
একই ভাব পোষণ করে হলধরের সম্বন্ধে।
'মুরোদ' জিনিসটা আদতে কি বড় জানতে ইচ্ছে হয় হলধরের। জামা, কাপড় ছেড়ে গামছা পরে উঠোনের বাইরের কলঘরে যেতে যেতে হলধরের মনে হল 'মুরোদ'টা বোধহয় কাঁটাতারের ওপারেই জন্ম জন্মান্তরের জন্য ছেড়ে এসেছেন তিনি।
"এই যে জমিদারবাবু, তোমার এই গুণধর ভাইপোর অন্যত্র ব্যবস্থা করো বুঝলে, আপনি খেতে ঠাঁই পায় না শঙ্করাকে ডাকে!"
মিনতি এখন একটা দজ্জাল মেয়েমানুষ।
ফ্যালফ্যাল করে হলধর চেয়ে রইলেন রান্নাঘর থেকে উঠোনে বেরিয়ে আসা মিনতির দিকে। ওর চোখমুখ রাগে ফুঁসছে।
"জানো, এই ছ্যামড়া আজ কি করসে।" কাঠ বাঙালে চেঁচিয়ে উঠল মিনতি।
।। বিদিশা মিত্র ।।
আজকে অফিসে যায়নি বিদিশা। অজয়কেও ফোন করে আসতে না করে দিয়েছে। গাড়ি নিয়ে দরকার হলে নিজেই কাছে পিঠে ঘুরে আসবে, প্রয়োজন হলে, যদিও আজ অফিসে যাওয়টা খুব জরুরী ছিল।
ঘড়ি বলছে সোয়া বারোটা।
ধৃতবে জগমোহনদার ওখানে মিটিংটা হয়ে গেছে এতক্ষণে।
মোবাইলটাতে চাপ দিল বিদিশা।
না কোন রেসপন্স নেই। ব্যালকনিতে বেরিয়ে দাঁড়ালো ও।
দু'এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে সকাল থেকে। কিন্তু গুমোটভাবটা কমেনি।
রহিমও কোন মেসেজ করলো না কেন?
খুব ক্লান্ত লাগলো বিদিশার। যবে থেকে শুনেছে পুলিশ নাকি ওদের অফিসের সমস্ত কল ট্র্যাক করছে গতমাস থেকে, তবে থেকেই অস্বস্তিটা বেড়েই চলেছে।
আজ মঙ্গলবার। কার্শিয়াং এ ফোন করতে হবে বান্টুকে। ঠিক দুটোর সময়। ক্লাস সিক্স হয়ে গেল ওর। দেখতে দেখতে। মোবাইলের স্ক্রীনে বান্টুর একটা ছবি রয়েছে। ও একা। নিউ মার্কেটের ঠিক গেটের সামনে। দু বছর আগেকার। ক্রিসমাসের দিন তোলা। লাল, সাদা স্ট্রাইপড-টি-শার্টে অদ্ভুত লাগছে ওকে। বয়সের থেকে একটু বড়ই।
ব্রোকেন ফ্যমিলির ছেলেমেয়েরা একটু তাড়াতাড়িই বড় হয়ে যায়। বিদিশা জানে দুটোর সময় যখন ওকে ফোন করবে, ঠিক মিনিট তিনেক কথা বলবে বান্টু। ভাবলেশহীন গলায়। ঠিক যেন কেউ শিখিয়ে দিয়েছে ওকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা কথাও বলবে না।
বিদিশার বুকটা মুচড়ে উঠল। থ্রি-কোয়ার্টারের বাঁ পকেট থেকে সিগারেট বের করে জ্বালালো একটা। ষোল তলার ওর এই অ্যাপার্টমেন্টটা। গত এক বছর হল ওরই নামে রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে।
মহিম সরকার কথার খেলাপ করে না।
উল্টোদিকেরটা ওর নিজের। দুটোরই দেখ-রেখ করে বিদিশা। পৃথিবীর নানান দেশের শৌখিনতম আসবাবপত্রে ঠাসা দুটো ফ্ল্যাটই। বিদিশারটা একটু বড়। মহিমেরটা ছোট। তেরোশ পঞ্চাশ আর এগারোশ। ওরটাতে একটা বেশী বাথরুম আছে। তিনটেই বেডরুমের সঙ্গে অ্যাটাচড।
বান্টু ছুটিতে এলে এখানে ওঠে ঠিকই কিন্তু বিদিশা বুঝতে পারে ও খুশী নয়। ওর দৃষ্টি খুঁজে বেড়ায় দমদমের সেই ভাড়া বাড়ির দৈন্যতাকে, ওর, অরিণ আর বান্টুর সেই গরীব কিন্তু আনন্দের উচ্ছাসগুলা ছোট্ট বাসাটা। বিদিশাও কি এখনো খুঁজে বেড়ায় না?
