(১)
সংসারের মাঝপথে হঠাৎ ছন্দপতন। পেঁপে আর পেপসি নিয়ে গন্ডগোলের সূত্রপাত। জ্যৈষ্ঠ মাসের মঙ্গলবার। গনগনে রোদে কার গাছ থেকে কে জানে, এক বস্তা পেঁপে পেড়ে বস্তাবন্দি করে কাঁধে নিয়ে ঘরে আসে লখাই। বস্তাটা ঘরের মেঝেতে ধপাস করে নামিয়ে আদরিনীকে ডাকে।
আদরিনী সবেমাত্র মঙ্গলবারের পুজো সেরে উঠেছে। লখাইয়ের ডাক শুনে বেরিয়ে এসে দেখে, মেঝেতে এক বস্তা কী যেন নামিয়ে রেখে মেঝেতেই বসে আছে লখাই। গা থেকে দরদর ঘাম ঝরছে। মুখটা হনুমানের পোড়া মুখের মতো হয়ে গেছে। সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখে, লখাইয়ের কাঁধের একজায়গায় রক্ত।
অবাক হয়ে আদরিনী জানতে চায়, 'বস্তায় কী আছে?'
লখাই পেঁপের কথা বলতেই আদরিনী লখাইকে ভর্ৎসনা করে, "এই রোদে কে তোমাকে পেঁপে পাড়তে বলেছে। তাও আবার এক বস্তা।"
তারপর চটপট রান্নাঘর থেকে বোরোলিন এনে লখাইয়ের কাঁধে মালিশ করে। এবং একটু পরেই ওই রান্নাঘর থেকে একটা পেপসির বোতল এনে লখাইয়ের হাতে দিয়ে বলে, "নাও। এটা খেয়ে নাও। একটু পরে স্নান করে খেয়ে নিও। বিকেলে কোনো ডাক্তারকে দেখিয়ে আসবে। বলা যায় না, কী হতে কী হয়ে যাবে।"
লখাই তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, "না না, এমন তো কতোবারই হয়েছে। অত ভাবিস না তো। আমরা কি ঐ ফ্ল্যাটের বাবুদের মতো নাকি, যে একটুতেই ইনজেকশন নিতে হবে। ডাক্তার দেখাতে হবে। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই বরং পেঁপেগুলো এক জায়গায় জড়ো করে রাখ। কাল বাজারে গিয়ে বিক্রি করে আসবো।"
"আর হ্যাঁ রে। তুই পেপসি কোথায় পেলি।"
"সে কথা না-ই বা জানলে। দিচ্ছি, খেয়ে নাও।"
লখাইয়ের সন্দেহ হয়। এঘরে কখনো তো পেপসি আনেনি সে। আদরিনীই বা কোথা থেকে পেলো। সেকথা তো একবারও আমাকে জানায়নি। তাই সন্দেহের বশে সে বলেই ফেললো, "ও। ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিস। কোনো ছোকরার সাথে পিরিত করছিস বুঝি! তা ভালো। ভালো।"
কথাটা শুনেই আদরিনীর বুকে কেউ যেন মস্ত একটা পাথর ছুঁড়ে দিলো। মাথায় হাত দিয়ে সে ধপাস করে বসে পড়লো মেঝেতে -'কী বললে। আমি ছোকরার সঙ্গে পিরিত করছি। ওর কাছে আমি পেপসি পেয়েছি। তাহলে তোমাকে পেপসি দিতাম না। চুপিচুপি নিজেই খেয়ে নিতাম। এই তোমার আক্কেল। বলিহারি তোমাকে। গাছে গাছে ঘুরে তোমার বুদ্ধিটাও হনুমানের মতো হয়ে গেছে। যাও। আমার সাথে তুমি আর কথা বলবে না বলে দিলাম। কালই আমি বাপের বাড়ি চলে যাব। আর তোমার ভাত খাবো না। এতদিন ঘরকন্না করে শেষে তুমি আমাকে এই প্রতিদান দিলে। সেইসব দিনের কথা বেমালুম ভুলে গেলে। থাকো তুমি তোমার সংসার নিয়ে।'
(২)
