গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

আশার আলো (অণুগল্প)



দীপশিখা চৌধুরী


অবশেষে মধ্যবিত্ত জীবনের নানা টানাপোড়েনের মধ্যে থেকেও অপর্ণার স্বপ্নপূরণ হল। একফালি বাগানয়ালা ছোট্ট বাড়িটায় অপর্ণা সাজিয়ে তুলছে তার ছিমছাম সংসার।বড় সাধের সবুজে ঘেরা বাড়িটায় তার নিজের হাতে লাগানো জামরুল গাছটায় আজ মৌমাছির গুঞ্জনে যেন যৌবনের পূর্ণতা অনুভব করছে। সাজানো সংসারে ত্রিলোকেশ সযত্নে আগলে রাখে তাকে। নিরাপত্তার ঘেরাটোপে স্বামীর প্রতি নির্ভরতা অপর্ণাকে দিন দিনই সংসারের প্রতি নির্লিপ্ত ও নিশ্চিন্ত এক ঔদাসীন্য তাকে আনমনা করে তোলে। অপর্ণা ক্রমশ নিমগ্ন হতে থাকে সুর সাগরে সঙ্গীতের সাধনায়। শুধু একটিমাত্র ভাবনা তাকে মাঝে মাঝে উৎকণ্ঠিত করে... ছেলেটা মানুষ হয়ে উঠবে তো! ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার আইএএস নয় সে চায় ছেলে তার প্রকৃত সৎ বিবেকবান মানুষ হয়ে উঠুক। চারপাশের মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, ঘরে ঘরে বৃদ্ধ বাবা মায়ের নিগ্রহ লাঞ্ছনা প্রতিদিনই সংবাদের শিরোনামে, ক্রমশ বেড়ে উঠছে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা...মন খারাপের বিকেলে এগুলো আজকাল তাকে বড্ড ভাবায়।গাছে জল দিতে দিতে অপর্ণা আনমনা তাকিয়ে থাকে জামরুল গাছটার দিকে, দ্যাখে ফলে ভরা জামরুল গাছটা থেকে অপরিণত ফলগুলো ঝরে পড়ছে টুপটাপ। কলিংবেল বেজে উঠতেই সম্বিত ফিরলে টের পায় আইটি কর্মরত ছেলে বেদান্ত ফিরলো অফিস থেকে। মায়ের বিষন্ন মুখে জামরুল গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকা দেখে বেদান্ত বলে ওঠে... "কি হল মা কি ভাবছো তুমি?" সে তার মা-কে প্রতি শিরা উপশিরায় যেন বুঝতে পারে। অপর্ণা আপনমনে বলতে থাকে গাছটার পাতাগুলো কেমন বিবর্ণ হয়ে গেছে। বেদান্ত তড়িৎ গতিতে ছাতে উঠে যায়... চীৎকার করে বলতে থাকে... "দ্যাখো দ্যাখো মা, ফলবন্ত গাছটা কেমন নুইয়ে পড়েছে... পাতাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে সব... গাছের গোড়ায় এমন করে পাথর ফেললো কারা?" বাড়ির ছাদ ঢালাইয়ের জন্য রাখা ইট বালি সিমেন্ট পাথর এসেছিল।ওরা পাথরগুলো ফেলে দিয়ে গেছে গাছের ঠিক নীচে। পাথরে পাথরে গাছের গোড়াটা নিরুদ্ধ নিঃশ্বাসে চাপা পড়ে আছে। মাটি থেকে ঠিকমত জল অক্সিজেন খাবার সংগ্রহ করতে না পেরে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে। বেদান্ত বলে... "যে গাছ আমাদের ফল দেয় অক্সিজেন দেয় ঠান্ডা হাওয়া দেয় সেই গাছটার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। মা ওকে যে বাঁচাতেই হবে"... বলতে বলতে কোদাল হাতে নিয়ে ছুটে যায় গাছটার কাছে। গাছের গোড়া থেকে পাথরগুলোকে আপ্রাণ চেষ্টায় সরাতে থাকে। তারপর জল ঢালতে থাকে গাছের গোড়ায় মাথায় গাছটার সারা গায়ে... তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে নেমে আসে অন্ধকার। সেই অন্ধকারের উৎস থেকে সন্ধ্যার আকাশে জোৎস্না ছড়িয়ে হেঁসে ওঠে পূর্ণিমা চাঁদ।ক্লান্ত ঘর্মাক্ত অবসন্ন ছেলের মুখ যেন আশার আলোয় ভরিয়ে তোলে অপর্ণার ভালবাসার ভুবন। ছেলের মাথায় হাতটি রেখে পরম প্রসন্নতা নিয়ে অপর্ণা বলে, "বাবা শুধু ওই গাছটা নয় রে, তুই বাঁচালি আমাকেও। তুই যে আমার মহীরুহ যার মানবতার ছত্রছায়ায় শান্তির আশ্রয়ে পূর্ণ হয়ে উঠবে অনাগত আগামী।...