কুঁ উউ ঝিক ঝিক
না এই মন কেমনিয়া বাঁশি বাজলো না আমার জন্য।
আসলে কুঁ উউ ঝিক ঝিকের শৈশব তো আমরা অনেক পিছনে ফেলে এসেছি।
আর বর্তমানের শিশুদের কাছে তো ওই পাগলপারা ডাকের সুর পৌঁছায়'ই না।
হেঁয়ালি ছেড়ে আসল কথায় আসি।
হাওড়ায় ওলা থেকে নেমেছিলাম ছ'টা চল্লিশে। স্টেশন থেকে কুড়ি মিনিট দূরের বাসিন্দা সহযাত্রী আটটা পনেরোতে ট্রেন ছাড়ার দশ মিনিট আগে এসে জানালো আধার কার্ড আনতে ভুলে যাওয়ায় তার বৌ বাড়ি গেল যদি সময়মতো কার্ড নিয়ে ফিরে আসতে পারে!
তাইই কি সম্ভব!
চোখের সামনে দিয়ে পূর্বা চলে গেল পশ্চিমের পথে।
আরও দশমিনিট বাদে
সবাই একসাথে হ'ওয়ার পর সিদ্ধান্ত হলো বড় ক্ষতি বাঁচাতে ছোট ক্ষতি মেনে নিয়ে অন্যপথে চলি বরং; আগামীকালের শ্রীনগরগামী ফ্লাইট ধরতে আজকেই রাতের প্লেনেই যাচ্ছি দিল্লী।
রাতটা মহিপালপুরের কোন হোটেলে কাটিয়ে কাল থেকে পূর্বপরিকল্পনাবৎ।
এখান থেকে সন্ধ্যে সাতটা পঁয়তাল্লিশে ফ্লাইট, দিল্লিতে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত নয়টা পঞ্চাশ।
রাজা আর দোলাকে নিয়ে আমার সল্টলেকের বাসস্থান থেকে এয়ারপোর্ট-এ পৌঁছনোর একটু আগে খেয়াল হল, মানিব্যাগ, এটিএম কার্ড আনতে ভুলে গেছি।
গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে গিয়ে ফের পূণর্যাত্রা।
কি যে হচ্ছে এবার!
আমি যখন এটা লিখছি, তখন একটা তারিখ পেরিয়ে গেছে।
বাড়ি থেকে এয়ারপোর্ট, ভায়া হাওড়া স্টেশন, অবধি যা বিভ্রাট।
তারপর থেকে পুত্রের মেক মাই ট্রিপ ডট কম এর সাথে খোঁচাখুঁচির ফলে দিল্লী বিমানপোত, তদিয় কনভেয়র বেল্ট, বাইরে গাড়ি ও গাড়ি করে যথানির্দিষ্ট হোটেল এই অবধি বেশ ভালোভাবেই মিটেছে।
আগামীকাল থেকে পরবর্তী দিনগুলোর দায় ভোগ অথবা উপভোগ করার পালা, থুড়ি, আগামীকাল তো নয়, সে আজকেই।
এবার একটু ঘুমানোর চেষ্টা করি।
পরদিন সকালে।
কাল রাত এগারোটায় মহীপালপুরের এই OYO হোটেলে ঢোকার পর থেকে চার দেওয়ালের মধ্যেই রয়েছি।
কন্যাকুমারী থেকে শ্রীনগর সরলরেখাটা সম্পূর্ণ হতে সময় লাগলো প্রায় তিন বছর।
কাশ্মীরে কখন নেট থাকবে না-থাকবে, এই ভেবে একটা নোটপ্যাড, পেন সঙ্গে নিয়েছি। সময়ের অপ্রতুলতা আর প্রাত্যহিক ভ্রমণ শেষের শারীরিক ক্লান্তি যদি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না করে, তো কিছু কিছু 'বেত্তান্তো' লিখে রাখার চেষ্টা করবো।
আমি এই সময়ের সারণী তে সুস্থ থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাবো।
আমার পরিচিত মানুষজন-ও সুস্থ থাকুক।
আমার এদফা যাত্রার শেষ অংশ শ্রীনগরগামী ইন্ডিগো বিমানের লেজের শেষ আসনে বসে পাশের জানালা দিয়ে দিল্লী এয়ারপোর্ট এ সঞ্চরণরত নীলগাড়ি, নীলসাদা প্লেন আর ফাঁকেফোঁকড়ে সবুজ ময়দান দেখছি।
বিকেলে পৌঁছাবো।
তারপর?