একটা গভীর টান দিয়ে ধোঁয়াগুলো নিচের দিকে ছেড়ে দিল বিদিশা। ধোঁয়াগুলো ওপরের দিকেই মিলিয়ে গেল। জীবনটা ওর এই ধোয়াগুলোর মতই মনে হল ওর। নীচের দিকে ছাড়লেও ওপরেই উঠবে। কারুর বশ মানে কি? জীবন!
মোবাইলে তখনই বেজে উঠল সুন্দর একটা রিং টোনে।
রহিম ফোন করেছে। ঠোঁট কামড়ালো বিদিশা।
অন্য ফোনটা আগে একসপেকট করেছিলো ও।
"হুবলো!"
"খবর ভাল নয় ম্যাডাম, সাহেব না বললেও আমার ইনফরমেশান অনুযায়ী, ব্যাপারটা ভীষণ ক্রিটিক্যাল হতে যাচ্ছে!" একটু উত্তেজিত রহিম শেখ।
"মানে? সিগারেট টান মেরে বলল বিদিশা "ইউ মিন ইটস সিরিয়াস।"
"ইয়েস ইট সিম্স" ঠান্ডা গলায় বললো রহিম। কাল আপনার সঙ্গে ডিটেলসে কথা বলব, দেখা করে, বাই!"
ঝঠ করে ফোন কেটে দিল রহিম। ও ওরকমই। একটু স্বার্থপর। বিছানাতেও একই রকম। নিজের কাজ শেষ করেই উঠে পড়ে। একেক দিন বিদিশা রি-ওাক্টও করে তার জন্য।
"হোয়াট ড্যু ইউ মিন? আমার তো হলই না কিছু।" রহিমকে খামচে ধরে বলে বিদিশা।
'আপনাকে খুশি করা ইটস্ লাইক আ হেল! ম্যাডাম!"
"ইউ বান্টার্ড-একদম নয়- ফিনিশ মি ফার্স্ট, দেন আইল লেট ইউ গো!"
ততক্ষণে প্যান্ট পড়া হয়ে যায় ওর। চকিতে উঠে এলোপাথাড়ি কিল, চড় মারতে থাকে বিদিশা ওর ছ ফুট দু ইঞ্চি শরীরে। কিসসু বলে না ও। ওর পুরো নগ্ন শরীরটা কাছে টেনে নিয়ে ওর ঠোটে গভীরভাবে চুমু খায় খালি একাধিকবার। তারপর গভীর গলায় বলে, "নেক্সট্ দিন, ম্যাডাম-আই প্রমিস ইউ" কিছুতেই আপনি ছেড়ে তুমিতে আসেনি রহিম। এখনো। গলা জড়িয়ে ধরে ওর বিদিশা। কেন জানেনা তখন ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল বেরিয়ে আসে। ওর চাবুকের মতো শরীরটা রহিমের পেশীবহুল শরীরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে যায়।
একটা ঝর্নাধারা যেমন আছড়ে পড়ে পাথরের ওপর। মুখ না তুলেই বলে ও রহিমের বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে "প্রমিস মানে প্রমিস কিন্তু। নয়তো আই'ল কিল ইউ!"
সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে গুঁজে বাথরুমের দিকে সবে ঘুরেছিল বিদিশা তখন হঠাৎ আবার মোবাইলটা বেজে উঠল।
এ ফোনটাই আগে আশা করেছিল বিদিশা।
"কি ব্যাপার, তুমি অফিসে আসোনি? হোয়াই?"
"ভাল্লাগছে না, কেন খুব আর্জেন্ট?"
"মানে? এটা কি ধরনের মাজাকি? নাকি এখন থেকেই অ্যাভয়েড করার অ্যাটিটিউড?"
একটু থামল বিদিশা। ওর ও ঠোঁটের কাছে চলে এসেছিল উত্তরটা কেন তুমিও তো নাকি তিনদিন ধরে আসছ না? ফোনও তুলছ না?
