গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

উঁচু পোস্ট



অনিন্দিতা মুখার্জী সাহা


"মা, আসছি!" - দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল মহুল।

রান্নাঘর থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলেন শুক্লা। হাতে স্টিলের ছোট গোল টিফিন বক্স। মহুল মায়ের হাত থেকে তাড়াতাড়ি টিফিন বক্সটা নিতে নিতে বলল, "দেরি হয়ে গেল গো, ন'টা পাঁচের ডানকুনি লোকালটা মনে হয় পাব না!"

"না পাবি না পাবি, আস্তে সাইকেল চালাবি!" - বললেন শুক্লা। এই তাড়াহুড়োর সময় মায়ের কথাগুলো শুনলেই রাগ হয় মহুলের। আস্তে সাইকেল চালালে ট্রেন তো আরও পাবে না! কিন্তু মাকে সেসব বলার উপায় নেই। বললেই আবার কান্নাকাটি!

সদ্য স্বামীহারা হয়েছেন শুক্লা, এই একই কারণে। হাইওয়েতে খুব জোরে সাইকেল চালিয়ে আসছিল রতন, মালভর্তি ট্রাক এসে পিষে দিয়েছিল। যাই হোক, এসব এখন আর মনে করতে চাইছে না মহুল। অনেক দিন পর একটু ভালো সময়ের মুখ দেখেছে ওরা, তাই খারাপটা আর ভাবতে চায় না ও। এই বাবাকে নিয়েই কম ঝামেলা ছিল মহুলদের! সারাদিন মদে ডুবে থাকত রতন!

শুক্লা না থাকলে আজ মহুলের ইঞ্জিনিয়ার হওয়া হতো না, আর এই এত বড় কোম্পানি তো স্বপ্ন! মনে আছে মহুলের - শুক্লা ছেলের পড়াশোনার জন্য টাকা সরিয়ে ফেলত বলে রতন মারতেও ছাড়েনি! রতনের মৃত্যুতে একদিক থেকে বেঁচেই গেছে ওরা।

"আরে মা, তুমি চিন্তা কোরো না। আমি অসুস্থ নই, পেটে সত্যিকারের জল আছে, রঙিন নয় - যে গাড়ি হর্ন বাজালেও শুনতে পাব না।" বলেই সাইকেলে উঠে বেরিয়ে গেল মহুল।

পিছন থেকে শুনল শুক্লা বলছেন, "দুগ্গা দুগ্গা!"

কলকাতার বেশ নামি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে মহুল। ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে জয়েন করলেও প্রজেক্টের প্রয়োজনে খুব তাড়াতাড়ি টিম হ্যান্ডল করতে হচ্ছে মহুলকে। ছ' মাস ট্রেইনি হিসেবে কাজ করলেও খুব স্যালারি পেত না। তবে সপ্তাহখানেক হলো একটা প্রজেক্টের টিম লিডার হিসেবে স্থানান্তরিত হয়েছে পদটা! তাতে মাইনে বেড়েছে বেশ অনেকখানি। দায়িত্বও কম নয় - ওর নিচে গুনে গুনে বারোটা ছেলে-মেয়ে কাজ করে।

মহুলেরই বয়সি বা একটু কমবেশি সব। ওদের টিম বিল্ডিংয়ের দোতলায় বসে। মহুল দেখেছে, ও বাদে বাকিদের সবার মধ্যে বেশ ভাব। কিন্তু ওর সঙ্গে সবাই দূরত্ব বজায় রাখছে। তাই হয়তো প্রথম ক'টা দিন বেশ জড়তা ছিল।

কিন্তু একটা ঘরে একা একা কতক্ষণ! তাই নিজে থেকেই বাইরে বেরিয়ে এসে টুকটাক কথা বলতে শুরু করে, তারপর একদিন বলেই ফেলেছে ওদের - ওকে স্যার না ডেকে মহুলদা ডাকতে! তাতে পরিবেশটার গুমোট ভাবটা কেটেছে, একটা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশও তৈরি হয়েছে টিমে। একসঙ্গে কাজ করতে গেলে এরকম একটা পরিবেশের খুব দরকার।

সকাল থেকে পরপর অনেকগুলো কাজ করার ফাঁকে ঘড়ির কথা মাথায় ছিল না মহুলের। হঠাৎ মহুল দেখল ঘড়িতে দুটো পনেরো। ঘড়ির সঙ্গে মাথার একটা বন্ধুত্ব আছে - সময়টা দেখেই নিজের অজান্তেই খিদে পেয়ে গেল মহুলের।

বাইরে তাকিয়ে দেখল ওর টিমের সবাই গোল করে খেতে বসেছে। বারো জনের সামনে বারোটা টিফিন বক্স। কারওটাতে লুচি, কিছুতে চাউমিন, কোনোটাতে আবার পরোটা। এছাড়াও আছে চিড়ের পোলাও, পোহা - আরও কত কী।

ওদের খাবার দেখে খিদেটা আরও জোরে পেয়ে গেল মহুলের। ওদের পাশ দিয়ে হেঁটে বাথরুমে গেল মহুল।

হাত দুটো ধুয়ে আসার সময় ওদের দেখে মহুল একটু হাসতেই স্বপ্নিল বলে উঠল, "মহুলদা, এসো না আমাদের সঙ্গে খাবে!"