সে তো জানি না
আজ প্লেনে ওঠার আগে অবধি গা-জ্বালানি রোদ্দুর ছিল। পরে রোদ পড়ে এল। অনেক উঁচু দিয়ে উড়তে উড়তে কখনো চারদিক ঢাকা পরছিল কুয়াশার আস্তরণে, কখনো পেঁজা তুলোর অতিকায় স্তূপরাশির মতো সাদা মেঘের দলকে দেখতে দেখতে একসময় শ্রীনগর এসে গেল। মেঘ পাতলা হতে দেখা যেতে লাগলো শ্রীনগরের ছড়ানো ঘরবাড়ী।
প্লেন থামলো। নামলাম।
তারপর'ই মেঘ-বিদ্যুচ্চমক-ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা মিলে বিকেল আর সন্ধ্যাকে একাকার করে তুললো।
ফোনের টাওয়ার নেই, মোবাইল নিদ্রা গিয়াছেন।
এয়ারপোর্ট এর বাইরে কয়েকজন temporary Sim connection নেবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো; আকাশের দিকে হুঁশ নেই।
হোটেলের গাড়িতে উঠতে না-উঠতেই কেঁপে বৃষ্টি।
আধঘন্টার রাস্তা ট্র্যাফিক জ্যামের কেরামতি তে আমাদের পৌঁছে দিল ডাল লেকের পারে আজকের নিশিযাপনের ঠিকানায় Hotel Sunshine.
ট্যুর কোঃ অধিকাংশ ভ্রমণার্থীদের নিয়ে জম্মু থেকে এখনো এসে পৌঁছায় নি।
গতকাল ট্যুর কোঃ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভ্রমনার্থীদের নিয়ে হোটেলে পৌঁছেছিল রাত দশটায়। রাতের রান্না-খাওয়া সারা হতে রাত সাড়ে বারোটা।
ভোড় পাঁচটায় বেল বাজিয়ে প্রভাতী চা দিয়ে গেল। বেশ বোঝা যাচ্ছে এই ট্যুরাবকাশে 'ঘুম'-এর সাথে বোঝাপড়া করেই চলতে হবে।
এখন বিকেল সাড়ে তিনটা। আটকে আছি শোনমার্গ এর গাড়ির স্ট্যান্ডে। সকাল এগারোটা বেজে যাওয়ায় একটু দূরে কার্গিল যাওয়ার রাস্তা থেকে সিকিউরিটি ভাগিয়ে নামিয়ে দিয়েছে। ছোটগাড়ি বা স্থানীয় পরিবহনের গাড়ি ছাড়া ট্যুরের বড় গাড়ির এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি নেই। বর্ষণসিক্ত পরিবেশ, পিচ্ছিল কর্দমাক্ত রাস্তা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির জন্য গাড়ি থেকে নেমে একটু পদচারণার অবকাশ নেই। ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি প্রায় সবচেয়ে। কখন এ সমস্যার সমাধান, কিভাবেই বা তা সম্ভব, কেউই জানি না।
ড্রাইভার, ট্যুর কোঃ এর লোক কেউই সঠিক বলতে পারছে না। আমাদের তেরো সিটের পাঁচটা ট্রাভেলার গাড়ির চারটে জম্মু থেকে আসা। ওরা এ রুটের হাল-হকিকৎ জানে না। একজন শ্রীনগরের। সে সাফাই গেয়েছে এই বলে যে ট্যুর কোঃ কে সে নাকি সকালে হোটেল ছাড়ার আগেই এই দেরী হলে আটকে যাওয়ার সম্ভবনার কথা।
যা হোক্, এখন তো আর কিছু করার নেই। বিরামহীন বরিষণের সাথে বরফ পড়তে না থাকলেই বাঁচোয়া।
দেখা যাক্, শেষে কি হয়।
চেকপোস্ট এর প্রহরী বেলা দুটোয়, চারটেতে, সন্ধ্যে সাতটায় কথা বলতে বলেছে।
কথা বলে শেষ পর্যন্ত কি অশ্বডিম্ব প্রসব হবে ভাবছি, এমন সময় স্ট্যান্ডে জমায়েত ট্রাকের লোকজন আবার ভাগিয়ে দিল আমাদের ওদের ওই স্ট্যান্ডে রাতে অনেক ট্রাক ঢুকবে।
ভরসা একটাই, আমি বা আমার সঙ্গের আর দুজন একা ন'ই। পাঁচগাড়ী যাত্রী ভুস্বর্গ অথবা ভুনরক দর্শন যা হবার তা একসাথেই হবে।
যদি সব ঠিক থাকে, লিখিত-স্বরূপে আবার যোগাযোগ হবে।
ঠান্ডায় আঙ্গুল আর চলছে না।
অলমিতি
শেষ অবধি -
আটকে গেলাম শোনমার্গ-এই।
আগামীকাল একবার চেষ্টা হবে কার্গিল ছুঁয়ে পরবর্তী গন্তেব্যর দিকে যাওয়ার।
কিছুই নিশ্চিত নয়। এই ইনারলাইন পারমিটের ভ্রমণস্থলীতে কাল আমাদের কার্গিলবাস অননুমোদিত। কর্তৃপক্ষ দয়া করে ছাড়লে তবেই এই গাড্ডা থেকে বেড়োতে পারবো। তবে এখান থেকে দিনমানে লেহ্ যাওয়া আতঙ্কজনক। প্রায় তিনশো কিমি পাহাড়ি রাস্তা, কার্গিলের আগে আবার জোজি-লা!
