বিবিধ

কৃষ্ণনগরে কাজী (চর্তুত্রিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক]



ইনাস উদ্দীন


[১৯২৬ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে কবি সপরিবার কৃষ্ণনগর এসেছিলেন, এনেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। কবিকে কেন এনেছিলেন তিনি? শুধুই বন্ধু বলে? প্রতিভাবান কবি বলে? মাস ছয়-সাতেক গোলাপট্টিতে থেকে কবি গ্রেস কটেজে আসেন। ঠিক কবে আসেন তিনি? জুলাই, নাকি আগস্ট? কেনই বা এলেন এই বাড়িতে? ভীষণ দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্জন এক প্রান্তে? অনেক কিছুই আমরা জানি না, জানাও যায় না। এখান-ওখান থেকে জোগাড় করা তথ্য আর তার সাথে খানিক অনুমান মিশিয়ে টুকরো কথার কিছু দৃশ্য সাজিয়ে তোলার চেষ্টা এই কাহিনীতে।]


নজরুল-এর সাথে একান্তে 'পল্লী কবি' জসীম উদ্দীন।

পর্ব - ৩৪

মুজফফর আহমদের চোখেমুখে যুগপৎ বিস্ময় এবং উচ্ছ্বাসের প্রকাশ।

- আরে কবি সাহেব! আসুন আসুন!

রাশভারি মুজফফর আহমদের কন্ঠে আনন্দের খবর হলেও উচ্ছ্বাসের প্রকাশ বিরল। তালতলার বাড়িতে 'বিদ্রোহী' কবিতা লেখার পর বিপুল উৎসাহ নিয়ে পড়ে শোনাবার পরেও মুজাফফর সাহেবের প্রায় নির্লিপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখে যথেষ্ট আশাহত এবং ব্যথিত হয়েছিলেন নজরুল - সে কথা এখনও মনে আছে। আজকে তাঁর চোখমুখে উচ্ছ্বাস - একজন বিষাদিত হতাশ মানুষ হঠাৎ কোনো সুসংবাদ শুনলে যেরকম তার মনমরা মুখে আলোর ঝলকানি দেখা যায় - অনেকটা সেইরকম।

- চারিপাশে ব্যাপক মারামারি শুরু হয়েছে, এতক্ষণে নিশ্চয় ঘটনা জেনে গেছেন। শিয়ালদহ স্টেশন লাগোয়া ব্যস্ত হ্যারিসন রোড একেবারে শুনশান। অফিসে কেউ আসেনি। আসার প্রশ্নও ওঠেনা। দরজা লাগিয়ে বসে আছি। স্বাভাবিকভাবেই মনটা খারাপ। মাঝে মাঝে নারায়ে তাকবীর আর ছোটাছুটির আওয়াজ পাচ্ছি। জানালায় উঠে গিয়ে দেখছি - লাঠি আর তরোয়াল নিয়ে রাজাবাজারের দিক থেকে ২০-২৫ জনের দল ছুটছে কলেজ স্ট্রিটের দিকে। আবার ওদিক থেকে কয়েকজন কাউকে ধরাধরি বা কাঁধে করে নিয়ে আসছে, সবার গায়ে রক্ত মাখামাখি। দু-একটা মারাও গেছে মনে হলো। দুদিকে হাত ঝুলছে। সত্যিই খুব একা আর বিষণ্ণ লাগছিল নিজেকে। আপনি আশায় খুব স্বস্তি বোধ করছি।

মুজফফর আহমদের মুখে একনাগাড়ে এতোগুলো কথা এই প্রথম শুনলেন নজরুল। পরিস্থিতি শুনে নিজেও খুব বিচলিত বোধ করলেন।

- হঠাৎ এরকম ঘটনা ঘটে গেল কিভাবে? আমি এতো বছর এপাড়ায় ঘোরাঘুরি করছি। বলতে গেলে আমার সব সাহিত্যবন্ধুই তো হিন্দু। কোথাও এরকম বিদ্বেষ তো কখনো অনুভব করিনি।

- হঠাৎ? হ্যাঁ, তা হঠাৎ বটে। কিন্তু আমার এটা অনুমান ছিল এরকম কিছু হতে পারে। তাছাড়া আপনি কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় যেসব মানুষজনের সাথে ওঠাবসা মেলামেশা করেছেন, তারা তো এসবের মধ্যে জড়িত নেই।

- কেমন যেন বিশ্বাস হতে চাইছে না। আপনার অনুমান ছিল?

