কবীর সুমন বলেছিলেন, লোকটা নিজেই একটা আস্ত গান। আর সেই মহিলা, বাজারে তাঁরই পাশে বসে ঝিঙে, পটল বাছতে বাছতে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে বলেছিলেন, আপনি কী বাংলা? তিনি সামান্য হেসে বলেছিলেন, ঠিকই ধরেছেন। আমি 'বাংলা'।
আর একটা অভিমত আছে, প্রতুল মুখোপাধ্যায় মানেই সেই মুক্তির দশক।
"চেয়ে দেখ আজ
ভারতের গ্রামে গ্রামে মুক্তির সংগ্রামে
লাখো লাখো কিষাণ আসছে
ঝড় আসছে ঝড় আসছে
কিষাণ বিদ্রোহের ঝড় আসছে
শত বাধা দূরে ঠেলে জীর্ণকে ছুঁড়ে ফেলে
প্রচণ্ড ঘুর্ণি তুফান আসছে।"
এই গান তো এক দিন তিনিই লিখেছিলেন। তারপর,
"মুক্ত হবে প্রিয় মাতৃভূমি, সেদিন সুদূর নয় আর।
দেখ লাল সূর্যের আলোয় লাল পূর্বসমুদ্রের পার।
সে আলো ছড়ায় দিগবিদিকে, কেটে যায় রাতের আঁধার।
লাল সূর্যের আলোক ধারায় করবে মাতৃভূমি মুক্তিস্নান।
উঠবে গেয়ে মুক্তির গান যুগ যুগ নিপীড়িত মজুর কিষাণ -
উড়বে হাওয়ায় আকাশছোঁয়া গৌরব উজ্জ্বল রক্ত নিশান।
সেই আলোভরা দিন আনতে হবেই,
ঢালো কমরেড, সব শক্তি তোমার।"
এক মুক্তিকামীর কথায়, সত্তরের উন্মাদনা তখন থিতিয়ে গেছে। শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন যাঁরা দেখেছিলেন তাঁদের বেশিরভাগই হাসিমুখে মৃত্যু বরণ করেছেন কিংবা জেলে। অনেকেই পথ বদলেছেন। সিপিআই(এম-এল) ভেঙে তখন টুকরো টুকরো। যোগ্য নেতা নেই। জনগণও হতাশ হয়ে মুখ ফিরিয়েছে। সেই হতাশার মধ্যেও প্রেরণা হয়ে পথ দেখিয়েছে আমাদের প্রতুলের গান। কোনও যন্ত্র ছাড়াই খালি গলায় শুধুমাত্র মাইক্রোফোনকে আঁকড়ে কী গাইত প্রতুল! হতাশা ছুড়ে ফেলে আমরা আবার শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেতাম।
"লড়াই, করো লড়াই, করো লড়াই, করো লড়াই
যতদিন না বিজয়ী হও
কিসের ভয় হবেই জয় দূর করে ফেল যত সংশয়
আবার তৈরি হও।"
যেখানে বার্তাটা পৌঁছে দেওয়াই লক্ষ্য সেখানে যন্ত্রসঙ্গীতের প্রয়োজন পড়ে না। তাছাড়া পরিস্থিতি সে সুযোগও দেয় না। অন্বেষণ নিবেদিত ও মানস ভৌমিক পরিচালিত একটি তথ্যচিত্রে চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষকে তিনি বলেছেন, যন্ত্রের বাঁধনটা আমার কাছে পাখির খাঁচার মতন। মুক্ত আকাশে আমি গান ও গলাকে ছড়িয়ে দিতে চাই। সুর, তাল, লয়কে কোনো কাঠামোয় বাঁধা নয়, বাঁধন খুলে মুক্তি দেওয়াতেই আমি বিশ্বাস করি।
"আমি বাংলায় ভালোবাসি, আমি বাংলাকে ভালোবাসি
আমি তারই হাত ধরে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে আসি
আমি যা কিছু মহান বরণ করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়
মেশে তেরো নদী, সাত সাগরের জল গঙ্গায়-পদ্মায়
বাংলা আমার তৃষ্ণার জল, তৃপ্ত শেষ চুমুক
আমি একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।"
ভাবতেও অবাক লাগে দুই বাংলার হৃদয় ও আবেগকে শব্দ ও সুরে যিনি প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে যান আজও, সেই সুরকার, গীতিকার ও গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায় প্রথাগতভাবে গান শেখেননি কোথাও। শেখার সুযোগও পাননি। জন্মেছিলেন বরিশাল জেলার হাশসুঁড় (হস্তিশুণ্ড) গ্রামে। সম্ভবত ১৯৪২-এর ২০ সেপ্টেম্বর। সম্ভবত বললাম কারণ নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে একটি লেখায় তিনি এমনটাই জানিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, "মা'র কাছে শুনেছিলাম সে দিন ছিল অমাবস্যা! জন্মেছিলাম ঢেঁকিঘরের কোণে। মা বীণাপাণি, বাবা প্রভাতচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বাবা ছিলেন স্কুলের শিক্ষক। আমরা পাঁচ ভাই তিন বোন। আমি তৃতীয় ছেলে আর পঞ্চম সন্তান।"