দুজনেরই মনের গহনে তখন পুরানো দিনের স্মৃতি উকি মারছে। বছর আট দশ আগে, লখাই তখন তরতাজা বেঁটেখাটো এক জোয়ান। সকাল থেকে সন্ধে অব্দি এগাছে- ওগাছে চড়ে নানা রকমের ফল পাড়াই ছিল তার নেশা। সে নেশা এই মধ্যবয়সেও কোনো অংশে কমে যায়নি। আম, জাম, পেয়ারা, বেল, তেঁতুল, কুল, কাঁঠাল, খেজুর এমনকি তাল গাছে চড়তেও সে ওস্তাদ। ফাঁক পেলেই এর-ওর গাছে চড়ে বেশ কিছু ফল পেড়েই দে চম্পট। ধরা পড়লে কিছু গালিগালাজ শুনতে হতো বটে, তবে তা সে হজম করে নিতো অক্লেশে। মাঝেমধ্যে কান ধরে ওঠবোস বা একটু আধটু চড়-থাপ্পড়ও খেতে হয়েছে। কখনো আবার পেড়ে নেওয়া সব ফলগুলিই মালিককে দিয়ে চুপচাপ ফিরে আসতে হতো। তাতে লখাইয়ের কোনো দুঃখ নেই। সে জানে, কোথাও কোথাও হোঁচট খেতেই হবে। অন্যত্র তা সে পুষিয়ে নেবে ঠিকই - এ তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল।
এমনিভাবেই একদিন পুকুরের পথে এক পেয়ারা গাছের তলায় আদরিনীর সাথে তার পরিচয়।
ছোটবেলাতেই লখাই তার মা বাবাকে হারিয়েছে। এখন তার মা বাবার চেহারাটাও মনে পড়ে না। দাদা রাম আর বৌদি সৌদামিনীর কাছেই সে বড়ো হয়েছে। মা বাবা নেই বলে দাদা বৌদি তাকে বেশ আদরেই রাখতো। সেই সুযোগ পেয়ে লখাই যেন আরও বেশি ডানপিটে হয়ে গিয়েছিল। লখাই তো নয় - ওর আসল নাম লক্ষ্মণ। রাম-লক্ষ্মণ দুই ভাই। রাম ওকে লখাই বলেই ডাকতো। সেই থেকে পাড়ার সবাই ওকে লখাই বলেই ডাকে।
লেখাপড়া কিছুই জানে না। কোনোমতে এক থেকে কুড়ি পর্যন্ত গুনতে শিখেছে। তাই কোনো কিছুর হিসেব করলে সে এক কুড়ি দুই কুড়ি - এইভাবে হিসেব করতো।
একদিন পুকুরের একটু আগে একটা পেয়ারা গাছে চড়ে সে দেখতে পেলো একটা মেয়ে সালোয়ার কামিজ পরে পুকুরের দিকে আসছে। সামনাসামনি আসতেই সে তার দুধে-আলতায় গোলা গায়ের রং আর পূর্ণ-শশীর মতো মুখখানি দেখে পেয়ারা পাড়ার কথা শিকেয় তুলে মেয়েটির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলো।
মেয়েটি যেভাবেই হোক তার এই লোলুপ দৃষ্টি লক্ষ্য করলো। লজ্জায় মাথা নুইয়ে সে পেয়ারাতলার রাস্তা দিয়ে গুটিগুটি পুকুরের দিকে এগিয়ে গেলো। এভাবেই প্রাথমিক পরিচয় সম্পন্ন হলো।
এরপর প্রতিনিয়তই লখাইয়ের চোখে দুধে- আলতায় গোলা মেয়েটির মুখ সেই যে ভেসে ওঠে তা আর কিছুতেই ডুবতে চায় না। এদিকে মেয়েটিও ঘরকন্নার যাবতীয় কাজের মধ্যেই পেয়ারা গাছের সেই ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে থাকা ছেলেটিকে ভুলতে পারে না।
(৩)
শহরের উত্তর প্রান্তে বেশ কয়েকটি বস্তি এলাকা। তার একটিতে থাকে লখাই আর অন্য একটিতে সেই মেয়ে। কেউ কারোর ঘর জানে না। এখন তারা একে অপরের মন জানতেই ব্যস্ত।
কিন্তু সেই মন জানার ফর্মুলা জানা নেই কারোর।
আজ আর পেয়ারা গাছের ডালে নয়। গাছের গোড়ায় হেলান দিয়ে একটা ডাঁসা পেয়ারা চিবোচ্ছে লখাই। পথচলতি কোনো কোনো চেনা লোক জিজ্ঞাসা করছে, "এখানে কী করছিস লখাই"?