স্বপ্নিলের কথা শুনে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল মহুলের। চোখ-মুখও লাল হয়ে গেল।

ওরা হয়তো খানিকটা বুঝতে পেরেছে, তাই সঙ্গে সঙ্গে রুকসানা বলল, "আরে তোরা কি পাগল হলি! মহুলদা আমাদের সঙ্গে খাবে কী রে! পোস্টটা ভাব, ভাই, পোস্টটা ভাব!"

রুকসানার কথা শুনে একটু যেন শান্তি হলো মহুলের। রুকসানার দিকে কৃতজ্ঞতার হাসি ছড়িয়ে নিজের ছোট্ট কেবিনে ঢুকে গেল মহুল।

শুধুই একটা ঘর। তাতে কোনো দরজাও নেই। পোস্টের দাম দিতে কাঠ দিয়ে চারদিক তুলে রেখেছে মাত্র।

ওখানে এসে বসে ব্যাগ থেকে বের করে আনল গোল টিফিন বক্সটা। ততক্ষণে চাপা স্বরের কথা শুনতে পেল মহুল।

পরিষ্কার না হলেও হালকা স্বরে "ঘ্যাম" শব্দটা বেশ কয়েকবার শুনল মহুল।

সেসব কানে নিয়েই ছোটবেলার গোল টিফিন বক্সটা খুলে ফেলল মহুল। তাতে রয়েছে দুটো রুটি - কোনোরকমে মুড়িয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছেন শুক্লা - আর পাশেই আলুভাজা। তার পরিমাণটাও এতটাই যে শেষ রুটিটা জল দিয়েই খেতে হবে।

কাল রাতেই বলছিলেন শুক্লা, হাঁড়িতে আর ছ'টা আলুই পড়ে আছে। রোজ একটা করে ভাজলেও মাস যাবে না।

মহুল কম্পিউটারের নিচের কোণে দেখল - মাস শেষ হতে এখনও দশ দিন। ছ'দিনে ছ'টা আলু হলেও আরও চার দিন বাড়তি। কে জানে কীভাবে চলবে!

একটুকরো রুটি ছিঁড়ে আলুভাজার গায়ের তেল দিয়ে মুছে মুখে দিল মহুল।

তখনও হয়তো বাইরে ওকে নিয়ে চর্চা চলছে। উঁচু পোস্ট! ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মহুল।

ভাগ্যিস উঁচু পোস্ট! নাহলে কী বলে কাটাত আজ ও! আর কীভাবেই বা এই টিফিন বক্স খুলত ওদের সামনে!

আজ এক বছর ধরে নুন আনতে পান্তা ফুরোয় ওদের। তার মধ্যেই রতন মারা যায়। ভাগ্যিস! নাহলে ওনার মদের খরচ যোগাতে আরও ফতুর হতো মহুলরা।

কলকাতার বুকে এই কোম্পানিতে একটা চাকরি হলো - কী ভাগ্যিস! এর আগেও চাকরি পেয়েছিল, কিন্তু সেসব বাইরে। যেতে চাইলেও যেতে পারেনি মহুল।

অন্য রাজ্যে গিয়ে থাকার খরচ কম? যতই ভালো চাকরি হোক!

মহুল শুনল, বাইরে ওরা খুব হাসাহাসি করছে। মহুলের বিষয়টা হয়তো চাপা পড়ে গেছে এতক্ষণে।

মহুলেরও খুব ইচ্ছে করছে ওদের সঙ্গে হাসি-মজায় খাবার খেতে, ভাগাভাগি করে খাবার খেতে।

মহুল হিসেব করল - ওর এখন যা স্যালারি, সেটা দিয়ে ধারদেনা মিটিয়ে তিন মাস মতো সময় লাগবে একটা জায়গায় আসতে, ওদের সঙ্গে মিশতে, একসঙ্গে সম্মান নিয়ে টিফিন বক্স খুলতে! ততদিন পর্যন্ত উঁচু পদের ঘ্যাম নিয়েই থাকতে হবে। শেষ রুটির টুকরোটা জল দিয়ে গিলে হাত ধুতে গেল মহুল।

চোখ গেল কম্পিউটারের ডেস্কটপটার দিকে! কতগুলো নৌকো বাধা রয়েছে ঘাটে কিন্তু একটা নৌকো দল ছেড়ে কতটা এগিয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে জিতে গেছে।কে জানে সেই জিতটা মহুলের মতোই হেরে গিয়ে জেতা নাকী!

তাড়াতাড়ি উঠে পড়লো। হাত ধুতে যাওয়ার সময় বলল, "শোন না, তোমরা না আমায় মহুলদা না স্যার বলেই ডেকো!"

বলে আর দাঁড়াল না মহুল। সরাসরি বাথরুমে ঢুকে গেল। বাইরে আবার চাপা উত্তেজনা শুরু হয়েছে।

মহুল বাথরুমে ঢুকে বেসিন খুলে জোরে জোরে জলের ঝাপটা দিল চোখে। তারপর আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই বলল, "যাক, তিন মাসের জন্য নিশ্চিন্ত। ভাগ্যিস উঁচু পোস্ট!"