"ওকে, রিল্যাক্স... আমি আসছি, স্নান করেই বেরিয়ে পড়েছি!"
মিনিট পনেরোর মধ্যেই রেডি হয়ে পার্কিং লটে নেমে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিল বিদিশা। তখনই আরেকটা ফোন এল, অচেনা নাম্বার। ধরবো কি ধরবো না করেও ধরেই ফেলল বিদিশা।
"ইয়েস, হুজ স্পিকিং?"
"আর ইউ বিদিশা মিত্র? ওয়েল সরি টু বদার ইউ ম্যাম। আমি পরিমল, পরিমল সিন্হা। স্পেশাল ব্রাঞ্চ, লালবাজার আপনার সঙ্গে যে একটু দরকার ছিল ম্যাডাম?"
পরিস্কার কাটা কাটা গলায় বলল ওইদিকের বক্তা। মুহুর্তে পা টলে গেল বিদিশার।
"হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো... ম্যাডাম"
লাইনটা কেটে দিল বিদিশা। ঝড়ের মতো গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে এল ও কমপ্লেক্স থেকে। নিউটাউনের থেকে ওর স্টিল কালারের এস.ইউ.ভি. চললো সরোজীনি টাওয়ারের দিকে। ঊর্ধ্বশ্বাসে।
।। জগমোহন চৌরাসিয়া ।।
খুব ভোরে উঠে পড়েন জগমোহন। এটা তাঁর ছোট্টবেলার অভ্যেস। বাড়ির গেট থেকে রাস্তা পেরিয়ে গঙ্গার ঘাট-মাত্র দু মিনিট। সকালের এক রাউন্ড হাঁটা শেষ করে ঘাটে আধঘন্টা দলাই মলাই করান তিনি। তপন বলে একটা ছেলে করে দেয়। আগে ওর বাপ পঞ্চ করে দিত। দেড়-বছর যাবৎ ফিকের ব্যথায় বড্ড কাবু- তাই ছেলে, বাপের জায়গা নিয়েছে। তপনকে একটা মোবাইলের দোকান করে দিয়েছেন জগমোহন। কিন্তু শর্ত হচ্ছে সকাল সাড়ে ছটা থেকে সাতটা আহিরিটোলা ঘাটের নিজস্ব জাজিমে, নিজস্ব তেল, জড়িবুটি দিয়ে মালিশ করে দিতে হবে।
প্রথম প্রথম তপনেরও খুব একটা ইচ্ছে যে ছিল, তা নয়। অভিজ্ঞ জগমোহন বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু এইটা বড্ড পছন্দের "চিজ জগমোহনের। লোকের পরিস্থিতি অনুযায়ী তাকে গুঁতিয়ে ঠিক করা। নিজের মতোন করে। খুব কমই কথা বলতেন ওর সঙ্গে - কিন্তু ঠারে ঠোরে বোঝাতে কসুর করতেন না যে তাঁরই দয়ায় ওর দোকানটা হয়েছে। এখন পঞ্চার চেয়েও ভালো মালিশ করে তপন।
ঠিক সাতটায় পাশে বসে থাকা জসিম জগমোহনকে জানান দেয়। জসিম সাড়ে পাঁচটা থেকে ছায়ার মতো লেগে থাকে ওঁর সঙ্গে। প্রায় ছফুটের দীর্ঘ সুঠাম চেহারা নিয়ে আটষট্টি বছরের জগমোহন গঙ্গায় নেমে পড়েন। প্রথমে সূর্যস্তব তার পর গঙ্গামন্ত্র। পাক্কা কুড়ি মিনিট অবগাহন করেন পবিত্র জলে। বছর দশেক আগে সাঁতরে পার হয়ে যেতেন গঙ্গা, আবার ফিরে আসতেন। সে জোর, সে দম এখন আর নেই।
