গত বছর বর্ষাকালটা শুকনো শীতের মতোই কাটিয়ে দিয়েছিল। এবারের বর্ষাকাল যেন তার প্রতিশোধ নিতে তৈরি হয়েছে। এপ্রিল মাস পড়তেই বর্ষার শুরু। সেপ্টেম্বরেও বর্ষার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বছরটা বর্ষাতেই কেটে গেল। ডিসেম্বর পড়তেই একটু স্বস্তি দিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে সামান্য বৃষ্টি হলেও ১৩ তারিখ থেকে মুষলধারে শুরু হয়েছে। নীলাভ যার নাম দিয়েছে নীল বৃষ্টি। সন্ধ্যার পরে বৃষ্টি থামলেও আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল হতেই শহরে অদ্ভুত নীল বৃষ্টি হচ্ছে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। আকাশ থেকে নামা ফোঁটাগুলো যেন সাধারণ জল নয়, ছুঁলেই মন হালকা হয়ে যায়, স্মৃতিরা নরম হয়ে আসে। কেউ জানে না কেন, শুধু বলা হচ্ছে, "আজকের বৃষ্টি ভালোবাসার জন্য।"
নীলাভ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সেই বৃষ্টি দেখছে। হাতে একটা লাল খাম। খামটার ভেতরে কী আছে, সে নিজেও ঠিক জানে না। তিন বছর আগে ঠিক এই দিনেই খামের চিঠিটা সে নিজেকেই লিখেছিল - খুলবে তখন, যখন সত্যিকারের ভালোবাসা তাকে খুঁজে পাবে।
তিন বছর কেটে গেল। ভালোবাসা কি সত্যিই কাউকে খুঁজে পায়?
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। যেন বাইরের নীল বৃষ্টির শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে দরজার কড়ায় ধাক্কা মারছে!
"কে?"
"আমি... নীলা।"
নামটা শুনেই বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে উঠল।
নীলা - যাকে সে প্রথম দেখেছিল একটা ভাঙা বাসস্ট্যান্ডে, ভেজা চুলে, চোখে জমে থাকা ক্লান্তি আর মুখে অদ্ভুত এক শান্ত হাসি নিয়ে। সেদিন দু'জনেই আলাদা আলাদা জীবনের ভাঙা অংশ কুড়োচ্ছিল।
নীলা ঘরে ঢুকতেই বৃষ্টির গন্ধটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
"আজ নীল বৃষ্টি হচ্ছে জানেন?" নীলা হালকা হেসে বলল।
"হ্যাঁ," নীলাভ বলল, "শুনেছি এই বৃষ্টিতে মানুষ নিজের সত্যিকারের অনুভূতি লুকোতে পারে না। সব খোলসা করে বলে দেয়।"
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর চোখ নামিয়ে বলল,
"তাই তো এসেছি।"
তারা কখনও সম্পর্কের নাম দেয়নি। একসঙ্গে কফি খেয়েছে, নীরবে হেঁটেছে, একে অপরের গল্প শুনেছে, কিন্তু কখনও বলেনি, 'আমরা কী?'
নীলাভ লাল খামটা টেবিলের ওপর রাখল।
"আজ খুলব ভেবেছিলাম," সে বলল।
"খুলুন," নীলার গলা কাঁপছিল।
খামটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা চিঠি -
"প্রিয় আমি,
যদি এই চিঠি খোলার সময় তোমার সামনে কেউ থাকে, যার উপস্থিতিতে তুমি নিজের ভয়গুলো ভুলে যাও, তাহলে বুঝবে, সে-ই ভালোবাসা। ভালোবাসা মানে নিখুঁত মানুষ নয়, বরং যার পাশে অসম্পূর্ণ থাকাও নিরাপদ।"
নীলাভ থামল।
নীলার চোখ ভিজে উঠেছে। নীল বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাচ বেয়ে নামছে, আর তার চোখে জমা জলও লুকিয়ে নেই... চোখের জলও যেন বাইরের নীল বৃষ্টিকে সম্মান জানাচ্ছে।
"আমি নিখুঁত নই," নীলা বলল, "আমি ভয় পাই, বেশি ভাবি, মাঝে মাঝে নিজেকেই হারিয়ে ফেলি।"
"আমিও," নীলাভ শান্ত গলায় বলল, "কিন্তু তোমার পাশে থাকলে হারালেও মনে হয় কেউ আমাকে খুঁজে নেবে।"
নীলা এগিয়ে এলো। তাদের মাঝখানে আর কোনো প্রশ্ন নেই, কোনও দ্বিধা নেই। শুধু নিঃশব্দ স্বীকৃতি।
"ভ্যালেন্টাইন্স ডে মানে কি শুধু ফুল আর চকলেট?" নীলা জিজ্ঞেস করল।
"না," নীলাভ হাসল, "ভ্যালেন্টাইন্স ডে মানে এমন একজন মানুষ, যার কাছে নিজের সত্যটা বলা যায়।"
নীল বৃষ্টি থেমে গেল। আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে।
নীলাভ জানালাটা খুলে দিল।
"জানেন," নীলা বলল, "আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি - ভালোবাসা সত্যিই কাউকে খুঁজে পায়।"
বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে দিল।
নীলাভ হাতটা ধরল।
শহর আবার সাধারণ হতে শুরু করল। কিন্তু তাদের দু'জনের ভেতরে কিছু একটা চিরতরে বদলে গেল।
ভ্যালেন্টাইন্স ডে শেষ হয়ে যাবে। ফুল শুকোবে। চকলেট ফুরোবে, কিন্তু লাল খামের সেই চিঠি আর 'নীল বৃষ্টির স্মৃতি' তাদের ভালোবাসার মতোই থেকে যাবে।
