বিবিধ

এক বিকেলের অপেক্ষা



অভিজিৎ রায়


নিজেকে চিনতে বড় দেরি হয়ে গেল - এ কথা ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত বিকেলের মুখের রং বদলে যায়। বদলে যায় আলো অন্ধকারের দুরন্ত ছায়াছবিগুলোও। সন্ধে নামতে আর বেশি দেরি নেই, সেই ভয় তাড়া করে বেড়ায় চারপাশের সব কিছুতেই। সাইকেল রিক্সার বেলের আওয়াজ বদলে যায় মাঝপথে পিছন দিকে চলতে থাকা টোটোর সাবধান বাণীতে। শরীরে শীত এসে জমাট বাঁধে নিজেকে সাবধান করতে। রক্তের উষ্ণতাকে সেও ভয় পায়। জীবন মাত্রেই ভয়ের রূপকথা। মৃত্যুর ভয় সারাজীবন দৌড়ে নিয়ে বেড়ায় প্রত্যেককেই।

নেই বিকেলের শরীরে খুব ধীরে সন্ধে নামে। নামতে নামতে থামে আর থামতে থামতে নামে। মধ্যযামে এইসব যাতায়াতের হিসাব হয় ঘুমহীন চোখের তল্লাটে। শীতের কুয়াশায় এ ঘাটে ও ঘাটে থামতে থামতে ভোর আসে। বসন্তের ভোর আর শীতের ভোরের ফারাক যে বোঝে, সেই-ই বোঝে ক্লান্ত বিকেলের এইসব চেতনা প্রবাহ। একটাও ভোর তার জন্য অপেক্ষা করে না। অপেক্ষাহীন একটা জীবন বয়ে নিয়ে বেড়ানোর মধ্যে ক্লান্ত বিকেল শ্লাঘা অনুভব করতে চায়। সকালের রোদের ধমকে মাঝেমধ্যে সে সব অনুভূতি হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় অথবা নষ্ট হয়ে যায়। একটা পূর্ণ দিন নষ্ট করে আসার পর বিকেলের খতিয়ানে নষ্টামির আর কোনও নতুন সংজ্ঞা নেই। তবু সে স্বাধীন নয়। নিজের অতীতের কাছে সে পরাধীনতার সহজ পাঠ নিতে থাকে রোজ। প্রতিটি মুহূর্তে তার ক্লান্তি, তার পরাজয় তাকে থামিয়ে দেয় পথে। মধ্যরাতের অন্ধকার মুঠোয় ধরার আগেই তার চোখে ঘুম এসে নামে।

কখন কোন দামে অন্ধকার বিক্রি হয়ে যায় তার হদিস আলো রাখে না। অথচ আলোর, বিশেষ করে শেষ বিকেলের আলোছায়ার সে হদিস রাখা প্রয়োজন। কিন্তু কার সাথে কোন গোপন চুক্তির মাধ্যমে সন্ধে বিক্রি করে দেয় মধ্যরাতের অন্ধকার। অনেক দিনের পর স্বপ্নশরীর ছারখার হয়ে যায় অতৃপ্তির যন্ত্রণায়। ন্যায়, অন্যায় পার করে একটা বিকেল এসে দাঁড়ায় একটা ভোরের মুখোমুখি। মুহূর্তকে সুখী করার তাড়নায় সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে এক অনন্ত অতীতের পথে।

ঘাসের শিশিরের গন্ধ বিকেলের চায়ের কাপে, শীতের সকালের রোদের গন্ধ অনন্ত বিস্তৃত সর্ষে খেতের হলুদ রঙে ছুঁতে বিকেল দৌড়ে যায় সকালের দিকে। ভোর তাকে থামাতে চায়, পারে না। দুপুরের রোদের দিকে তাকিয়ে সে একবার নিজেকে দেখে নেয় আয়নায় আর, তারপর নিজেকে চিনে নিতে দেরি হয়ে যাবার দু:খ মাথায় নিয়ে চুপ করে যায়। সে সব শোনে কিন্তু কিছু বলে না। সে সব দেখে কিন্তু চুপ করে। অবসরে পৌঁছে তার নিজেকে বড় অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়।

আহ্নিক গতির জীবনে একটা বিকেলের ঠোঁটের রং বড় ফ্যাকাসে, রক্তশূন্য। তবু একটা বিকেল নিজেকে চিনে নিতে আরেকটা বিকেলের মুখোমুখি বসে। রূপকথার জন্ম মুহূর্ত নিয়ে অদ্ভুত এক সীমাহীন নাটক রচিত হয় সান্ধ্যকালীন আড্ডায়। যে নাটকের দর্শক আর কুশীলব একই চরিত্র। শত্রু, মিত্র সবাই এক। ভিতরে ভিতরে বিকেল আর ভোর, মধ্যরাত আর মধ্যাহ্ন একই চরিত্রের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়। বিকেল সকালে পৌঁছে ভুলে যায় ক্লান্তির স্বাদ। আবার দুপুরের পথঘাট ভুলিয়ে দেয় মধ্যরাতের নির্জনতা। আর রূপকথার ভিতর জীবন নিজেকে দৈত্যপুরীর বাসিন্দা বানিয়ে ফেলে অপেক্ষা করে সোনার আর রূপোর কাঠির। অপেক্ষাহীন অপেক্ষা আর উপেক্ষার পাশাপাশি রূপকথা এগিয়ে চলে হয়তো আরও এক ক্লান্ত বিকেলের দিকে।