লখাই কখনো বলছে, "বন্ধুর অপেক্ষা" আবার কখনো বলছে, "এমনি বসে আছি"। কখনো আবার "তোর জেনে কী লাভ" বলে চাঁচাছোলা জবাব দিচ্ছে। আসলে কাউকেই সে সঠিক কারনটি জানতে দেয় নি। ওল কামড়ে গায়ে মেখে নেওয়ার কী দরকার বাবা।
নাঃ, আজ আর দেখা পেলো না মেয়েটির। হয়তো আগেই পুকুর ঘাটের কাজকর্ম সেরে ফিরে গেছে। সময়টা ঠিক আন্দাজ করতে পারে নি লখাই। নিরাশ হয়ে ফিরে গেলো সেদিন। মনটা সারাদিন অস্থির হয়ে থাকলো। বাড়িটাও তো জানে না যে নানা অছিলায় ঘরের চারপাশে ঘুরঘুর করে একবার না একবার দেখবেই তাকে। অতএব পরের দিনের অপেক্ষা ছাড়া আর কোন উপায় থাকলো না তার।
রাত্তিরে ভালো ঘুম হলো না লখাইয়ের।
পরের দিন অন্য দিনের চেয়ে একটু আগেই ঘুম থেকে উঠে সেই পুকুরে গিয়ে বেশকিছুক্ষণ প্রতীক্ষা করেও না দেখতে পেয়ে হতাশ হয়ে ফেরার সময় সেই মেয়েটির চলার অঙ্গভঙ্গি কল্পনায় দেখতে দেখতে এক অদ্ভুত অনুভুতি তার হৃদয়কে এমন দোলা দিল যা আগে উপলব্ধি করতে পারে নি।
"আজ মেয়েটির পুকুর ঘাটে যেতে দেরি হওয়ায় ছেলেটিকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে - "কৈ। কেউ তো নেই পেয়ারা গাছে। কোথায় গেলো।"
মেয়েটিও আজ হাড়ে হাড়ে টের পেলো অনুভূতি কী জিনিস। ফিরতি পথে বার কয়েক তাকালো পিছন ফিরে। দেখতে পেলো শুধু ছেলেটির বিমূর্ত শরীরখানি। বাকি সব শূন্য। সবই হতাশাপূর্ণ।
লখাই নাছোড়বান্দা। একেবারে ধনুক ভাঙা পণ। আজ সে দেখা করেই ছাড়বে। সেই যে ভোরে বেরিয়েছে, এখন প্রায় বারোটা, তবু ঘরে ফেরেনি। দাদা রামও ঘরে নেই। কাজে বেরিয়ে গেছে। ফিরবে সেই সন্ধের মুখোমুখি। বৌদি সৌদামিনী ঘর আর বাহির করছে। কিছু খেয়েও যায়নি ঠাকুরপো। কার কাছে আর খোঁজ নেবে। কোনো ছেলের সঙ্গে সে খুব একটা কথাও বলে না। মেয়েদের জিজ্ঞেস করে তো কোনো লাভ নেই। উল্টোপাল্টা কথা শুনতে হতে পারে। সৌদামিনীর মন আনচান করতে থাকে।
সেসব কী আর অনুভবের মধ্যে আসে লখাইয়ের। সে এখন সেই মেয়েটির চিন্তায় বিভোর।
ঠিক সেই সময় কাপড়চোপড় ভর্তি একটা বালতি হাতে কোমর দোলাতে দোলাতে মেয়েটি ঘাটের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। ধুলোমাখা খালি পায়ের এক একটা পদক্ষেপ লখাইয়ের বুকে এক একটা ঢেউ তুলতে থাকে। আজ তার সাথে কথা বলতে হবে যেভাবেই হোক। চারপাশটা ভালভাবে দেখে নেয় লখাই। নাঃ, কেউ কোথাও নেই। একটা বুড়ো লোক, সে অনেক দূরে আছে। সে সামনে পৌঁছানোর আগেই কাজ সারা হয়ে যাবে।
