১৪০৭ শকাব্দের ২৩ ফাল্গুন সূর্যাস্তের ঠিক পরেই নদীয়া নগরের শ্রীমায়াপুরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অবতীর্ণ হন। ইংরেজি বর্ষ অনুযায়ী সেটি ছিল ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই ফেব্রুয়ারী। সেই সময় চন্দ্রগ্রহণ হয় এবং চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী তখন নদীয়াবাসীরা উচ্চৈঃস্বরে হরিধ্বনি সহকারে ভাগীরথীর পুণ্য সলিলে অবগাহন করছিলেন। তাঁর পিতা জগন্নাথ মিশ্র ছিলেন একজন দরিদ্র ব্রাহ্মণ। মাতা শচীদেবী ছিলেন একজন আদর্শ রমনী। তাঁরা উভয়ই ছিলেন ব্রাহ্মণ কুলোদ্ভূত এবং শ্রীহট্ট জেলায় তাঁদের আদিনিবাস ছিল। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুপম রূপে আকৃষ্ট হয়ে নরনারীরা নানা উপহার নিয়ে তাঁকে দেখতে আসতেন। তাঁর মাতামহ বিখ্যাত জ্যোতিষী শ্রীনীলাম্বর চক্রবর্তী তাঁর কোষ্ঠীবিচার করে ভবিষ্যৎবাণী করেন যে, কালক্রমে এই শিশুটি এক মহাপুরুষে পরিণত হবে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মামার বাড়ি বেলপুকুর গ্রামে। এই গ্রামটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব যেমন আছে তেমনই বিস্ময়কর তার পৌরাণিক মহিমা। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনের সাথে জুড়ে আছে সেই অপার মহিমা। বাংলা সাহিত্যে চৈতন্য মহাপ্রভুর যে প্রভাব তা পণ্ডিতগণ একবাক্যে স্বীকার করেন। সমগ্র মধ্যযুগ তাঁরই মহিমা কীর্তন করে চলেছে। মহাপ্রভুর মাতামহের গণনা ব্যর্থ হয়নি। চৈতন্য মহাপ্রভুর পাণ্ডিত্য, তাঁর জ্ঞানের গভীরতা, কৃষ্ণপ্রেম এবং পতিত জনের জন্য যাঁর প্রাণ উতলা হয়ে চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সেই মহাজীবন নবদ্বীপ ছাড়িয়ে সমগ্র ভারতে যে প্রভাব বিস্তার করেছিল তা সর্বজন বিদীত। তিনি নিজেই বলেছিলেন - "পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম/সর্বত্র প্রচার হইবে মোর নাম।" বেজপাড়া বারোয়ারী প্রাঙ্গণে নিয়মিত ভাগবত পাঠ, মহাপ্রভুর জীবনের নানাবিধ অলৌকিক কাজকর্মের কাহিনি আলোচনা হয়। সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে আসে তবুও কৃষ্ণকথা শ্রবণ করার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়।
আমার মা সুর করে চৈতন্য ভাগবত পাঠ করতেন। ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যা ত্যাগ করে তিনি হাতে তালি দিয়ে একমনে হরিনাম সংকীর্তন করতেন। বেজপাড়া গ্রামের কথা তিনি অনেক শুনেছেন। আমাকে ওখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছেন কিন্তু আমি পারিনি। শুধু বলেছিলাম - মা দুঃখ কোরো না। আমি তোমাকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভোজন ক্ষেত্র পুরুষোত্তম নগরীতে নিয়ে যাবো। সেদিন মায়ের মুখের হাসি আর চোখের আনন্দ দেখে আমি বড়োই ব্যথিত হয়েছিলাম। মায়ের শরীরের যা অবস্থা তাতে তাঁর পক্ষে পুরী যাওয়া সম্ভব ছিলো না। তবুও মনে মনে চিন্তা করে নিলাম কথা যখন দিয়েছি তখন শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের দর্শন করাবোই এবং যেভাবে হোক জগন্নাথ দেবের প্রসাদ পাইয়ে অন্তত আমার অভাগী মাকে একটু পুণ্য অর্জনের সুযোগ দেবো।