পুরো ভ্রমণসূচী একদিনেই ঘেঁটে-ঘ।
ভবিষ্যতের (সামনের দিনের) অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে এখন এই রাত বারোটায় শোনমার্গ এর হোটেলে শুতে যাওয়ার সময়।
একটা বিষয় মাথায় এলো।
কাশ্মীরের পর্যটক শোনমার্গ ঘুরে ফিরে যায়; থাকে না। লাদাখের পর্যটক সোজা কার্গিল চলে যায়। পর্যটকদের শোনমার্গ এই আটকে দেওয়ার এটা একটা মিলিত চাল হয়ে থাকতে পারে হোটেল-ওয়ালা ও ট্র্যাফিক দপ্তরের তরফে।
এখানকার চারদিকের সবুজ পাহাড়ের ঢাল শীর্ষ থেকে ছড়িয়ে পরা বরফে ছেয়ে রয়েছে। এই হোটেলে ও আরো অনেক হোটেলের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে সিন্ধুনদ।
আজ এই পর্যন্তই।
আজ আবার একটা অনিশ্চয়তায় ভরা রাতের মুখোমুখি। সকাল শুরু হয়েছিল শোনমার্গ এর রৌদ্রোজ্জ্বল ঝলমলে দিনের আশ্বাস দিয়ে।
আবহাওয়া ঠিকই আছে। সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। কার্গিলের হোটেল-বুকিং এর টাকা নষ্ট। শোনমার্গ এ অতিরিক্ত খরচ হয়েছে হোটেল-বাবদ। আজ বুকিং লেহ্ তে; সে তো সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরে। পাহাড়ি পথে অতদূর! তাছাড়া আটকে থাকা ট্যুরিস্টদের তিন চারশো গাড়ির ভিড় জমেছে আজ সকাল দশটায় গেট খুলবে এই আশায়।
বেশ বোঝা যাচ্ছে সন্ধ্যের আগে কার্গিল পৌঁছনো যাবে না। সেখান থেকেও আড়াইশো কিলোমিটার দূরে লেহ্ যেখানে আজ আমাদের নিশিযাপনের কথা। রাস্তায় চা, লাঞ্চ, অনিয়ন্ত্রিত "ছোট-বাইরে"র জন্য গাড়ি থামানো।
যাইহোক, শুরু হলো কার্গিলাভিমুখী যাত্রা। বেশ কিছুটা যেতে, উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে শীর্ষ থেকে ঢাল বেয়ে নেমে আসা বরফের জমায়েত বাড়তে লাগলো। দুপাশে পাহাড়, মাঝে সিন্ধুনদ, পাহাড়ের গায়ে নানাবর্ণের গাছপালা, ঝোপঝাড় এর মাঝে বরফের বিস্তীর্ণ চাদর সবমিলিয়ে মনকে উদাসী করে দিচ্ছে।
একসময় এলো জোজি-লা। কালো, মেরুন, খয়েরী, সবুজ সব উধাও শুধুই রজতশুভ্র বরফ। উপত্যকার অতিকায় সমাবেশে পানসি-নৌকা সদৃশ গাড়ী চালিয়ে বেড়াচ্ছে কিছু অত্যুৎসাহী পর্যটক। বরফের গোলা পাকিয়ে পরস্পরকে ছোড়া, স্বেচ্ছাকৃত পা-পিছলে পরার হুড়োহুড়ি, সেলফি তোলা নানান ভঙ্গিতে, এভাবেই বীরপুরুষ বাঙালির রোমাঞ্চের পালা শেষ হতে আবার শুরু পথ চলা। একসময় এল কার্গিল যুদ্ধের শহীদ-স্মরণে নির্মিত War Memorial. বিধিনিষেধ মেনে যারা যাবার, তারা ঢুকে কামান-বন্দুক-প্লেনের মডেল-অজস্র রেজিমেন্টের পতাকা দেখে ফিরলো।
উল্টোদিকে কার-পার্ক। দুএকটা চা স্ন্যাকস্ এর দোকান।
কার্গিল বাইপাস করে যখন আমরা আজকের লাস্ট স্ট্রেচ অফ্ দিরো জার্নি টু লেহ্ শুরু করলাম, তখন সাড়ে সাতটা। দিনের আলো থাকবে আরো ঘন্টাখানেক।
