বাতাসে পোড়া গন্ধ ভাসছে। চতুর্দিকে ছাইয়ের স্তূপ। তারই এক কোণে বসে আছে বছর তিনেকের একটি শিশু। তার আয়ত চোখ দুটি থেকে মুক্তোর মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। উথলে ওঠা কান্নাটা তার চোখে শ্রাবণ হয়ে নামছে। জল গড়ানোর মতো একটা সান্দ্র তার নাক দিয়ে সর্পিল বক্ররেখা হয়ে নামছে। নিত্যযাত্রী ও পথচারীগণ শিশুটির দিকে তাকিয়ে খুব একটা সহানুভূতি বা সহমর্মিতা অনুভব করছেন বলে মনে হয় না। তাঁরা আপন গতিতে তাদের কর্মস্থলের দিকে এগিয়ে চলেছেন। রাস্তার ধারে এসব আকচার দেখা যায়। ওঁরা এগুলোকে খুব একটা আমল দেন না। রাস্তার জ্যাম, বাসে বাদুড় ঝোলার মতো যাওয়া জীবন এতটাই যান্ত্রিক যে, অনেক সময় চোখেও পড়লেও কিছু করার থাকে না।
গতকাল গভীর রাতে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। রাত দুটো আড়াইটে পর্যন্ত এখানে কিছু মানুষ কাজ করে। তাদের বাড়ি কোথায় ঠিক জানা নেই। কেউ কেউ বলেন - হয়তো মালদা বা মুর্শিদাবাদের কোন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসে থাকবে। এটা পেটের দায়, বুঝলেন না? পেটের দায়।
কোন প্রত্যন্ত গ্রামে তার পরিবার হয়তো অভূক্ত অবস্থায় পড়ে আছে তাদের মুখে অন্ন তুলে দেবার জন্যই এরা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে কাজের খোঁজে চলে আসে।
দীর্ঘদিনের পুরনো একটি মোমবাতির কারখানায় আগুন। কারখানা স্থাপন করার জন্য যে সমস্ত প্রোটোকলস মানার প্রয়োজন হয় তার কোনোটাই তখন করা হয়নি। বর্তমান মালিক কেবল কারখানা থেকে প্রাপ্য লভ্যাংশের দিকেই নজর দেন। কারখানার পরিকাঠামো উন্নত করার কোনো তাগিদ তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না। ইতিপূর্বে বেশ কয়েকবার নোটিশ ধরানো হয়েছে। কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত না করে তিনি স্থানীয় প্রশাসন এবং কাউন্সিলরদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে তার কাজ হাসিল করেছেন।
কারখানায় যে সমস্ত শ্রমিক কাজ করে তাদের উপযুক্ত পারিশ্রমিকও তিনি দেন না বরং তাদের শ্রমের সবটাই তিনি আত্মসাৎ করেন। শ্রমিকরা তাদের পারিশ্রমিক বাড়ানোর কথা বললেই তিনি তাদেরকে কর্মচ্যুত করার হুমকি দেন। শ্রমিকরা কাজ হারানোর ভয়ে আঁতকে ওঠে, মালিকের চোখ রাঙানি নীরবে সহ্য করে। কখনো একজোট হতে চাইলেও পারে না। তারা মনে করে এই মাগ্যিগণ্ডার বাজারে যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে সেটাই বা কম কীসের? তারা মালিকের কাছে দরবার করেছে, পারস্পরিক আলোচনা করে দেখেছে - কিন্তু মালিক তাদের কথায় কখনো গুরুত্ব দেয়নি। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন শ্রমিক কাজ ছেড়ে দিয়ে বাংলার বাইরে কোথাও চলেও গেছে। যারা একেবারেই নাচার তারাই এই কারখানায় কাজ করে। গতবছর কারখানায় একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছিল, পুলিশ এসে তার তদন্ত করে, কিন্তু আজও তার রিপোর্ট জমা পড়েনি। স্থানীয় কিছু যুবক মাঝে মাঝে এসে মালিকের সঙ্গে আপোষ মীমাংসার চেষ্টা করে। অবশেষে এক টেবিলে বসে আকণ্ঠ মদ্যপান করে কিছু দক্ষিণা নিয়ে কেটে পড়ে। বছরে বেশ কয়েকবার তারা মালিকের ঘরে এসে দর্শনী নিয়ে যায়। ওদের স্বার্থ মিটে গেলেই আর এ তল্লাটে দেখা যায় না। মাঝে মাঝে অবশ্য উৎসব অনুষ্ঠানে চাঁদা নিয়ে বচসা বাঁধে। কিন্তু সেটা সাময়িক আবার মালিক যখনই তাদের ডাকে তারা গৃহপালিত কুকুরের মত মালিকের আশেপাশে ঘুরঘুর করে এবং এক টুকরো মাংস নিয়ে আবার গোঠে ফিরে যায়। এভাবেই চলে আসছে বেশ কয়েক বছর। স্থানীয় প্রশাসন কিংবা কোন প্রভাবশালী নেতাও এই মালিকের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনা ফলে যা হওয়ার তাই হয়।
