গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

আমি আছি তো



অনিন্দিতা মুখার্জী সাহা


রেডি হয়ে খাওয়ার টেবিলে যখন কুন্তল আসলো ঘড়িতে দশটা বাজে প্রায়। পিঙ্কি তাড়াতাড়ি করে স্যান্ডুইচ আর অরেঞ্জ জুসটা এনে রাখলো টেবিলে।

কুন্তল একটু এদিক ওদিক দেখে জিজ্ঞেস করলো "রণিতা এখনও ওঠেনি ঘুম থেকে?"

পিঙ্কি আমতা আমতা করে বললো, "বৌদি কাল রাত থেকে বিছানা ছাড়ে নি। কিচ্ছুটি মুখেও তোলেনি। কয়েকদিন হলো কিচ্ছু খাওয়াদাওয়া করছে না বৌদি। দাদা তুমি একবার দেখো না !"

পিঙ্কির চোখেমুখে চিন্তার ছাপ।

এ বাড়ির যাবতীয় দেখাশোনা এই পিঙ্কি করে, এছাড়াও রয়েছে বাসন মাজা, ঘর মোছার লোক। এতো লোক থাকলেও রান্না করা, কুন্তলকে খেতে দেওয়া এটা রণিতা নিজের হাতেই রেখেছিলো। বেশ কিছুদিন হলো পুরো বাড়িটা কেমন যেন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। সবসময় কেমন ছাড়ো ছাড়ো ভাব রণিতার। কুন্তল ওপরে থাকলে রণিতা নিচে থাকে। দেখা প্রায় হয় না। কুন্তলেরও ইচ্ছে করে না সারাদিন খাটাখাটনি করে এসে রণিতার ওই উদাস মুখ দেখতে, খুব জেদি হয়ে গেছে রণিতা আজকাল।

কাঁটা চামচ দিয়ে ডিমের পোচটা কেটে মুখে ঢোকাতেই গা-টা গুলিয়ে উঠলো কুন্তলের।ডিমের কাঁচা গন্ধ আসছে, ঠিক করে করতে পারেনি পিঙ্কি। টেবিলের ওপরে রাখা গোলমরিচ খানিকটা ছিটিয়ে কোনোরকমে খেয়ে নিলো। এভাবে হবে না। সারাদিনের ধকলের পর এরকম খাওয়াদাওয়া পেলে সত্যি মুশকিল। আর পিঙ্কি কে বলে কি হবে ! রান্না জানেই না হয়তো ঠিকঠাক মেয়েটা। কথা বলতে হবে রণিতার সাথে, ভেবেই পিঙ্কিকে বললো, "বৌদির খাবারটা দে, ডিমটা দিস না!"

বলেই গ্লাসে থাকা কমলা তরলটা এক চুমুকে শেষ করলো কুন্তল। ততক্ষনে একটা প্লেটে স্যান্ডুইচ আর এক বাটি স্যুপ এনে দিলো পিঙ্কি।কুন্তলও নিজের মুখটা রুমাল দিয়ে চেপে মুছে পিঙ্কির হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে চলে গেল রণিতার ঘরে।

"রিনি, ও রিনি!" -ডাকতে ডাকতে ভেজানো দরজা খুলে ফেললো কুন্তল। নিজের কানেই নামটা কেমন অচেনা ঠেকলো কুন্তলের। বিয়ের দশটা বছর পর এই নামটার প্রতি সত্যি আর কোনো টান অনুভব করছে না কুন্তল। আগে এই নাম ওর রাতের ঘুম কেড়েছিল। আজ সবটাই কেমন বিস্বাদ।

দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই কুন্তল দেখলো রণিতা শুয়ে আছে। এই গরমেও গায়ে চাদর। কুন্তলের মুখে রিনি নামটা শুনেই হোক বা বহুদিন পর কুন্তলকে দেখেই হোক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রণিতা। দুচোখ জুড়ে ক্লান্তি আর জলের ছাপ। সারাদিন শুয়েও যেন ঘুম নেই।