ল্যাঙ্গট পড়ে গামছা চড়িয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন জগমোহন। বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলাই শ্রেয়। কুমুদবাবুর ছেলে সঞ্জয় আর ছেলেবৌ অনিতাকে ডাক দিয়ে তোলেন একতলায়। ওদের সাতবছরের ছেলে রণজয় ওরফে রনির সঙ্গে একটা আলাপ চলে ওঁর। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে সিঁড়ি দিয়ে সোজা দোতলায় নিজের ঘরের বাথরুমে ঢুকে যান তিনি। গঙ্গায় স্নান করেও বাড়িতে গিজারের গরমজলে সাবান দিয়ে আগে একবার নিজেকে ধুয়ে নেন আপাদমস্তক। গঙ্গা এখন যা দূষিত। তারপর পুজোপাঠ। এরপর ব্রেকফাস্ট। দুটো রুটি, সামান্য তরকারি আর চিনি ছাড়া একবাটি ছানা। দুধ জগমোহনের সহ্য হয় না।
পাক্কা পৌনে নটায় মোবাইলগুলো খোলেন জগমোহন আর ন'টা বাজতে পাঁচে তৈরী হয়ে নেমে যান একতলার নিজের এয়ারকন্ডিশনড্ বিশাল অফিসে। দশ কাটার ওপর এই বিশাল প্রাসাদ আসলে ছিল কমলাক্ষ সিংহরায়ের। বিহার থেকে আসা হতদরিদ্র ধনিয়া আর তার পরিবারকে এই বিশাল প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে একটা পানের দোকান করতে দিয়েছিলেন তিনি। দোকানটার তলায় তক্তা দিয়ে একটা জাগয়া ঘিরে গোটা পরিবারই থাকত। ধনিয়া তার বউ আর দুই ছেলে এক মেয়ে। ওইখানেই শোয়া, বসা - ভেতরে দারোয়ানের কলঘরে শৌচের অনুমতিটুকু।
কমলাক্ষের পর তাঁর বড় ছেলে কুমুদবাবুও তেমনটাই বহাল রাখলেন। পেট কেটে টাকা জমিয়ে ধনিয়া চৌরাসিয়া দোকানটা এই সময় দলিল-দস্তাবেজ করে কিনে নিল। এটা ষাটের দশকের মাঝামাঝি।
নাক থেকে সর্দি গড়ানো একটা ফরসা ছেলে ওই দোকানের নীচে ছোট্ট বদ্ধ ঘরে শুধু ভাবত তার জন্য ভগবান এরকম দমবন্ধ করা কুঠুরি কেন বরাদ্দ করলো। সময় গড়াতে লাগলো। ছোট্ট একরত্তি ছেড়ে বাড়তে বাড়তে ছ ফুট হয়ে গেল। চোখে তার একটাই স্বপ্ন। এই কুয়ো থেকে বেরোতেই হবে।
ন'টায় ঢুকে নিজের বিশাল চেম্বার যখন রোজ বসেন জগমোহন তখন তাঁর মনে হয় ঠিক এই ঘরটার নীচের একটা ছোট্ট পাঁচ বাই পাঁচের কুঠুরিতে তার ছোট্টবেলায় কত দীর্ঘশ্বাস এখনো বন্দী আছে। আছে মায়ের দুঃখের ইতিহাস, বাবার রক্তক্ষরণ।
জগমোহন চৌরাসিয়া ঠিক কি করেন তা কেউ জানে না। তবে রাজনীতির দেবালয়ে যাঁরা বসে থাকেন তাঁরা সমীহ করে চলেন জগমোহনকে। যে কোন মুহূর্তে পাশা পাল্টে দেবার ক্ষমতা রাখেন তিনি। মোট তেরোটা বার কাম রেস্টুরেন্ট আছে, শহরটা জুড়ে। একটাও নিজের নামে নয়। কিন্তু তিনিই মালিক। ছোট, বড়, মেগা কালো টাকার যা কাজ হয় এখানে সবটাই তাঁর নখদর্পণে।
এছাড়া শেয়ারবাজার, ফাটকা বাজার, দৈনন্দিন জিনিসপত্রে বাজার, সবজায়গায় তাঁর এজেন্ট ঠিক করা আছে। শোনা যায় প্রায় বারোটা পেট্রল পাম্পও নাকি ওঁরই। জিগ্যোস করলেই হাসিমুখে বলেন "আমি তো বেকার লোক ভাই। ভাই আর ছেলেদের দৌলতে খাই!"কতটাকার যে মালিক তা তিনি নিজেও জানেন না।
জগমোহন কিন্তু রীতিমত শিক্ষিত লোক। পড়াশুনোকে কক্ষনো অবহেলা করেন নি। হিসাব আর সাহিত্য দুটোই চলেছে তার শৈশব থেকে কৈশোর হয়ে এখনো পর্যন্ত, সমানভাবে।
"চৌধুরীমশাই, আজকে যে পাক্কা সাড়ে পাঁচ মিনিট লেট!"