কিন্তু জীবন তো সব সময় স্বাভাবিক ছন্দে চলে না। কখনও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। প্রকৃতির ঝড়-ঝঞ্ঝা তুফানের মত মানুষের মানস ভূমিতেও ঝড় ওঠে, প্রবল ঢেউয়ে দোলা দেয়, কখনও কখনও তুমুল আলোড়ন হয়। মালিকপক্ষ একটু নড়েচড়ে বসে - কাজের কাজ কিছু হয় না। সেই চিরাচরিত কুঠুরি, কম পারিশ্রমিক এবং ভিজে স্যাঁতস্যেঁতে অন্ধকার জীবন থেকে শ্রমিকদের মুক্তি ঘটে না।
সমস্যা দেখা দিল এবছরের পুজোর বোনাস নিয়ে। কারখানার শ্রমিকদেরকে নিয়ে একজোট হয়ে বোনাসের দাবি তুলেছিল সৌমিক। সৌমিক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস কমিউনিকেশনে পোস্ট গ্রাজুয়েট সম্পন্ন করে প্রথমে মাস ছয়েক সাংবাদিকতা করেছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো ছিল না। বুঝতে পেরেছিল এ দেশে নির্ভীক সাংবাদিকের কোন দাম নেই। কোনো একটি পক্ষ অবলম্বন করতে পারলেই টিকে থাকা যায়। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সৌমিকের মনে-মননে, চিন্তা-চেতনায় সব সময় বিরাজ করেছে ন্যায় নীতিবোধ। সে অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করতে শেখেনি তাই ছ'মাসের মধ্যেই তাকে অন্তত ছ'বার পত্রিকার দপ্তর থেকে নোটিশ পেতে হয়েছে। সম্পাদক তাকে সতর্ক করেছেন--এইভাবে সংবাদ পরিবেশন করলে আমাদেরকে পথে বসতে হবে। আমাদের গাইডলাইন মেনে যদি সাংবাদিকতা করতে পারো তাহলে করবে নাহলে তুমি আসতে পারো।
সম্পাদক মশাইয়ের কাছ থেকে এমন পুরস্কার পাওয়ার পর সৌমিক স্বেচ্ছায় কাজ ছেড়ে দিয়েছে। সাংবাদিকতার সূত্রেই সে বিধান নগরের এই মোমবাতির কারখানার সন্ধান পেয়েছিল। স্থানীয় কিছু মানুষ এবং শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে সে মূল সমস্যার গভীরতা কোথায় এবং কতটা তা বুঝতে পেরেছিল। তারপর একদিন মালিকের সঙ্গে সে নিজে দেখা করে এখানে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
অর্থ উপার্জন করা ওর উদ্দেশ্য ছিল না - শ্রমিকদের সমস্ত দাবি-দাওয়া নিয়ে ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর আন্দোলনের পথে এগোবে - এটাই ওর লক্ষ্য ছিল। তার অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট হয়েছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃতী ছাত্র যখন শ্রমিকদের হয়ে কথা বলতে আসে তখন মনে হয় তার নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে। কারখানার মালিক খুব সহজেই বিষয়টি অনুমান করতে পেরেছিল। প্রথমে সৌমিকের ব্যবহার আচার-আচরণ কথাবার্তা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে মালিক তাকে খুব একটা সন্দেহ করেননি। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তিনি বুঝতে পারেন যে সৌমিকের উদ্দেশ্য মালিকপক্ষের উপযোগী নয়, তাই তার প্রস্তাবগুলিকে খুব একটা আমল দিতে চাইলেন না।
মোমবাতির কারখানাটি খুব বড় না হলেও একেবারে ছোট নয় - এখানে কম বেশি ২০০ শ্রমিক কাজ করে। দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা কাজ চলে। দুইশত শ্রমিকের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে সৌমিক শ্রমিক এবং মালিকের মধ্যে একটি সেতু রচনা করতে সে যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তাতে মালিকপক্ষ বুঝতে পেরেছিল যে সৌমিকের কার্যকলাপের মধ্যে একটি কটু গন্ধ লুকিয়ে আছে। সৌমিক বার বার বোঝানোর চেষ্টা করেছে কারখানা সঠিকভাবে চালু রাখতে গেলে শ্রমিকদের স্বার্থ দেখা অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু