আয়নার দিকে তাকাল সুচেতা। দেখলো, যেমন এসে দাঁড়ায় - তার পেছনে তার স্বামী শোভন এসে দাঁড়িয়েছে। তার মুখে একটা ক্ষীণ হাসি।

শোভন বল্লো" বছরের এই দিনটায় প্রতি বার এই খেলাটা খেলতে তোমার ভালোও লাগে চেতা, চলো সময় হয়েছে, এবার ফেরা যাক - আর থাকা ঠিক নয়"

সুচেতা উঠল, চলে যেতে যেতেও তার মনে হলো, ঠিকই বড্ড মায়া লাগে, এই দিনটাতেই তো ওই যুদ্ধের প্লেনটা প্রাকটিশ এর সময় নিয়ন্ত্রন হারিয়ে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছিলো তাদের বাড়ির উপর...

বাবা,অনীক, সে আর বাড়িটাও সব পুড়ে কালো ঝামা হয়ে গিয়েছিলো...

ছয় বছর হয়ে গেল। তবু্ও প্রতিবছর এই দিনটা যে আবার ফিরে আসে।