কুন্তল খাবারটা নিয়ে এসে বসলো রণিতার পাশে। তারপর রণিতাকে উঠিয়ে একটু একটু করে স্যুপ চামচ দিয়ে খাইয়ে দিতে থাকলো। না করলো না রণিতা। হয়তো খিদেটা বড্ড পেয়েছিলো। এই অনুভূতিটা এমনই যেটা রাগ দুঃখ সব তরল করে দেয়।

কুন্তল খাওয়াতে খাওয়াতেই বললো, "কি চেহারা করছো নিজের ? আজকাল চোখে কাজলটুকুও পরোনা !"কোনো উত্তর নেই রণিতার মুখে। কুন্তল আবার বললো, "আজ বিকেলে সেজেগুজে তৈরী হয়ে থাকবে, আমি ফিরে আসার পর একটু বেরোবো!"

উৎসাহ নিয়ে তাকালো রণিতা। ক্লান্ত চোখে আজও মনের ভাষাটা প্রকাশ পায়, এতটাই গভীরতা আছে চোখ দুটোর। কুন্তল বুঝলো বেরোনোর নাম শুনে ও কিছু জানতে চাইছে। কুন্তল বললো "আজ বিকেলে বিরিয়ানি খেতে যাবে? তারপর গঙ্গার পারে একটু খাওয়া খেয়ে ফিরবো। অনেকদিন একসাথে বেরোই নি।"

কুন্তল দেখলো রণিতার মুখটা আবার ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ও বোধহয় অন্যরকম কিছু চাইছে কিন্তু আমল দিল না কুন্তল। যে জিনিস ওর হাতের বাইরে সেটা দেওয়া সম্ভব না। কুন্তল হঠাৎ খেয়াল করলো রণিতা প্রায় পুরো স্যুপটাই খেয়ে নিয়েছে। স্যান্ডউইচটা এক কামড় খাইয়েই রণিতার হাতে প্লেটটা ধরিয়ে দিল কুন্তল। "হাতে আর সত্যি সময় নেই গো। বাকিটা লক্ষী মেয়ের মতো খেয়ে নাও, বিকেলে ঘুরতে যাবো !" বলেই মাথায় হাত বুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো কুন্তল।

হন্তদন্ত হয়েই বেরিয়ে গেলো। আজ ওর দুটো ওটি আছে। আজকাল আর খুব জটিল অপারেশন না হলে ওটি করে না কুন্তল। জুনিয়রদের দিয়েই করায়। আজ ওর সাথে কাজ করে দুজন জুনিয়র ডাক্তারই সেমিনারের জন্য ছুটি নিয়েছে।
আজ খুব চাপ যাবে কুন্তলের।

* * * *

এক্টোপিক প্রেগনেন্সি - এটাই সমস্যা রণিতার। বিয়ের পর থেকে এই দশ বছরে প্রেগনেন্ট হয়েছে রণিতা, কিন্তু প্রতিবার এক সমস্যা, কোনোবারই বাঁচাতে পারেনি কুন্তল। প্রচুর চেষ্টা করেছে। নিজে করেছে, বন্ধুদের দিয়ে করিয়েছে। অন্যান্য নামি ডাক্তার যে যেখানে বলেছে কিছু বাদ দেয় নি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।

প্রতিবার ভ্রূনটা বেড়ে উঠছে ফ্যালোপিয়ান টিউবে আর জীবন নিয়ে টানাটানি হচ্ছে রণিতার। একজন ডাক্তারের কথায় একটা মেজর অপারেশনও করানো হলো, প্রেগনেন্সি এলো কিন্তু সেটাও বাঁচে নি। মেডিকেল বোর্ড বসিয়েছিল কুন্তল। কিন্তু কোনোরকম আশার আলো দেখায়নি কেউ। যখন সব আশা শেষ, নিজের মনকে মানিয়ে নিয়েছে কুন্তল তখনই শুরু হলো রণিতার পাগলামি। দত্তক নিতে হবে, এমন জেদ যে কথাটাও আজকাল ঠিকঠাক বলে না কুন্তলের সাথে।