না, স্বাধীনতা দিবসের কথা তাঁর তেমন মনে পড়ে না। মনে পড়ে দেশভাগ। অধুনা বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে তাঁরা এসে উঠেছিলেন খড়গপুরে। তারপর চুঁচুড়ায়। '৪৭ থেকে '৫৯ চুঁচুড়াতেই কেটেছে তাঁর। বাবা ছিলেন চুঁচুড়ার হুগলি মাদ্রাসার ইংরেজির শিক্ষক। গান্ধীজির প্রয়াণের পর বাবার সঙ্গে বাবার স্কুলে গিয়ে রামধুন গেয়েছিলেন। তাঁর কথায়, ওই আমার কোনও অনুষ্ঠানে প্রথম গান গাওয়া।
শুনে শুনে তাঁর গান শেখা। বাড়িতে রেডিও গ্রামোফোন ছিল না। দলবেঁধে অন্যের বাড়িতে অনুরোধের আসর শুনতে যাওয়া, মহালয়ার ভোরে অন্যের বাড়িতে 'মহিসাসুরমর্দিনী শোনা। সরস্বতী পুজোর সময় পাড়ায় মাইক বাজত, সেখানেই বসে থাকতেন তিনি। তাছাড়া পাড়ায় বেপাড়ায় হওয়া জলসা তো ছিলই। তাঁর কথায়, গান আমাদের কাছে এসেছে নদীর জলের মতো, হাওয়ার মতো, রোদের মতো, বৃষ্টির ধারার মতো, চাঁদের আলোর মতো, বড় কচুপাতায় টলমল করা জলের মতো, পাখির ডাকের মতো, ফেরিওয়ালার হাঁকের মতো।
তাঁর দাদা প্রণব মুখোপাধ্যায় ছিলেন কবি। তাঁর দাদার হাত ধরেই তাঁদের বাড়িতে এরপর প্রগতি সংস্কৃতির হাওয়া আসতে থাকে। মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, মাও সে তুঙ - বিশ্ববরেণ্য বিপ্লবীদের নাম তিনি শুনেছিলেন তাঁর দাদার কাছ থেকেই। তাঁর দাদার হাত ধরেই তারপর একদিন তিনি পৌঁছে যান গণনাট্য সঙ্ঘের অনুষ্ঠানে। তারপর সবই ইতিহাস। তাঁর কথায়, ষাটের দশকের শেষ কয়েক বছর থেকে সত্তরের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত শুধু দেশ কাঁপানো নয়, দুনিয়া কাঁপানো সময় আমাকে দিয়ে গান লেখাল। গানকে একটি গণ আন্দোলনের সঙ্গে, অনেক মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে মেলালে কেমন করে গান ছড়িয়ে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়, মানুষের মুখে মুখে, অন্তরে অন্তরে, কী করে একের গান হয়ে যায় অনেকের গান, তা অনুভব করেছিলাম সে সময়।
২০সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ ৮২ বছর বয়স পূর্ণ করেছেন সুরকার, গীতিকার ও গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায়। বয়স ও সময়ের সঙ্গে কতটুকু বদলেছেন তিনি? যদি কেউ এই প্রশ্ন করেন তাহলে বলতে হবে, দুই বাংলায় এত জনপ্রিয়তা, এত সম্মান, এত পুরস্কার পাওয়ার পরেও কখনও একটুও বদলাননি তিনি। তিনি শিশুর মতো হেসে উঠতে পারতেন। মুগ্ধ শ্রোতা পেলে স্থান-কালের বিচার না করেই গেয়ে উঠতে পারতেন,
"শুন শুন সর্বজন শুন মন দিয়া
মোদের কাছে যাওরে ভাই এক কাহিনি শুনিয়া
অনেক দিন পূর্বের কথা উত্তরের দেশে
যে দেশে পাহাড়ের চূড়া আশমানেতে মেশে
সেই দেশেতে ছিলরে এক বোকা বুড়ার বাসা
বুড়ার মাথা ভরা পাকা চুল চক্ষু ভাসা ভাসা
বোকা বুড়ার কথা শুন রে।"
১৫-ই ফেরুয়ারি ২০২৫, চিরঘুমের দেশে চলে গিয়েছেন তিনি।
মৃত্যুর কিছুদিন আগে হঠাৎ একদিন হোয়াটস্অ্যাপে তিনি লিখলেন, "অপারেশনের উপযুক্ত বিবেচিত হলে ২৯/১ SSKM Main OT Complex-এ টিউমারমেধ যজ্ঞ হবে।"
তখনও তাঁর রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানতাম না। লিখেছিলাম, "হোমিওপ্যাথিতে এর চিকিৎসা হতে পারে নাকি দেখবেন। আমার এক বন্ধুর মারাত্মক পাইলস্ - এর সমস্যা হোমিওপ্যাথিতে ঠিক হয়েছে।"
উত্তরে তিনি লিখেছিলেন, "আমার রেক্টামের কাছে চার ইঞ্চি টিউমার, পাইলস নয়।"
অপেক্ষায় ছিলাম তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেই দেখা করতে যাব। তাঁর সঙ্গে অনেক কথা বলব। আর একবার কথা শুরু করলেই তিনি তাঁর কথার ফাঁকে ফাঁকে শোনাবেন একের পর এক গান; যে গান তিনি সবাইকে শোনাতে চান অথচ তেমন সুযোগ পান না। তা আর হল না।
বেঁচে থাকলে ২০সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ কিংবদন্তি হয়ে ওঠা এই সঙ্গীতশিল্পী ৮৪ বছর বয়স পার করতেন।
তথ্যসূত্রঃ
১) 'কথায় কলমে' - প্রতুল মুখোপাধ্যায়
২) 'পর্বান্তর' - জুলাই, ১৯৯৪
৩) 'প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গান' (তথ্যচিত্র); সম্পাদনা ও পরিচালনা - মানস ভৌমিক