বেজপাড়া গ্রামের বারোয়ারী প্রাঙ্গণে হরিনাম সংকীর্তন চলছে। ফাল্গুনী পূর্ণিমার রাত। সুশীল বাবু শিউলি আর সুকান্তকে নিয়ে এখানে এসেছেন। প্রতি বছরই আসেন। এবার সুকান্তের পীড়াপীড়িতে দুই ভাইবোনকে নিয়ে এসেছেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মূর্তির দিকে তাকিয়ে আজ তাঁর একটু অন্যরকম মনে হয় - সম্মুখে আদুল গায়ে, গলায় গাঁদাফুলের মালা ও উত্তরীয়বস্ত্র, নিরাভরণ দেহ এবং উত্তোলিত বাহু যুগল যেন তাঁকেই আহ্বান করছেন মহাপ্রভু। হরিনাম সংকীর্তনের সাথে সাথে মহাপ্রভুর অপূর্ব কান্তি বর্ণনা করছেন কীর্তনীয়া শ্রী দাম। তাঁর কণ্ঠের জাদুতে সুশীল বাবুর অন্তরটা দুলে ওঠে। শিউলি নিবিষ্ট চিত্তে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অলৌকিক কাহিনি শ্রবণ করে। সুকান্ত এসেছিলো অনুষ্ঠান শেষে প্রসাদ পাওয়ার জন্য। এখানে নাম সংকীর্তন চলছে এখনই শেষ হবে না। ষোলো প্রহর সংকীর্তনের আজ দ্বিতীয় দিন। মাঠের একপাশে প্রসাদ পর্ব চলছে। সুকান্ত এদিক ওদিক তাকিয়ে কীর্তনের আসর থেকে উঠে প্রসাদ পাওয়ার সারিতে গিয়ে দাঁড়ায়। আজ খিচুড়ির সাথে পালংশাকের চচ্চড়ি, চাটনি এবং মিষ্টি। সুকান্তের চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে। খিচুড়ি খেতে সে ভীষণ ভালোবাসে, সাথে পালংশাকের চচ্চড়ি হলে তো কথাই নেই। চুপিসারে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসে পড়ে। পদ্মপাতার থালায় খিচুড়ির সাথে পালংশাকের চচ্চড়ি আর এক টুকরো বেগুনি হলে বেশ জমে যায়। শ্রী দামের কণ্ঠ থেকে তখন অবিরাম সুধা বর্ষিত হচ্ছে - "নন্দনন্দন চন্দ চন্দন গন্ধ নিন্দিত অঙ্গ, জলদসুন্দর কম্বুকন্দর নিন্দি সুন্দর ভঙ্গ।" কখনও গাইছেন - "নীরদ নয়নে নীরঘন সিঞ্চনে পুলক মকুল অবলম্ব/ স্বেদ মকরন্দ বিন্দু বিন্দু চূয়ত বিকশিত ভাব কদম্ব।" আহা! কী সুর! কী গায়কী! এদিকে কৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে সুশীল বাবুর বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হতে বসেছে অপরদিকে সুকান্ত তখন সবকিছু ভুলে খিচুড়ির আস্বাদ নিতে ব্যস্ত। মরমী কবি গোবিন্দ দাসের পদের লালিত্য শ্রবণ করে নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবাই অঝোর ধারায় অশ্রুবর্ষণ করছে।
খাওয়া দাওয়া শেষ হলে সুকান্ত এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখে। চারিদিকে বিশাল আম্রকানন মাঝে মধ্যে দুই একটা বাড়ি। বেশির ভাগ বাড়িতে অন্ধকার কেননা বাড়ির সদস্যদের প্রায় সকলেই কীর্তন শুনতে ব্যস্ত। দুই একটা বাড়িতে আলো জ্বলছে। হয়তো কোনো বয়স্ক ব্যক্তি বাড়িতে একা একা রয়ে গেছেন বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য। তবে একটা মজার ব্যাপার হলো এখানে চুরি চামারি খুব একটা দেখা যায় না। এঁরা নিরীহ এবং সাদাসিধা প্রকৃতির মানুষ। এঁদের আতিথেয়তা মনে রাখার মতো। সুকান্ত সবকিছু দেখে আর ভাবে - সে যদি কীর্তনগান করতে পারতো তাহলে এঁদের সাথে নানান জায়গায় ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়াত। দাদুকে বিষয়টা বলা দরকার। তাঁর মতামত নিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি যদি আশীর্বাদ করেন তাহলে নিশ্চয় সে সফল হবে।
ইতিমধ্যে কীর্তনের আসর থেকে শোরগোল শোনা যায়। ব্যাপারখানা কী একটু দেখতে হচ্ছে। সুকান্ত ছুটে গিয়ে দেখে দাদুকে ঘিরে রয়েছে অনেকগুলো মানুষ। কেউ চোখে মুখে জলের ছিটে দিচ্ছেন, কেউ পাখার বাতাস করছেন। তাহলে দাদু কী অসুস্থ হয়ে পড়লেন? গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায় সে - হ্যাঁ, তার অনুমান সত্যি। সবাই তাঁর শুশ্রূষা করতে ব্যস্ত। দিদির কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছেন তিনি, চোখ বন্ধ। চোখের কোণে জলের রেখা দেখা যাচ্ছে। সুকান্ত কাছে এগিয়ে যায়, শিউলিকে জিজ্ঞেস করে - কী হয়েছে রে দিদি?