সন্ধ্যা। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। রাত গড়াচ্ছে নিশুতির দিকে। আমাদের পাঁচগাড়ীর কনভয় চলছে। কিছু ট্রাক ছাড়া শুধুই আমাদের গাড়িগুলি। হঠাৎ কখনো এক আধটা প্রাইভেট গাড়ীর দেখা মিলছে। দুপাশের পাহাড় কালো। মাথার উপর স্টেডিয়ামের ছাদের মতো আকাশ ধূসর। হেডলাইট এর আলোয় সামনের রাস্তা কালো ময়ালসাপের মতো। রাস্তার পাশের রোড-মার্কার আলোর সারিগুলি শুধু জানান দিচ্ছে, তোমরা জীবিত মানুষ। বন্ধ জানালার ফাঁকফোঁকড় দিয়ে আসা অপ্রতিরোদ্ধ ঠাণ্ডার সাথে লড়াই অনিচ্ছুক গাত্রাবরণের। সবমিলিয়ে মনে হচ্ছে এক আধিভৌতিক জীবনে যোগ হয়েছে গাড়ীর ভিতেরে আমাদের এই জীবন।
এক সময় ড্রাইভার স্টিয়ারিং থেকে হাত তুলে স্থাণু হয়ে বসে থাকলো বেশ কিছুটা সময়। গাড়ী কিন্তু চলছে আপন গতিতে। একটা বাঁকের মুখে ড্রাইভার আবার ড্রাইভার বনে গেল।
জানলাম, সামনের পাহাড়টা ম্যাগনেটিক হিল, গাড়ীকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল নিজের দিকে।
ভাগ্নিস, বিরতিতে ড্রাইভার ঘুমিয়ে পরে নি। বাঁকটা তাহলে আমাদের বাকি ই থেকে যেত।
"সব পাখি ঘরে আসে, সব নদী..."। আমরাও এলাম লেহ্তে রাত এখন আড়াইটা।
আজ (মানে, পরদিন) আর অন্য কোথায় যাওয়া নেই। শুধু মাঝবেলায় লোকাল sight-seeing.
পরদিন লেহ্তেই।
দেরী করে ঘুম থেকে ওঠা, প্রাতঃরাশ, মধ্যাহ্নভোজনান্তে স্থানীয় দ্রষ্টব্যস্থান ঘুরে দেখা হলো।
এখানে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বাসিন্দা বেশী, তাই বৌদ্ধমন্দির ঘোরা সূচিতে প্রথম স্থানাধিকারী। একটা অনেক পুরানো রাজবাড়ী আছে।
সকালের ও দুপুরের খাওয়ার বিরতি তে লেহ্ এর প্রধান বাজারে মহিলা যাত্রীদের টু-মারা, ইত্যাদি ইত্যাদি।
একটা ভীতি কাজ করছিল অনেকের মধ্যে পরদিনের যাত্রা (নুব্রা উপত্যকা) - পথে খাদুং লা (18432ft.) অতিক্রম করার সময় অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে সম্ভাব্য শারীরিক অসুবিধার আশংকায়। এই ভীতি বর্ধিত হয়েছিল যখন এক শিশু ও একজন প্রৌঢ় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা করিয়ে অনেক রাতে হোটেলে ফিরেছিলো।
ছোট অক্সিজেন সিলিন্ডার কেনার উদ্যোগ শুরু হয়ে গেল; সেইসাথে Dormox tablet খাওয়া শুরু করলো অনেকে।
পরদিন
আজকের যাত্রাপথে খাদুং লার অনেকটা আগে থেকেই পাহাড়ের গায়ে ঢালবেয়ে নেমে আসা বরফ এই রুক্ষ প্রাণহীন পরিসরকে সৌন্দর্যের এক অপ্রাকৃত মাত্রায় পৌঁছে দিল।
সামনে মাইল খানেক লম্বা গাড়ির লাইন। আমাদের গাড়ীগুলোও আটকে থাকলো। অল্পসময়েই পেছনেও গাড়ীর লম্বা লাইন। জানা গেল তুষার ধ্বসের কারণে রাস্তা বন্ধ। বরফ সরানোর কাজ চলছে। ঘন্টা চারেকের মধ্যে খুলে যাওয়ার সম্ভবনা নেই।