বাচ্চা না হওয়াটা কোনো অপরাধ তো নয়। হতেই পারে। একজীবনে সব পাওয়া যায় না। এখন এই মাঝ বয়সে এসে নতুন একজনের দায়িত্ব নেওয়ার ধকল সইবে না শরীর। তাও রণিতার জেদে হার মেনে একটা হোমে কথাবার্তা বলেছিল কুন্তল, গেলেই হয়ে যাবে সেটা জানে কিন্তু এক রকমভাবে মনটাকে বুঝিয়ে নিয়েছে, আবার নতুন করে সব কিছু গোছাতে হবে ভেবেই পিছিয়ে এসেছে কুন্তল। সেই প্যানপ্যাঁনে কান্না, নোংরা ঘর, হাগিস, দুধ আর ভালো লাগবে না। তার থেকে এই ভালো।

এসব ভাবনার মধ্যেই নার্সিংহোমে পৌঁছে গেলো কুন্তল। কলকাতার বিখ্যাত গাইনোকোলজিস্ট কুন্তল বর্মন।

"টাইম ইস 3:30, ইটস এ বেবি গার্ল, ওয়েট ইস 2.7 কেজি" ওটিটা শেষ হতেই বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বলে চলেছে কুন্তল, আর পাশে দাঁড়িয়ে নার্স সেটা নোট করে নিচ্ছে খাতায়। বাচ্চাটাকে এইমাত্র বের করে আনলো কুন্তল। মায়ের এখনো জ্ঞান আসেনি। বাচ্চাটার নরম লাল রঙের গা, হালকা উত্তাপ, চিৎকার করা কান্না শুনে হাতটা একটু কেঁপে গেলো কুন্তলের।

ডাক্তারি জীবনে এরকম প্রচুর বাচ্চাকে পৃথিবীতে এনেছে ও, অনেকবার এই সৃষ্টির সুখ পেয়েছে কিন্তু নিজে সেই সুখ কিনতে পারেনি। একজন মা যেমন বাচ্চাকে সৃষ্টি করে নিজের ভিতরে আবার যে বের করে আনে সেখান থেকে, সেটাও একটা সৃষ্টিই। বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে কুন্তল।

আজকাল এই জন্যই ও ওটি করেনা। ভীষণ কষ্ট হয়। ও হয়তো রণিতার মতো পারেনা চিৎকার করে কাঁদতে কিন্তু এই কষ্টটা ও কিন্তু বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে দিনের পর দিন।

"স্যার দিন, বাইরে দেখিয়ে আনি " - নার্স এসে হাত থেকে নিয়ে নিলো বাচ্চাটাকে, প্রায় বুকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলো নার্স। খুব কষ্ট হচ্ছে বুকের ঠিক মাঝখানটায়।

তাড়াতাড়ি বেরিয়ে নিজের চেম্বারে এসে ফোনে একটা কফি অর্ডার দিল। পরপর দুটো ওটি, সাথে দুবার একই যন্ত্রনা। নিজের হাতে বের করে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। কপালটা টিপে কিছুক্ষন বসে রইলো কুন্তল। বড্ড কষ্ট হচ্ছে আজ ওর। এতো টাকা, সম্পত্তি, বড় বাড়ি, কি হবে যদি এই সুখটাই না থাকে। আজকের এই বাচ্চাগুলোই বড় হবে এলোমেলো পায়ে হেটে বেড়াবে বাড়িময়, চারিদিকে ওর গন্ধ, তারপর কলকল করে কথা বলবে, তবেই না সেটা বাড়ি!

