গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

ইংরেজি চুমু (অণুগল্প)



শর্মিষ্ঠা


আমাদের পাড়ায় হরিপদ কাকু হঠাৎ একদিন ঘোষণা করলেন, 'আমি এবার ইংরেজি শিখব।' আমরা সকলেই অবাক। কাকুর বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। তিনি বাজারে মাছ বিক্রি করেন। তা মাছের নাম ও দাম বাংলাতেই আমরা বেশ বুঝি। বললাম অযথা ইংরেজি শিখে কী করবেন! কাকু গম্ভীর মুখে বললেন, 'আজকাল বিদেশি কাস্টমার দোকানে আসে। ওদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলব। ইমপ্রেশন বাড়বে!' এই 'ইম্প্রেশন' কথাটা কাকু কোত্থেকে শিখল জিজ্ঞেস করার আগেই ভজ আনন্দে গদগদ হয়ে কাকুকে বগলদাবা করে ক্লাবের বারান্দায় এগিয়ে গেল। ইংরেজিতে মাস্টার্স শেষ করে ভজ স্কুলে চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছে। সূর্য প্রায় ডোবা ডোবা। যাক, এতদিনে ভজ ইংরেজি কপচানোর জন্য কাউকে পেয়েছে ভেবে একটু আনন্দ পেলাম। আর যাইহোক, ক্লাবে সন্ধ্যের চা খেতে খেতে শেক্সপিয়ার ঝাড়তে ঝাড়তে তুঙ্গে উঠে আর চা চলকে কারোর গায়ে ঢালবে না। বাপ্ রে! ওথেলোর শেষ চুমুটা সেদিন আমার ঠোঁটে পড়ছিল আর কি! শেষে সমকামিতার অভিযোগে আমার ক্লাবে আসাটাই বন্ধ করতে হত।

পরের দিন থেকেই কাকু শুরু করলেন ইংরেজি চর্চা। কিন্তু সমস্যা হল। তিনি যা শেখেন, সবই উল্টো ব্যবহার করেন। একদিন এক গ্রাহক মাছ কিনতে এসে বললেন, 'কাকু, এই মাছটা টাটকা তো?' ভজ কাকুকে বলেছে উত্তরে একটুআধটু ইংরেজি বলা প্র্যাকটিস করতে। কাকু গর্ব করে বললেন, 'ইয়েস ইয়েস! দিস ফিস ইজ ভেরি ইয়েস্টারডে'। গ্রাহক অবাক। এমন অদ্ভুতুড়ে ইংরেজি সে কোনওদিন শোনেনি। তার অভিব্যক্তি দেখে কাকু হাসলেন। বললেন, 'মানে খুব গতকালের! তুমি কি ভাবলে আমি না জেনেই ইংরেজি বলছি!' সে আর কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেল। আরেকদিন এক ভদ্রমহিলা দাম জিজ্ঞেস করলেন। কাকু বললেন, 'প্রাইস ইজ ভেরি চিপেবেল। ইউ গিভ মানি। আই গিভ ফিস। বোথ আর হ্যাপিএবেল।' ভদ্রমহিলা কিছুই বুঝলেন কি না সেসবের তোয়াক্কা না করেই হাততালিতে সরব হয়ে উঠলো মাছবাজার।

মাছ দু'চার কেজি বিক্রি কমলেও কাকুর ইংরেজি শেখার উৎসাহ দিন দিন বাড়তে লাগল। একদিন সত্যিই একজন বিদেশি পর্যটক বাজারে এলেন। সবাই ভাবল আজ বুঝি কাকুর সর্বনাশ! বিদেশি বললেন, 'হাউ মাচ?' কাকু হাসলেন, 'মানি মাচ, ফিস টাচ'। বিদেশি ভদ্রলোক হেসে ফেললেন। তিনি কি বুঝলেন তিনিই জানেন কিন্তু কাকুর আত্মবিশ্বাস দেখে খুশি হয়ে দ্বিগুণ দাম দিয়ে মাছ কিনে নিলেন। বিকেলে কাকু ক্লাবে এসে ঘটনাটা বলতে বলতে বললেন, 'দেখলে তো! ইংরেজি মানে শুধু কথা না! সাহসও লাগে! ভজ আমার মনে এই উদ্যম আর সাহস জাগিয়ে তুলেছে। যা মনে করবে সেটা করে ফেলতে হয়।'

ওপাশ থেকে ভজ হালকা গলায় বলে উঠলো 'আজ ডিমের ডেভিল আমাদের সকলের জন্যে চারটে করে বলিস। ভাবছিলাম এবার ভাইফোঁটায় দ্য লাস্ট কিস নাটক করলে হয়! ডেসডিমোনা সাগ্নিককে ভালো মানাবে। ফর্সা। টানা ভুরু। ওর ঠোঁট দুটো বেশ পুরু। মেয়ে সাজলে ওকে বেশ মানাবে...' ভজ হয়তো আরও কিছু বলছিল কিন্তু আমার হার্ট-রেট তখন একশ ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বমুখী। পেটের যন্ত্রণায় প্রায় জ্ঞান হারাই। আগামী এক সপ্তাহ ডাক্তারকাকু বিছানা ছেড়ে উঠতে না করেছেন। বলেছেন কিছু থেকে আমি নাকি ভীষণ ভয় পেয়েছি। মানসিক সমস্যা হচ্ছে। কিছুদিন বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ এবং পরিচিত বন্ধুদের সাথে দেখা করতেও না করেছেন। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম একটা চুমুর কারণে কতগুলো ডিমের ডেভিল হাতছাড়া হয়ে গেল!