শশব্যস্ত হয়ে ঢুকতে থাকা বিশ্বস্ত কর্মচারীকে বললেন জগমোহন।
"আর বলবেন না স্যার, আগের অটোটা একটুর জন্য মিস করলাম!" পয়মন্ত!
চৌরাসিয়া পান সেন্টারটা এখনো বন্ধ করেন নি জগমোহন। ওটাই যে পয়মন্ত। গোটা বাড়িতে চব্বিশটা ঘর। নিজের ছেলে, ভাইপোরা তাদের ছেলে মেয়েরা মিলে উনিশজনের বিশাল পরিবার তাঁর।
ভাই পরাশর দু বছর আগে ক্যানসারে গত হয়েছে। সিঙ্গাপুরে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে প্রায় কোটি টাকা খরচ করেছেন জগমোহন কিন্তু বাঁচাতে পারেন নি। বাড়িটা ছাড়া আর কোন সম্পত্তি নিজের নামে নেই। কুমুদবাবুদের অবস্থা যখন থেকে পড়তে শুরু করে তখনই জগমোহনের উত্থান ঘটে। ছোট্ট ঘরে আঁটে না ছ ফুটের শরীরটা। ফুটপাথে খাটিয়া পেতে শোয় দুই-ভাই। দোকানে বাবা, নীচে মা আর বোন।
সংসারের জোয়াল কাঁধে নিয়ে জগমোহন স্কুল ফাইনাল পাশ করেন। দোকান্টা ততদিনে রমরমা। পানের সঙ্গে চা, কচুরি-সকালে, বিকেলে। জগমোহন সিটি কলেজে মর্নিং এ পড়েন। দুপুরে সেলস এর চাকরি। রাতে 'ডকে' মস্তানি, জাহাজের 'স্পেস'-এর দালালি। কলেজে পড়া 'মস্তান' তখন এক নকশাল ছাড়া বোধহয় জগমোহনই।
আশির গোড়ায় একটা গোটা জাহাজের বিশাল কারচুপি হয়। শোনা যায় তার পুরো মাস্টারমাইন্ডই জগমোহনের। রাতারাতি ধনবান হয়ে হয়ে যান তিনি। কলেজ শেষ করে ইকনমিক্সে মাস্টার ডিগ্রিও হাসিল করেন তিনি।
কুসুমবাবুদের থেকে আস্তে আস্তে গোটা বাড়িটা কিনতে শুরু করেন জগমোহন। সিংহরায়দের তখন দেনার ভীষণ দায়! সারা বাড়ি কিনে নিয়েও একতলার একটা ভাগ কিন্তু ওঁর ছেলে সঞ্জয়কে দান করে দেন তিনি লিখিত-পড়িত।
"বুঝলে চৌধুরীমশায়, এইখানে ছোট্ট একটা ছেলে শুনেছিল তা বাপকে বুড়োবাবু বলছে - শোন ধনিয়া চিরকাল পায়ের তলায় থাকবি বুঝেছিস নখের তলায় - আর আজ!"
একটা ভীষণ দৃষ্টি আটকে যায় চৌধুরীর চোখে।
শিউরে ওঠেন তিনি। এই কারনেই সঞ্জয় সিংহরায়কে নিজের পায়ের তলায় রেখেছেন জগমোহনবাবু!
কি নিষ্ঠুর চাহনি তাঁর এই সময়টাই! এই জন্যেই বোধহয় দানপত্র করে দিয়ে দিয়েছেন অংশটা। রোজ রোজ যাতে কুরে কুরে খায় ওদের যে তাঁর দানেই ওদের বেঁচে থাকা।
চোখ নামিয়ে নেন চৌধুরীমশাই। আজ পর্যন্ত মনিবকে বুঝতে পারেন নি তিনি। কখনো মনে হয় এক অন্ধকার জগতের ক্রুর, নিষ্ঠুর, নির্মম এক কসাই।
"বুঝলে হে চৌধুরীমশাই- মহিমের ব্যাপারটা আমার কেমন কেমন লাগছে।
জলটা ঠিক কোথায় যে গড়াবে-!"
