প্রবন্ধ/নিবন্ধ

রবিঠাকুর, শিলং ও শেষের কবিতা (দ্বিতীয় পর্ব)



সুনন্দা দাস


বেশ কয়েকমাস হলো শিলংয়ে রয়েছি। প্রায়ই শুনি রবীন্দ্রনাথ লাইমুখরায়, 'সিডলি' স্টেটের রাজবাড়ীতে এসে ছিলেন কিছুদিন। সিডিলির রানী মঞ্জুলাদেবী দক্ষিণ ভারতের 'পিঠাপুরম' রাজ্যের মেয়ে। তিনি সম্পর্কে আমার শাশুড়িস্থানিয়া। তিনি বিবাহ সূত্রে পূর্ব ভারতীয়। আশ্চর্য এক মহিলা। তাঁর বাংলা সাহিত্য চর্চা দেখলে অবাক হতে হয়। নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে বহু বাঙালীর চেয়েও তাঁর বাংলায় দখল ছিল অনেক বেশি।রবীন্দ্র অনুরাগিনী ছিলেন তিনি। আবার বাংলায় কবিতাও লিখতেন। সেই সূত্রে আমার সঙ্গে পারিবারিক আত্মীয়তা ছাড়াও ঘনিষ্ঠতা ছিল খুব বেশি। একদিন দূরভাষ-এ আমাদের নিমন্ত্রণ জানালেন। আপল্যান্ড রোডে তাঁদের 'সিডলি হাউস'। কলকাতার রাসবিহারী এভেন্যু তে 'সিডলি হাউসে' গেছি, সে এক প্রাসাদ! ওখানে গিয়ে দেখি ছবির মতো বাড়িখানি, একতলা বাংলো আর ল্যান্ডস্কেপ করা সাজানো বাগান, যেন ক্যানভাসে আঁকা। প্রচুর জায়গা জমি, ফুলের পাড় বসানো লন, একধাপ নিচে নেমে টেনিস কোর্ট।

কবি এসে কোন ঘরে থেকেছেন, কোন খাটে শুয়েছেন, কোন টেবিলে লিখেছেন, সেসব তখনও সুন্দর করে সেইভাবেই সাজানো ছিল। বাড়ির সামনের ফলকে শ্বেতপাথরের ওপর লেখা আছে "অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তবে ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।"

এটি ছাড়াও তিনি এখানেই তাঁর 'যোগাযোগ' উপন্যাসটি, 'দেবদারু' কবিতাটি ও লেখেন। এই পাড়াটির নাম লাইমুখরা।

এরপর একদিন গেলাম 'রিলবং' বলে একটি জায়গায়। সেখানে বেশ উঁচু আর খাড়াই রাস্তা। কিন্তু শিলং শহরের মজা হলো এই যে সেখানে সব রাস্তাতেই গাড়ি চলে। দার্জিলিংয়ের মতন নয়।

রিলবং কথাটির অর্থ হলো জানু অবধি। সেইখানে "জিৎ ভূমি" বলে একটি বাড়িতে কবিগুরু এসে ছিলেন ১৯২৩ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। তখন এখানে এক চৌধুরী পরিবার থাকতেন বলে শুনলাম। এখানে কবি রচনা করেন "যক্ষপুরী"। এখানেই তিনি "এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে" গানটি লিখেছিলেন। এছাড়া শিলংয়ের চিঠিও এখানেই লেখা হয়। এই বাড়িটিতে অবশ্য তাঁর ব্যবহৃত কোনো জিনিস দেখতে পেলাম না। হয়তো কেউ তেমন যত্ন করে রাখেনি।

শিলংয়ে আমাদের বাড়িটি ছিল লাসামিয়ার (La Chaumiere) বলে একটি জায়গায়। কথাটি ফরাসী বলে শুনেছি। ইংরেজী অর্থ হলো The Hut বা কুঁড়েঘর। বাড়িটি পাহাড়ের ওপরে বেশ উঁচুতে, উপত্যকার মাঝে নয়। বাড়ীটি আমার এক খুড়শ্বশুরের। তিনি সিডলি স্টেটের জামাই। বাড়িটি যৌতুক হিসাবে পেয়েছিলেন। লাল গেটের পাশে মস্ত বড় ম্যাগনোলিয়া গাছ। ভিতরের রাস্তা ধরে এগোলে ডান হাতে হলদে লতাগোলাপের বেড়া। বাগানে ঢোকার মুখেই এক ফুলে ভরা ক্যামেলিয়া গাছ।

(ক্রমশ)