কিন্তু কী বলবে সে? কী জিজ্ঞেস করবে? যদি রেগে কিছু আজেবাজে মন্তব্য করে ফেলে। যদি জোর গলায় চিৎকার চেঁচামেচি করে তখন তো আর এক হ্যাপা - লখাই ভাবে।
তবু যা হয় হবে। অতশত ভেবে লাভ নেই। আজ সে মেয়েটির সাথে কথা বলবেই। এ সুযোগ সে কোনোমতেই হাতছাড়া করবে না লখাইয়ের জেদ তখন পঞ্চমে।
লখাই পেয়ারাতলা থেকে একটু এগিয়ে রাস্তার ওপর গিয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটির বুক ধুকপুক করতে থাকে। মনে একটা ভয়ও সৃষ্টি হয়। একেবারে সামনে দিয়ে কী করে সে পার হবে। আবার পিছিয়ে আসাও তো সম্ভব নয়। যদি কেউ দেখে ফেলে, সন্দেহ করে যে মেয়েটা ফিরে আসছে কেন। ছেলেটা কি কিছু বললো?
এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মেয়েটি ক্রমে পৌঁছে গেলো লখাইয়ের থেকে হাত কয়েক দূরে। এবার সে লখাইকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবে, এরকমই ভাবছে মনে মনে। মাথাটা নীচু করে মেয়েটি লখাইয়ের পাশ কাটিয়ে যাবে ঠিক তখনই লখাই খুব সন্তর্পনে মেয়েটিকে জিগ্যেস করে, "তোর নাম কী"?
কোনো উত্তর না দিয়ে মেয়েটি দু-এক পা এগিয়ে যেতেই লখাই আবার জিজ্ঞেস করে, 'কোন পাড়ায় থাকিস? বল না'?
মেয়েটি এবারেও নিরুত্তর। গুটি গুটি পায়ে পেরিয়ে সোজা পুকুরঘাটে।
লখাই একটু আঘাত পেলো। কী করে ওর মুখ খোলাবে। আর কী বললে সে জবাব না দিয়ে পারবে না - সেরকম প্রশ্নের খোঁজ করতে থাকে লখাই। গনগনে তাপে তার শরীর কত ডিগ্রিতে পৌঁছে গেছে তার কোনো তোয়াক্কাই সে করে না।
মনে মনে ভাবে, "মেয়েটি পুকুর থেকে ফিরুক। পিছু পিছু গিয়ে আজ তার বাড়িটার খোঁজ নিয়ে ছাড়বো। তারপর দেখছি কী করে ওকে কায়দায় ফেলা যায়।"
লখাইয়ের জেদ আরও বেড়ে যায়।
আদরিনী যখন পুকুর থেকে ফিরছে লখাই তখন আর রাস্তায় নেই। পেয়ারাতলাতেও নেই। সামনের বস্তির এক ছাঁচকোলে সে এমনভাবে অপেক্ষা করতে লাগলো যাতে মেয়েটি যেন একটুও টের না পায়।
পেরিয়ে গেলো মেয়েটি। এলোচুল। পরনে একটা গাছের ডালপালা আঁকা সবুজ রঙের ফ্রক। স্নান করায় তাকে যেন আরও বেশি বেশি উর্বশী দেখাচ্ছে।
লখাই পিছু নেয়। মেয়েটি ঘুণাক্ষরেও তা ঠাহর করতে পারে নি। পায়ে নূপুরের বোল তুলে সে এগিয়ে যায় ঘরের দিকে। ছেলেটির জিজ্ঞাসা তখনও তার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে "কী নাম রে তোর। কোথায় থাকিস রে তুই!"...