"কি বলছেন স্যার মানে সরোজীনি ট্রাস্ট?"
পেপার ওয়েটটা হাতের তালুর তলায় রেখে, আস্তে আস্তে টেবিলটার ওপর গড়াতে শুরু করলেন জগমোহন।
"হুঁ- ম্যাডাম মনে হচ্ছে আরেকটা ইউ-টার্ন নেবে!"
।। পরিমল সিনহা ।।
মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে ছিল পরিমল। নাহ, এক্ষুনি আর করার দরকার নেই। বিদিশা মিত্র হঠাৎ লাইনটা কেটে দিল কেন? গোটা ফাইলটা খুব গোপনীয়ভাবে হেড-অফিস থেকে ঠিক মাস-দেড়েক আগে এসেছে। জানলার পাশে এসে শহরটার দিকে তাকালো পরিমল। মনে পড়ে যাচ্ছে দেড় মাস আগের সেই বিকেলটা। বড় সাহেব যেদিন ডাকলেন ওকে, রফিক আর শেখরদাকে। মিনিট পনেরো আগে মেইল'এ এসেছে ডকুমেন্টগুলো। তাতে এক রাউন্ড চোখ বোলাতেই পরিমলের চোখ ছানাবড়া। তার সার্ভিস লাইফের আটবছর কেটে গেছে। অনেক জটিল ব্যাপার হ্যান্ডল করেছে। কিছু সমাধান করতে পেরেছে, কিছু পারেনি। কিন্তু এটা দেখে ওরও ভিত নড়ে উঠেছে। ধাতস্থ হবার আগেই ফোন, তলব।
"ওয়েল অফিসারস্, খুব টাফ একটা ফাইল তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছে। আমি জেনেছি সকালে- আর তোমরা এখন। প্রথমেই একটা এফিসিয়েন্ট ফোর্স তোমরা তৈরী করে ফ্যালো। দুদিনের মধ্যে। মোটামুটিভাবে দশজনের, ইনিসিয়ালি। একটা লিস্ট তোমাদের দেওয়া হয়েছে- আমি চাই তার সঠিক মূল্যায়ন করো তোমরা।"
একনাগাড়ে বলে বড়সাহেব থেমেছিলেন। একফোঁটা হাসিও নেই মুখে। থমথমে একটা পরিবেশ।
"মানে স্যার, একটু ডিটেল্স-এ যদি বলেন, লিষ্ট তৈরীর ব্যাপারটা?" শেখরদা মাথা চুলকে বলেছে।
"ওয়েল, তোমরা ইনভেস্টিগেট করা শুরু করে দাও, ইভ্যালুয়েট করো যে লিস্টটা আরো বড়ে হবে নাকি ইউ ক্যান চাক আউট ফিউ অফ দেম"।
সি.আই.ডি. অফিসে কাজের ধারাই এরকম। কখন কোথায় টুপ করে একটা জটিল কেস চলে আসবে তা স্বয়ং ওপরওয়ালাই জানেন। সেদিন রাত বারোটায় বাড়ি গেছিল পরিমল। রফিক আর শেখরদার সঙ্গে আলোচনা সেরে।
ন'টা নাগাদ নন্দিতাকে বেমালুম চেপে দিয়েছিল সেদিন।
'নন্দু ডার্লিং আজকে ওই পার্টিটাতে যেতে পারছি না, একটা রেইডে এসেছি, দেরি হবে, ম্যানেজ করে দিও।"
ওদিক থেকে কিছু বলার আগেই ফোন কেটে সুইচ অফ করে দিয়েছিল ও। খুড় শাশুড়ীর জন্মদিনে এমনিতেই যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। করিডরে একটা সিগ্রেট টেনে আবার আলোচনায় ফিরেছিল পরিমল। লিষ্টে প্রায় চৌত্রিশটা নাম ছিল।
নেতা, অভিনেতা, অভিনেত্রী, উকিল, ডাক্তার, চার্টাড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, রাজনৈতিক ব্রোকার, শিল্পী, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, লেখক কে নেই সেখানে। আর অবশ্যই সেই কোম্পানীরই বেশ কিছু হোমরা চোমরা।
"শোন পরিমল, ডিরেক্টারদের ড্রাইভারগুলো আর বডিগার্ডসদের সবার আগে স্ক্যানারে নিয়ে আসতে হবে পেয়ারাগুলো ময়দানে ছড়িয়ে দেব ভালো করে -" পেয়ারা মানে খোচো - গোয়েন্দা বিভাগে সবাই জানে বলেছিল শেখরদা।
"রফিক, দু তিনটে ইনটেলিজেন্ট মেয়ে অফিসার সিলেক্ট করে ফ্যাল, যা লিস্ট দেখছি, সব্বাই হাই প্রোফাইল মাল খুউব কায়দা করে হ্যান্ডল করতে হবে!" রফিকের দিকে চেয়ে বলেছিল শেখরদা। রফিক খুব কমা কথা বলা ছেলে। অসম্ভব ঠান্ডা মাথা। দারুণ শার্প। কিছু ক্ষেত্রে পরিমল বোকামী করলেও রফিক ঠিক সামলে দিয়েছে।
"শালা, সরোজীনি ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট- তাই বলি, এত রমরমা এ কদিনে হয় কি করে- কি ঘুঘুই না বাসা বেঁধেছে এখানে!"