শেষমেশ যদিও তিনঘন্টায় খুলে গিয়েছিল, কিন্তু এই পথ-নির্বাসনের অনিশ্চয়তা সবাইকেই প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে উন্মুখ করে তুলছিল। এমনকি উন্মুক্ত ওই স্থানে মহিলাদের ও রেহাই নেই। পুরুষসঙ্গী ছাতা দিয়ে গার্ড করে তাদের বিপদোন্মুক্ত করছিল।
খুলে গেল গাড়ীর লাইন। এবারে এক চেক্-পোস্ট; শুরু হলো গাড়ির চাকায় লোহার ম'ই সদৃশ চেইন লাগানোর কর্মকাণ্ড।
যথারীতি চেকড্ হয়ে গাড়ী গুলো যাত্রা শুরু করলো যেন স্বর্গভূমিতে উত্তরণের। অনেক উঁচুতে উঠে এসেছি। চারদিকের পাহাড়-শীর্ষ, তাদের ঢাল, মাঝের উপত্যকা, সবকিছু ঘন বরফের চাদরে নিজেদের মুড়ে ফেলেছে। ক্বচিৎ কিছু প্রস্তরখন্ড তাদের কালচে-ধূসর রঙ নিয়ে এই শ্বেত, ঘুমন্ত প্রকৃতির বুকে মাথা উঁচিয়ে রয়েছে। রাস্তার দু-ধারেও তালতাল বরফের দেওয়াল।
...একদিন নেমে যাবো দৈনন্দিন সমতলের জীবনে। এই তুষারার্ণব থেকে যাবে তার শুভ্র মহিমায় বিরাজিত হয়ে।
পৌঁছলাম খাদুং লার জিরো-পয়েন্ট এ। বিশ্বের সবচাইতে উঁচু এক কাফে; একটু উঁচুতে শিবের একটা ছোট্ট মন্দির।
দাঁড়াতে দিল না। আরো অনেকক্ষণ নামতে থাকলাম; ঘন চাদর সরে গিয়ে হালকা হতে থাকলো। একসময় তৃণগুল্মহীন পাহাড়-শীর্ষে শুধু পড়ে থাকলো বিলীয়মান তুষার।
অনেক নেমে এসেছি। সন্ধ্যে ছটায় খাদুং লা গ্রাম। আটটায় নুব্রা ভ্যালির প্রাণকেন্দ্রে হোটেলে যখন উঠলাম, মনে হলো "যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ"।
কাল এখান থেকে তুতুক গ্রামে ঘুরে দিনান্তে আবার এই হোটেলে ফিরে আসা।
তুতুক ঘুরে ফিরে আসছি।
পথিপার্শ্বের বর্ণনা এ পথ যিনি সৃষ্টি করেছেন, একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব। এ অক্ষমের চেষ্টা শতাংশের হিসাবেও আসবে না।
আমি শুধু বলি- দুপাশের পাহাড় কালচে, বাদামী, হাল্কা বেগুনি রঙে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করে রয়েছে নির্বাক নিশ্চল ঔদ্ধত্যে। সিয়াচেন এর দিক থেকে আসা এক হিমবাহ নীচে নেমে উদ্ভব ঘটিয়েছে এক নদীরূপ জলপ্রবাহের। আদতে যা এক বিশাল বিস্তার সম্পন্ন এক নালা। এ ছিল আমাদের তুতুক পথ-পরিক্রমনের সাথী। পথের শেষার্ধে এই নালা শেষ হয়েছে তুতুক ছাড়িয়ে একটু দূরে, এক বালিয়াড়ির রূপ পরিগ্রহ করে, জিরো পয়েন্টে যা যুগপৎ ভারত পাকিস্তানের সীমানা। ভারতের উত্তরতম।