একটু ভেবেই ফোনটা বের করে কন্টাক্ট ডিটেলস থেকে বের করে আনলো "আমি আছি তো!" নাম্বারটা। ওর খুব পরিচিত একজনের এই সংস্থা, নামটা ভারী অদ্ভুত - "আমি আছি তো" নিচে আবার ছোট করে লেখা "আমার বাবা মা খুব ভালো" পাশে একটা বাচ্চার হাসিমুখ, এরকমই ছিল ওদের ব্যানারটা। ফোনে রিং হতেই ওপাশ থেকে ধরে বললো - "বলুন ডাক্তারবাবু।"

কুন্তল বললো, "আজ আসবো একবার?" ওপাশ থেকে বললো -"আসুন না, আপনার জন্য আমি সবসময় আছি!" কুন্তল একটু থেমে থেমে বললো "মেয়ে আছে তো?" ওপাশ থেকে বললো, "আছে আছে, আসুন।"

মেয়ে আছে শুনেই গদগদ হয়ে গেলো কুন্তল। বললো "আমি সাড়ে পাঁচটার মধ্যে আসছি! "দেখো আজই যেন হয়ে যায় আমি সব কাগজপত্র নিয়ে আসবো!"

বলেই দুদন্ড থামলো কুন্তল। মেয়েই তো চেয়েছিলো। সুন্দর সুন্দর জামা পরাবে, একমাথা চুল ভেবেই মনটা আনন্দে ভরে গেল।আবার নিজের মনেই থমকালো কুন্তল। ভুল হচ্ছে না তো! এই বয়সে এসে আবার নতুন একটা চাপ। এখন ওর আটত্রিশ আর রণিতা পয়ত্রিশ। তারপর অন্য গাছের ছাল লাগবে কি লাগবে না! ভাবতেই দেখলো রণিতা ফোন করেছে।

কুন্তল "হ্যালো " বলতেই রণিতা কান্নায় ভেঙে পড়েছে, ভাঙা ভাঙা গলায় বলছে, "আমাকে একটা বেবি এনে দাও না গো, আমি তোমার কাছ থেকে আর কখনো কিচ্ছু চাইবো না, কথা দিচ্ছি। একটা বেবি দাও শুধু , আমাকে মা বলে ডাকুক না এসে। আমি আর বায়না করবো না। দাও না গো!"

বলতে বলতে থেমে গেলো রণিতা। বুকের ভেতর থেকে কান্না এসে গলার স্বর আটকে দিয়েছে রণিতার।এতো কান্না কখনো দেখেনি কুন্তল। এতদিন ঝগড়া জেদ অনেক কিছু দেখছে, বুকটা হুহু করছে সকাল থেকে কুন্তলেরও। এক একটা মুহূর্ত তৈরী হয় কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। এটা সেরকমই একটা মুহূর্ত। ঠিক করে নিলো কুন্তল যা হবে দেখা যাবে। আজ ওকে আনতেই হবে।

কুন্তল বললো "আচ্ছা হবে, তুমি খেয়েছো?" হুমম টুকু কান্নার ফাঁকেই বললো রণিতা। কুন্তল বললো "আমি আসছি, তুমি রেডি হও।"

রণিতা বাচ্চাদের মতো বললো "কোথায় যাবো?" কুন্তল বললো "ওকে আনবে না!" কথাটা শুনেও কেঁদে যাচ্ছে রণিতা সময়ের সাথে সাথে কান্নার মানেটাও কত বদলে যায় ! এটা পাওয়ার আনন্দ, জিতে যাওয়ার আনন্দ। ওপর পাশে কুন্তলও কাঁদছে। সকাল থেকে জমা ক্ষতটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। কিছুটা ভয় কিছুটা আনন্দ মিশে আছে কান্নায়।

একটা বড় বাড়ি আজ সুন্দর করে সেজে উঠবে আলোয় ঝলমল করবে। বহুদিন আলো জ্বলে নি। হাসির শব্দ ওঠেনি। আজ সেসব হবে আর বাচ্চাটাও খুঁজে পাবে ওর বাবা মাকে। না থাক নাড়ির টান, নাই বা রইলো রক্তের মিল তাও দু'পক্ষই একে অপরকে বলতে পারবে "আমি আছি তো!"