শেখরদা মনিটরের লিস্টে চোখ বুলিয়ে চলেছে।
সেই শুরু আর আজ প্রথম সেকেন্ড ফেজ অপারেশানের ফোনটা করল পরিমল।
ফোন কল এর মধ্যে ট্যাপ করা আরম্ভ হয়ে গেছে। দফায় দফায় মিটিং হয়ে গেছে। অনিন্দিতা আর পারুল বলে দুটো মেয়ে এসে গেছে ওদের টিমে। পরিমলকে অ্যাসিষ্ট করছে দুজনই।
অনিন্দিতা, পারুলের থেকে একটু সিনিয়র। হিলহিলে চেহারা, প্রচন্ড বুদ্ধিদীপ্ত দুটো চোখ। তুলনায় পারুল একটু ভোঁতা। সাদামাটা চেহারা আর মুখশ্রী, তবে দুজনেই চটপটে আর পারদর্শী।
লিফ্ট চৌত্রিশ বেড়ে আটচল্লিশ হয়ে গেছে। সেটা আবার ভাগ করা হয়েছে। ভেরি হাই প্রোফাইল। হাই প্রোফাইল আর অর্ডিনারি। প্রথম ক্যাটাগরিতে শুধু গণ্যমান্যই নেই এই কেসে যাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে তারাও আছে।
দেড় মাসে পারিবারিক জীবন বেশ ব্যাহত হয়েছে। মিন্টুর সঙ্গে ঠিকমতো জমছে না পরিমলের। ওর সঙ্গে ব্যালকনিতে ক্রিকেট খেলা আর হচ্ছে না। মেয়েটা ঠিক ওর মতো। ক্রিকেটের হেভি ফ্যান।
নন্দু ডার্লিং এর সঙ্গে বিছানার খেলাটাও কি আর জমছে?
গত সপ্তাহে নন্দিতা ওপরে উঠেছিল ওর। ব্যাপারটা হল কিন্তু পরিমল বুঝতে পারলো ঠিকমত 'মনোযোগ' দিয়ে হল না।
"কি যে হয়েছে তোমার? সাঁইত্রিশেই বুড়িয়ে যাচ্ছ না এমন!" পাশে জড়িয়ে ধরে শুয়ে নন্দিতা আদুরে গলায় বলেছিল।
"কেন হলো তো? তোমার হয়নি?" ঠান্ডা গলায় বলেছিল পরিমল।
ওর মাথায় তখন একটা লিষ্টই ফুটে ফুটে উঠছিল।
"কি একটা কেস এসছে গো তোমার? আমায় বলবে না।"
"উঁহু-টপ সিক্রেট-নিজের ছায়াকেও বলা বারণ!"
সেদিনের পর তারপর আর হয়নি। রোদের ঝলকানিতে দশতলার ওপর থেকে শহরটাকে অন্যরকম লাগছিল পরিমলের। এখানে লুকিয়ে আছে কত রহস্য, কে জানে?