শেষের ঘন্টাতিনেক না গাছপালাগুল্মাদি, না ঘরদোর-দোকান, শুধু কঠিন রুক্ষ পাথরের পাহাড় আর পাহাড়। কিছু মিলিটারি ছাউনি। দুএক জায়গায় তাদের এস্টাব্লিশমেন্টের মধ্যে তাদেরই পরিচালিত স্কুল পড়ুয়া মূলতঃ তাদের কাজকর্মে নিয়োজিত লোকদের ছেলেমেয়েরা। কোথাও হঠাৎ কন্ট্রাক্টরের লোক রাস্তা সারাই করছে। ন'ইলে, যে যে অংশে রাস্তা আছে, সেখানকার রাস্তার গুণগত মান ভালো। পর্যটকদের গাড়ী ছাড়া এ পথে অন্য যান চলাচল করে না।
রাস্তার একজায়গা দ্বিধাবিভক্ত। একটু পুবে উত্তরে তুতুক এর রাস্তা। সোজা উত্তরে সিয়াচেন দেড়শো কিলোমিটার দূরে।
আমরা পথ ধরেছি আশি কিলোমিটার দূরে-তুর্তুকাভিমুখী হয়ে।
যাওয়ার পথে একজায়গায় গাড়ীগুলো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। সেখানে পৌঁছনোর কিছু আগে থেকেই পাহাড়ের প্রায় মসৃণ খাড়াই ঢালগুলিতে দৃশ্যমান হয়েছিল এক বিস্ময়কর পট যার ভাস্কর এই প্রকৃতি। Abstract Art-এর নানারূপ যেন স্রষ্টা ফুটিয়ে তুলেছেন বিশালাকার, কঠিন শৈল-ক্যানভাসে। এই নীরব মহাসৃষ্টির কাছে মানুষের সব অঙ্কন যেন শ্রদ্ধায় বিনম্র হয়ে আছে।
লাদাখ অঞ্চলের এই পর্ব্বতরাজি রুক্ষ শুষ্ক কঠিন নীরব নির্জন উদাসীনতায় দেশের অন্যান্য পাহাড় থেকে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রেখে চলেছে। কারোসাথে তার সখ্যতা নেই, বৈরীতাও নেই। এইসব পর্ব্বত পৃথক এক অস্তিত্ব যেন বিশ্বজগতের সব শব্দকে শুষে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তুতুক গ্রাম আরেকটা কারণেও উল্লেখ্য। লাদাখ অঞ্চলের আবহমান ক্র্যাফ্ট, ট্র্যাডিশনস্ রয়েছে এখানকার প্রদর্শশালায়। ইউনেস্কো বা ওই জাতীয় কোন প্রতিষ্ঠানের শিরোপা রয়েছে এই গ্রামের মাথায়।
গাড়ী চলার দূরত্বে তুর্ভুক থেকে দেড়ঘন্টা আগে এক খুবছোট জনবসতি পড়লো। স্থানীয় সূত্রে জানলাম একাত্তরের যুদ্ধের আগে ওই অবধি এলাকা ভারতের এক্তিয়ারভুক্ত ছিল। যুদ্ধের পর সীমানা বহিরাঞ্চলে প্রসারিত হয়ে তুতুক অবধি পৌঁছেছে।
এইভাবে যাওয়া-ফেরা করতে করতে নুব্রায় ফিরে এলাম। ফেরার পথে পার্বত্য অঞ্চলে বিস্তীর্ণ উপত্যকা জুড়ে মরুভূমির-সদৃশ বালিয়াড়তে দুটো কুঁজ-ওয়ালা উটের "camel riding" এর ব্যবস্থা রয়েছে। গাড়ী থামাতে উৎসাহীরা নেমে পরলো। উটের পিঠে চাপার মূল্য জনপ্রতি সাড়ে তিনশো শুনে বেশিরভাগ রণে ভঙ্গ দিল।
ফিরলাম নুব্রায়। কাল যাব প্যাঙ্গং লেক। সেখানেই থাকার ব্যবস্থা।
তার পরদিন সো মোরিরি (Tso Moriri)।
লেক প্যাঙ্গং ও সো মোরি
নুব্রা থেকে প্যাঙ্গং এর কথা লিখতে বসে দেখি আমার পেন মোবাইল এর পথে সহগমন করেছেন। বোধহয় এখানকার অসহনীয় ঠান্ডা তিনি স'ইতে পারেন নি।
(এই অংশ পরবর্তীতে লেখা:)
কিন্তু, সে কথা পরে।