লখাইয়ের ঘর থেকে পাঁচ মিনিটের পথ, আর একটা বস্তি। হাতে গোনা খান কুড়ি গরিব মানুষের পরিবারের বাস। লখাই দেখে মেয়েটি দরজা ঠেলে একটা বাড়িতে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিল।
পাকা বাড়ি। দেখলেই বোঝা যায় বাড়িটা সরকার বানিয়ে দিয়েছে। একেবারেই নতুন। নীল রং করা। ঐ বস্তিতেই লখাইয়ের সাথে তার পরিচিত একজনের দেখা হয়ে যায়। সে জিজ্ঞেস করে, "কিরে! তুই এখানে?"
"এমনি। কোনো কাজ নেই তো। তাই ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম। এলাম বলেই তো তোর বাড়িটা দেখা হয়ে গেল। হ্যাঁ রে। এই বাড়িটা কার? সরকারের বানিয়ে দেওয়া মনে হচ্ছে!"
"আর বলিস না। এটা উপেনের বাড়ি। নেতা-টেতাকে ধরে কেমন বাগিয়ে নিলো দেখ। ওদের চেয়েও কত বেশি গরিব আছে এ পাড়ায়, তাদের আর ব্যবস্থা হল না। কী আর বলবো বল।"
"তা যা বলেছিস। সব জায়গায় এই একই অবস্থা। চলুক যা চলছে। আমরা চিৎকার করে আর কী করবো।" লখাই আরও বলে, "এইটুকু বাড়িতে ক'জন থাকে বল তো?"
"আরে ওরা তো আর বেশি কেউ নেই। উপেন, উপেনের বৌ, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে এবং ছেলের বৌ।"
"ও আচ্ছা, ঠিক আছে এখন ঘর যাই। সেই কখন বেরিয়েছি। বৌদি ভাবছে বোধ হয়।" এই বলে লখাই বাড়ির দিকে ফিরতে শুরু করে।
"ঠিক আছে। আবার আসবি। আমার ঘর তো দেখা হয়ে গেল। আর কী।"
"আসবো মানে। রোজ আসবো। এ সুযোগ কেউ ছাড়ে" - লখাই মনে মনে বলে।
পরের দিন মেয়েটির আগে পিছে, পিছে আগে, হাঁটতে হাঁটতে লখাই শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে থাকে, "সেদিন বললি না তো তুই কোথায় থাকিস। ভাবলি, আমি বোধ হয় জানতে পারবো না। তুই উপেনের বিটি তো। আমার চোখে ধুলা দিবি। শোন, আমার সাথে কথা না বললে তোর দাদাকে আমি সব উল্টোপাল্টা বলে তোকে মার খাওয়াবো বলে দিলাম।"
ভয়ে জড়সড় হয়ে গেলো মেয়েটি। এবার সে বাধ্য হয়েই বললো, "কী বলবো বলো!"
মেয়েটির কণ্ঠ যে এতো মায়াময় সে ভাবতে পারেনি। মেয়েটির প্রতি আকর্ষণ তার আরও ঢের গুণ বেড়ে গেলো।
বললো, "তোর নাম কী বল।"
- "কী করবে আমার নাম জেনে?"
- "দরকার আছে। বল না।"
- 'আদরিনী'।
"বাঃ। বড্ড সুন্দর নাম তো। আমি তোকে আদর করবো।"
"ধ্যাৎ, কী যে বলো! তুমি যাও। লোকে দেখে ফেলবে।"
"দেখলে কী হবে। ওরা থোড়াই কিছু বুঝবে। মনে যদি কিছু ভাবে তাতে আমাদের কী!"
আর বেশি কিছু না বলে চলার গতিটা একটু বাড়িয়ে আদরিনী পুকুর ঘাটে চলে গেলো। একটা শিহরণ অনুভব করলো সে সর্বাঙ্গে। লখাইয়ের কথা বলার ভঙ্গিটা তার মনে গেঁথে গেলো। অন্য ছেলেদের মতো অত বেআব্রু নয় সে। কণ্ঠস্বরও কর্কশ নয়। দেখতেও তো মন্দ নয়। নানান ভাবনা তাকে ঘিরে ধরলো আষ্টেপৃষ্ঠে।
লখাই আর বিরক্ত না করে পিছন ফিরে চলে গেলো।