"স্যার, দেখুন তো ঠিক আছে কিনা?" একটা পেনড্রাইভ হাতে করে অনিন্দিতা ওর চেম্বারে ঢুকে পড়ল। পেন ড্রাইভ নিয়ে কম্প্যুটারে বসবার সময় হাল্কা করে ওর বুক ছুঁয়ে গেল পরিমলের বাঁ কাধ। একটা মিষ্টি গন্ধ পেল পরিমল মনিটরে চোখ রাখতে রাখতে। "স্যার জয়া সেনগুপ্ত, এলা মুখার্জী এরা ফিল্মষ্টার আর শিল্পী ফন্তু নারায়ণ নাটকের ইপ্সিতা ভরদ্বাজ - এই মোটামুটি ঠিক আছে তো?" আলতো করে বলল অনিন্দিতা।
"আমি দেখছি, তুমি প্রথম কাকে দিয়ে শুরু করবে ভেবেছো?"
"আপনি বলুন"।
"ষ্টার্ট উইথ কিং পিন-জয়া"
"ওকে স্যার বাট একটা কথা ওরকম একটা জাতীয় পুরস্কার পাওয়া স্টার অ্যাকট্রেস - হাউ ড্যু আই ক্র্যাক হার, একটু বলে দেবেন?"
ওর চোখের দিকে তাকিয়ে পরিমল ভাবল এটা কি নিছক ন্যাকামি নাকি সত্যি জানার ইচ্ছা।
চেয়ার থেকে উঠে পড়ল পরিমল।
ব্যাঙ্ক 'দ্যাখো অনিন্দিতা, ইট্স আ টাফ আস্ক, টাফ গেম একটা কোশ্চেনেয়র তৈরী করো, ধাপে ধাপে, রেলেভেন্ট ডক্যুমেন্টস্ডলো রেডি রাখো স্টেটমেন্ট, পাসপোর্টের ভিসার ষ্ট্যাম্প আর তারিখগুলোর ডিটেইলস একসেটরা দেখবে আস্তে আস্তে খোলস ছাড়াচ্ছে।
- হ্যাঁ বুঝেছি স্যার- বাট যদি বিশ্রিভাবে রিঅ্যাক্ট করে?"
- করবেই, কোয়াইট অবভিয়াস- কথায় কথায় তোমায় উল্টে ধমকাবে, চাকরি খেয়ে নেবে, সুন্দরবনে পোষ্টিং করাবে, অন্য টোপও দিতে পারে, নিখুঁত অভিনয় করবে - কই জানি না তো, এসব তো আমার অ্যাকাউন্ট্যান্ট জানে- কনট্যাক্ট হিম-আমার ল ইয়ারের সঙ্গে কথা বলুন প্লিজ- এসব তো বলবেই, ডোন্ট লুজ ইয়োর কাম -"পরিমল ওর অভিজ্ঞতা উজাড় করে দিচ্ছিল"। "এটা বলবে দু'তিন দিন তারপর আস্তে আস্তে ভাবনারেল বল হবে, ভাঙবে ধীরে ধীরে - ইট্স অ্যান ইন্টারেস্টিং গেম ডিয়ার আর লাষ্ট স্টেজ হল বুক ধড়ফড়ানি বা দুম করে অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল গমন!"
"বুঝলাম স্যার - তাহলে তো মোটামুটি চার পাঁচটা সিটিং লাগবেই!" অনিন্দিতা তাকানো ওর দিকে সেই বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি দিয়ে।
- মে বি মোর!" পরিমল বললো।
"একটা রিকোয়েস্ট করবো- রাখবেন - আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন তো স্যার?" এবার গাঢ় সেই চাহনি দিয়ে তাকালো অন্দিদিতা।
"তা তো বলতে পারছি না - রফিক স্যার বা শেখর স্যার বা দাসগুপ্ত স্যারও থাকতে পারেন - তাতে কি? বি ব্রভ তুমিই পারবে ঠিক!" পরিমল উৎসাহ দিল। ভেতরে ভেতরে একটু নার্ভাস হয়েই।
- "প্লিজ স্যার - প্রথম দুচ দু চারটে সিটিং না করবেন না- একটু ম্যানেজ করুন -আইল ফিল কমফরটেব্ল আইল ফিল গুড বি ব্রেভ - স্যার!" এতে কোন ন্যাকামি লক্ষ্য করল নাসি.আই.ডি. অফিসার।
অনিন্দিতা বেরিয়ে গেছিল ওর চেম্বার ছেড়ে।
জানালা দিয়ে সরোজীনি টাওয়ার্স এর দিকে চেয়ে পরিমলের মনে হল কেসটা জটিলতর হচ্ছে।
(ক্রমশ)
প্রচ্ছদঃ নীল মজুমদার