নুব্রা থেকে প্যাঙ্গং আসার পথ এককথায় দূর্গম। কোথাও পাহাড়ের পেট চিড়ে সংকীর্ণ, ভাঙাচোরা বাঁধানো রাস্তা; কোথাও শুধুই পাথর সমাকীর্ণ। পাহাড়ের গা নিরেট পাথরের। কোথাও দুদিকের পাহাড়ের মাঝে উপত্যকা দৃশ্যমান হয়; কোথাও দুদিকের পাহাড়ের নৈকট্য মাঝের উপত্যকাকে অদৃশ্য করে দেয়। ভ্রম হয়, উপত্যকা শেষ। এরপর দুদিকের পাহাড় আমাদের চেপে পিষে দেবে। ভুল ভাঙে যখন হঠাৎ কোন সাঁকো পেরিয়ে একদিকের পাহাড় থেকে উল্টোদিকের পাহাড়ে যাই।
নীচে তাকিয়ে দেখতে পাই, শীর্ণকায়া কিন্তু তেজস্বিনী জলরাশি প্রবহমান। এইসব নদী ওরফে বহতা-নালাগুলির শুরু ও শেষ এক রহস্য।
একসময় আবার দুই পাহাড়ের মাঝের উপত্যকা প্রশস্ত এবং অন্তহীন। কোথাও তার তলদেশ নানা আকারের পাথর/পাথরকুচিতে সম্পূর্ণ আবৃত; কোথাও শুধুই তরঙ্গায়িত সাদা বালি। গাড়ীও অনেকসময় সেই উদ্বেল উপত্যকার বুক চিরে চলে। পথের কোন ইশারা পাই না, কিন্তু ওরা নিশ্চয়ই জানে এই রুক্ষ প্রকৃতির মধ্য দিয়ে পর্যটক নিয়ে আনাগোনা যাদের জীবনধারণের পাথেয়। পাহাড়ে পাথরের ফাঁক গলে মাঝেমাঝে ধূসর বালি গ্ল্যাসিয়ারের বিস্তার লাভ করে উপত্যকার বালিতে মিশে গেছে। যেখানে শুধুই শক্ত পাথর, সেখানে বুকে সেই Abstract Art এর কারিকুরি।
একটা চিন্তা মাথায় এলো সব পাহাড়ের বুক'ই বোধহয় এই শিল্প-সুষমায় মন্ডিত, যা আমরা দেখতে পাই না। কারণ, সচরাচর, আমরা যেসব পাহাড়ে যাই, সেগুলোর বুক বর্ণিল তরু-লতা-গুল্মে আবৃত থাকে। এমন উলঙ্গ পাহাড়ের সাথে সহবাস হয়ে ওঠে না।
এবার আসি প্যাঙ্গং এর কথায়।
অন্তহীন নীল জলরাশির চারদিক ঘিরে অগুনতি পাহাড় গায়ে গায়ে লেগে লেকের প্রাচীর হয়ে যেন এগিয়ে চলেছে। তাদের পিছনের সারির মাথায় সাদা বরফের ঝালর দেওয়া রজৎদ্যুতি শিরোভূষণ। লেক বঙ্কিম ভঙ্গিতে এগিয়ে চলার সাথে কিছু পাহাড়ের উচ্চতা ও বরফের আস্তরণ দুইই বেড়ে চলেছে।
লেকের প্রায় মুখেই ত্রিস্তর পর্যটক-আবাসগুলি। তাঁবু, টিনের ছাদ-ওয়ালা ঘর, সম্পূর্ণ কাঠের একটু বেশি আরামপ্রদ কক্ষ চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী।
আমাদের পাঁচগাড়ীর জনা পঞ্চাশেক পর্যটকদের নিশিযাপনের স্থান নির্দিষ্ট হয়েছিল লটারির মাধ্যমে। আমার বরাতে জুটেছিল প্লাইউডের দেওয়ালের ভিতরে কাপড়ের লাইনিং দেওয়া, উপরে দোচালা করে ক্যানভাসের তলায় অনুরূপ কাপড়ের লাইনিং দেওয়া ছাদ-বিশিষ্ট একটা টেন্ট এ।
শয়ন তো রাতে, কিন্তু গাড়ী থেকে নামতেই তিব্বতের দিক থেকে আসা উত্তরে হিমেল হাওয়া ওইসব হিমানীশিখরগুলোকে চুম্বন করে লেকের জলের উপর দিয়ে বয়ে এসে যেন চাবুকের আঘাত বসিয়ে দিল সর্বাঙ্গে। গরম পোষাক সব চাপিয়েও রেহাই নেই। সর্বাঙ্গ কাঁপতে লাগলো থর্ থর্ করে। তাঁবুর ভিতরটা স্যাঁতস্যাঁতে, সেখানেও কোন প্রতিশ্রুতি নেই। একটু উষ্ণতার খোঁজে সংলগ্ন রেস্তোরাঁর কিচেন-লাগোয়া ডাইনিং হল-এ। দুগ্লাস গরম চা ও কিচেন চুঁইয়ে আসা উষ্ণতায় কাঁপুনি থামলো।