- তেমন কিছু নয়। কৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে সাময়িক অসুস্থ বোধ করছিলেন। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চৈতন্য হারিয়ে মূর্চ্ছা যান। এখন ঠিক আছে। তা ভাই তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলিস?
- কেন এখানে, আশেপাশেই ছিলাম।
- ভাগ্যিস ওই দাদাটা ছিলেন। তাই দাদুর চেতনা ফিরে এলো। তোর দ্বারা যদি একটা কাজ হয়।
সুশীলবাবু বললেন - আহ-হা! ছেলেটাকে বকছিস কেন? ছেলেমানুষ এদিক ওদিক তো একটু ঘুরে ঘুরে দেখতে ইচ্ছে হয় না কী, অ্যা? চল এবার আমরা বাড়ির দিকে এগোই, অনেক রাত হয়েছে।
সুধাকান্ত বলে - দাদু চলুন আমি আপনাদেরকে বাড়ি পৌঁছে দিই। এখান থেকে অনেকটা দূর বামুন পাড়া আপনারা কি হেঁটে এসেছেন না কোনো গাড়িতে?
- না রে ভাই আমার তো গাড়ি নেই। একটা টলি ভ্যানে করে এসেছি। ওকে বলা হয়েছিল দশটা নাগাদ আসতে। এখন তো প্রায় দশটা বাজে হয়তো এখনই এসে যাবে।
- তাহলে আমি আপনার জন্য একটু প্রসাদ এনে দিই?
দাদু সম্মতি জানাতেই সুধাকান্ত ছুটে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই সে তিনটে প্যাকেট নিয়ে হাজির হয়। প্যাকেটগুলো গুছিয়ে যত্ন করে গুছিয়ে দাদুর হাতে দেয়। দাদু ওগুলো সুকান্তকে ডেকে বলেন - নে এগুলো রাখ।
সুকান্ত প্যাকেট নিয়ে একটা ব্যাগে ভরে নেয়। তার কিছুক্ষণ পর টলি ভ্যান এসে যায়। সুধাকান্ত ওদের তিনজনকে টলিতে তুলে দিয়ে বলে - সাবধানে যাবেন দাদু।
দাদু বলেন - সুধা ভাই, একদিন আমাদের বাড়ি এসে দেখা করে যাস। তোর দিদা খুব খুশি হবেন।
- অবশ্যই যাবো।
দাদুর কাছে জানতে পারে যে ছেলেটা ওদের সাহায্য করেছে দাদুর শুশ্রূষা করেছে তার নাম সুধাকান্ত। এখানকার আশেপাশের গ্রাম থেকে শীতের সময় পাটালি গুড় সংগ্রহ করে সেগুলো ক্যানেস্তারা টিনে ভর্তি করে কলকাতার বড়বাজারে নিয়ে যায়। তাছাড়া গাছা বাজারে ওর পৈতৃক ভূষিমালের ব্যাবসা আছে। সারাবছর ধরে সেই ব্যাবসাটাই ও চালায়। অল্প বয়সে বাবা মারা যাবার পর ও নিজেই ব্যাবসার হাল ধরেছে। মায়ের শরীরের অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। কী একটা কঠিন অসুখে ভুগছেন তিনি। ডাক্তার বাবু বলেছেন - যতদিন বাঁচবেন ওনাকে বাড়িতে রেখে সেবাযত্ন করো।
ডাক্তারবাবুর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সুধাকান্ত। বাড়িতে দু'জন কাজের মাসি আছেন - একজন চব্বিশ ঘণ্টা মাকে দেখাশোনার কাজ করে, অপরজন রান্নাবান্না সহ ঘরকন্নার যাবতীয় কাজ করে মাকে রাতের খাবার দিয়ে নিজের ও তার বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে বাড়ি চলে যায়। অত্যন্ত সৎ এবং পরিশ্রমী ছেলে সুধাকান্ত। দাদু বলেন - আমার যদি একটা মেয়ে থাকতো আমি ওর হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতাম।
কথা বলতে বলতে ওদের গাড়ি এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ায়।
(ক্রমশ)