মালিক সে কথায় কর্ণপাত করেনি বরং সৌমিককে যাতে মালিকদের পক্ষে আনা যায় এবং শ্রমিকদের বিপক্ষে চালনা করা যায় তার চেষ্টা করে গেছে। মালিকের স্বার্থে আঘাত লাগলে তিনি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারেন তা তিনি সৌমিককে বুঝিয়ে দিয়েছেন। মালিকের বড় ছেলে লিটন অত্যন্ত ভয়ংকর। বাগুইহাটিতে ওদের নিজস্ব বাড়ি। তার আশেপাশে এটি বৃহৎ গুণ্ডাবাহিনী ও তৈরি করেছে। যারা নানারকমের অসামাজিক কার্যকলাপে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়ে ওর বিশ্বাস অর্জন করেছে। লিটন প্রয়োজনে ওদেরকে কাজে লাগায়। এ ছাড়া শাসকদলের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে লিটনের ওঠাবসা আছে। সময় অসময়ে সেটাকেই সে হাতিয়ার করে। লিটনের বাবা অঞ্জন বাবু সৌমিকের ব্যাপারটা নিয়ে লিটনকে বলেছিলেন - তাকে দমিয়ে রাখা, ভয় দেখিয়ে লক্ষ্যচুত করা, তাতেও কাজ না হলে একেবারে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া - সবটাই তিনি তার ছেলেকে জানান। সেই অনুযায়ী লিটনও সুযোগ খুঁজতে থাকে একদিন মাঝরাতে যখন সৌমিক কাজকর্ম সেরে শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে মিটিং করছিল ঠিক সেই সময় লিটন তার দলবল কারখানায় ঢুকে সৌমিককে হুমকি দিয়ে যায়। জানিয়ে দেয় - এরপর যদি তুই না শোধরাস তাহলে তোর কপালে অশেষ দুঃখ আছে। খুন করে তোর বডিটাকে গায়েব করে দেওয়া হবে, মনে রাখিস।
শ্রমিকের দল ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পেরে সৌমিককে বলেছিল - সৌমিক ভাই, তুমি একটু সাবধানে থেকো। কখন কী ঘটে যায় বলা যায় না। মালিকপক্ষ তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে এই অভিজ্ঞতা তোমার নেই। তাই বলি কী নিজের জীবন বাঁচাও। আমাদের যা হোক হবে।
সৌমিক হাসতে হাসতে বলেছিল - এইসব চুনোপুঁটির হুমকিতে তোমরা ভয় পেয়ে যাচ্ছো দেশে আইন কানুন বলে তো একটা কথা আছে। তোমরা সবাই তো শুনলে, থানায় গিয়ে এই কথাটা ঠিক ঠিক করে বলতে পারবে না?
সবাই এক বাক্যে বলে উঠেছিল - অবশ্যই পারব, কিন্তু...
- কোনো কিন্তু নয়, তোমাদেরকে পারতেই হবে। মে দিবসের ইতিহাস তো তোমরা সকলেই জানো, না কি? শিকাগোর হে মার্কেটের ঘটনা, জানো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস, ফরাসি বিপ্লব, রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা তোমাদের শুনিয়েছি। শ্রমিক শ্রেণী সর্বত্রই শোষণের শিকার হয়েছে। যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তখন মাটি কামড়ে থেকে লড়াই করেছে সুতরাং কোনোভাবেই আমাদেরকে পিছিয়ে আসা চলবে না। আমাদের অধিকার আমাদেরকেই ছিনিয়ে আনতে হবে, তাতে দু'একটি প্রাণ চলে গেলে কিছু যায় আসে না। আমি যদি খুন হয়ে যাই তাহলে মানুষের মধ্যে তার একটা প্রভাব পড়বেই। এ কথা মনে রেখো।
শ্রমিকদের মধ্য থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়ে বললো - সৌমিক ভাই আমি মনে প্রাণে তোমাকে সমর্থন করি এবং তোমার পাশে আছি। আমারও তিন কুলে কেউ নেই। সেই কবে আমার বাবা মারা গেছেন। গ্রামের বাড়িতে মা ছিলেন গতবছর তিনিও চলে গেলেন।
সৌমিক তার কাঁধে হাত রেখে বলে - মকবুল ভাই, চিন্তা করোনা। যদি মরতে হয় আমি মরবো। আমার বাবা বলেছেন - ''সৌমিক অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপোষ করবে না তাতে যদি তোমার মৃত্যু হয় কখনো লড়াই থেকে পিছিয়ে আসবে না।'' আমার বাবা ডানলপ কারখানার শ্রমিক ছিলেন। আজীবন তিনি লড়াই করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত কারখানার দরজা তাঁদের জন্য খোলেনি ঠিকই কিন্তু সেই লড়াইয়ের কথা মানুষ এখনো ভোলেনি। আমি সেই শ্রমিক নেতার সন্তান। আমি এমন দৃষ্টান্ত রেখে যাব যে, সমাজের সমস্ত কটু গন্ধ দূর করে সমাজটাকে নির্মল এবং পবিত্র করে তুলবো। তুমি দেখে নিও।