লেকের ধার ধরে বেশকিছুটা হাঁটলাম ঘরবাড়ি, লেক, উৎসাহী পর্যটকদের ফোটো ও সেলফি তোলা দেখতে দেখতে। অল্পসময়েই আবার অসহনীয় ঠান্ডার তিরস্কার। ফিরে এসে আবার সেই রেস্তোরাঁর কবোষ্ণ আশ্রয়। দিনের দ্বিতীয়ার্ধের সাতটা বাজলেও সোনার আঁচলখসা তন্দ্রালসা সন্ধ্যার তখনো একঘন্টা বাকি নামতে।
রাত এগারোটায় বাতি নিভে যাবে। গরমজল পাওয়া যাবে পরদিন সকাল ছটা থেকে নটা অবধি। বালতিতে কিছু জল ভরে রাখতে হলো রাতের প্রয়োজনে।
রাত শেষ হলো। সকালে লেকের নীলজলে ঝিকিমিকি রোদ্দুর। হলে কি হবে, বরফ-ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা অবিরাম। উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়ে রাখলে লেক পিছনে পরে। সামনে কয়েদঘরের মতো টেন্ট আর একগাদা গাড়ীর ভিড়। অগত্যা সেই রেস্তোরাঁ।
আজ যাবো সো মোরিরি (Tso Moriri)। লেকের ধারে বসতি। এ লেক প্যাঙ্গং এর মতো বিপুল জলরাশি নয়। লেকের ধারে থাকার হোটেল, গেস্ট-হাউস, টেন্টগুলোও ঘিঞ্জি ধরণের। এ দফা আজকেই আমাদের লাদাখ পরিভ্রমণ এর শেষ। কাল থেকে ঘরে ফেরে যাওয়া। কাল লেহ্ তে পুনরবস্থান। পরশু দিল্লী, সেদিনই ট্রেনে গৃহাভিমুখি হয়ে চেপে বসা।
সকাল আটটায় আমাদের বেড়োনোর কথা প্রাতঃরাশ সেরে; বেড়োতে বেড়োতে দশটা বাজলো। এ রাস্তাও গতদিনের রাস্তার প্রোটোটাইপ।
প্যাঙ্গং লেকের পার ধরে রাস্তা। লেকের সাথেই সর্পিল তার চলার অভিমুখ। প্রায় একঘন্টা গাড়ী চলার পরেও লেক আর শেষ হয় না। একসময় লেক আর রাস্তার ছাড়াছাড়ি হলো। লেক মুখ ফিরিয়ে বাঁয়ে তিব্বতাভিমুখি হলো।
স্থানীয় লোকজনের কাছে খবর নিয়ে জেনেছি ভারতে অবস্থিত তিব্বতের কাছের এই তুষারকিরীটিনী পাহাড়গুলোতেই চিনা সৈন্যরা তাঁবু ফেলেছিল এবং আমাদের রাতের আশ্রয়ের হোটেল, টেন্টগুলোর সামনে লেকের উল্টোপার সন্নিহিত পাহাড়ের অপরদিকের ঢালের নীচের গলোয়ানের উপত্যকাতেই ভারতের সেনাবাহিনী "উনলোগোকো ভাগা দিয়া"।
সো মোরিরির হোটেলে বসে অন্য পর্যটকের কাছ থেকে ধার নেওয়া কলমে যখন এসব লিখছি তখন সবমিলিয়ে চলমান চিত্রপট মনে হচ্ছে আমার এ কদিনের লাদাখ পরিভ্রমণ।
সকাল হলো।
আজ আর বিশেষ কিছু লেখার থাকবে না বলেই মনে হচ্ছে। লেহ্ তে যাব। থাকব আজ।
খাদুং লার ওই উচ্চতা আর পাই নি; তবে তারপর থেকে বারো থেকে পনেরো হাজার ফুট চরে বেড়াতে হলো এ কদিন।
ঠান্ডা, শুধু ঠান্ডা। তীব্র শিতলতায় অবগাহন আমার এবারের এই লাদাখ পরিভ্রমণ। নীচের পাহাড়ের চিনার, ম্যাপল্ উঁচু পাহাড়ের বার্চ, উইলো আরো অনেক নাম-না-জানা গুল্মাদির সাথে সাক্ষী থেকে গেল আমার পথচলার।