সেই রাতে সৌমিক যখন কারখানা থেকে বেরিয়ে আসে তারপর পরপরই কারখানায় আগুন লাগে, প্রায় দেড় শতাধিক শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। ঠিক কী কারণে আগুন লেগেছে পুলিশ সরেজমিনে তার তদন্ত করে কিন্তু পুরোপুরি এই তদন্তের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। কেননা মোমবাতির কারখানাটাই ছিল অবৈধ এবং মালিক ও তার পুত্র লিটন কারখানায় আগুন লাগার পর থেকেই বেপাত্তা হয়ে গেছে। এদিকে গত রাত থেকে সৌমিককেও পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ করে কীভাবে যেন সবকিছু শূন্যে মিলিয়ে হয়ে গেছে। মকবুল সৌমিকের সাথে সাথে ছিল তাকেও আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
বাতাসে পোড়া গন্ধ তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। শিশুটির মা-বাবা দুজনেই এই কারখানায় কাজ করতো। গভীর রাত পর্যন্ত ওর বাবা বাড়ি ফেরেনি দেখে মা কারখানার সামনে এসেছিল এবং এই ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড দেখে কিছুক্ষণের জন্য হতবাক হয়ে গিয়েছিল। বাচ্চাটিকে রাস্তার পাশে রেখে ওর মা ছুটে চলে গিয়েছিল অগ্নিদগ্ধ কারখানার ভেতরে কিন্তু মোমের আগুন দাউ দাউ করে যেভাবে জ্বলছিল তাতে কোনোভাবেই কারোর বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না। ভেতরে প্রবেশ করে চতুর্দিকে ভয়ংকর আগুনের শিখা দেখে সে হতভম্ভ হয়ে গিয়েছিল এবং সেই মুহূর্তেই ভয়ংকর অগ্নি তাকেও গ্রাস করে নেয়।
ভোরের আলো ফোটার আগেই খবরটি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তখন বাতাসে মানুষের পোড়া গন্ধ এবং শিশুটির কান্না ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না।
যেটা বাকি ছিল তা হলো - কিছু কিছু পেটি খবরের কাগজের রিপোর্টার, টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যান, স্থানীয় কাউন্সিলর, পুলিশ প্রশাসন এবং শাসক দলের প্রধান। যারা সস্তায় জনপ্রিয়তা কুড়ানোর জন্য এখানে এসে ভিড় করে এবং কিছু স্তোক বাক্য শুনিয়ে চলে যায়। ক্যামেরা ঝলসে ওঠে, কলমের আঁচড়ে কারখানার দুরবস্থার কাহিনী লেখা হয়, লেখা হয় না সেই হতভাগ্য শ্রমিকের পরিবার এবং তাদের পরিজনদের কথা। তারা আড়ালেই থেকে যায়। মানুষগুলো এদের কাছে শুধু এক একটি সংখ্যা ছাড়া আর কিছু নয়। এদের জীবনের কোন মূল্য আছে বলেও মনে হয় না - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রক্তকরবী' নাটকের শ্রমিকদের মতো এরা এদের পরিচয় হারিয়েছে সংখ্যাতত্ত্বের আড়ালে। যে বিষাক্ত পরিবেশ এবং কটু গন্ধ গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে তা খুব সহজে অপনোদিত হবে এটা বলা যায় না। আজ মানুষের রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, নাসারন্ধ্র বন্ধ হয়ে গেছে, পচা গন্ধ তাদের কাছে সুগন্ধে পরিণত হয়েছে এবং পূতিগন্ধময় জীবন নিয়েই অধিকাংশ মানুষ বেঁচে থাকার মানসিকতা তৈরি করে ফেলেছে।
শিশুটির কান্না আমাদের চেতনায় আঘাত করে, কিন্তু সমৃদ্ধ করে না। চেতনাকে স্বপ্নের জগৎ থেকে ফিরিয়ে বাস্তব জগতে প্রয়োগ করার তাগিদ অনুভব করে না। বরং ফুটপাতে অসহায় কান্না রূপেই সে শ্রাবণের বারিবর্ষণ করতে থাকে। কোন অজান্তে শ্রাবণ শেষ হয়ে যায়। ভাদ্রের প্রখর সূর্যের কিরণে পুড়ে খাক হয়ে যায় প্রকৃতি। সবকিছু ওলট-পালট হয়ে আমাদের জন্য অবশিষ্ট থাকে এক দল দগ্ধ মানুষের পোড়া মাংসের কটু গন্ধ।