- হ্যাঁ। বসুন, আগে একটু চা বসাই। এতক্ষণ স্টোভ জ্বালাইনি। একা একা ইচ্ছেও করেনি। দুপুরে খেতে গিয়ে হোটেলেই খবর শুনলাম - বড়বাজারে হিন্দু-মুসলমানের জোর মারামারি লেগেছে। হোটেলওয়ালাই মনে করিয়ে দিল - রাইতে খাওনের ব্যবস্থা রাইখেন ভাইজান। ব্যাপার ভালা ঠেকছে না। ঝাঁপ বন্ধ কইরাই দিতে হইব। ফেরার সময় চাল ডাল আর আলু এনেছি। তেল নুন যা আছে তা কোনমতে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ছেলেটা না বললে কপালে খাবার জুটত কিনা সন্দেহ।

চায়ের কাপ নিয়ে দুজনে মুখোমুখি বসলেন। 'আমার বারবার মানবেন্দ্রনাথ রায়ের কথা মনে পড়ছে', কথা শুরু করলেন মুজফফর আহমদ, 'মাত্র কয়েকদিন আগেই তিনি বলছিলেন - কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার একটা পটভূমি তৈরি হচ্ছে। হিন্দু মুসলমানে বিভেদ ও দাঙ্গা লাগিয়ে দেবার একটা পরিকল্পনা চলছে, উভয় দিক থেকেই। শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যের যে ক্ষেত্রটা তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে, সেটাকে ধূলিসাৎ করে দেবে। ভারী আশ্চর্য! তাঁর কথা এই কদিনের মধ্যেই এইভাবে অক্ষরে অক্ষরে করে মিলে যাবে ভাবতে পারিনি।

- মানবেন্দ্র রায়? তিনি তো মস্কোতে? কলকাতায় এসেছিলেন? কবে? আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল?

নজরুলের কন্ঠে উত্তেজিত কৌতূহল।

- হ্যাঁ, বেশ কয়েকদিন কলকাতায় ছিলেন। অবশ্যই অত্যন্ত গোপনে। শেষদিকে আমাকে খবর পাঠিয়েছিলেন। অনেক কথা বললেন। লাঙলের পরিবর্তে গণবাণীর ভাবনাকেও উৎসাহিত করলেন - শুধু কৃষকের লাঙলে আটকে থাকলে চলবে না। জুটমিল সহ বিভিন্ন কলকারখানায় লাখে লাখে শ্রমিক কাজ করছে। তাদের শোষণ আরো শোচনীয়। ওদেরও সঙ্গে নিতে হবে। সে যাইহোক, অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতার রাজনীতি ও সমাজজীবনের হালহকিকত যেভাবে তিনি অধ্যয়ন করেছেন, যে দূরদৃষ্টি নিয়ে তিনি ভেতরটা বুঝে নিতে পেরেছেন - আমরা কলকাতায় বসে অতটা আঁচ করতে পারিনি। অবশ্য আমি তো ক'বছর জেলেই ছিলাম, কলকাতা থেকে অনেক দূরে। মাত্র মাস দুই হলো ফিরলাম। যাবার আগে তিনি বললেন - দাশবাবু অর্থাৎ দেশবন্ধু 'বেঙ্গল প্যাক্ট' নামের একটা বারুদের কারখানা রেখে চলে গেলেন। তিনি বেঁচে থাকলে এই বারুদকে হয়তো সামলে রাখতে পারতেন। কিন্তু এখন এই বারুদ বাংলায় আগুন জ্বালাবে তো বটেই, সারা ভারতেই সে আগুনের উত্তাপ ছড়াবে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সর্বহারা শ্রেণীসংগ্রাম।

দেশবন্ধুর কথা উঠলে নজরুলের ভেতরটা দুর্বল হয়ে পড়ে, একটা মর্মপীড়া অনুভব করেন। যদিও বেঙ্গল প্যাক্ট ব্যাপারটা নজরুলের একেবারেই না-পছন্দ। তবু এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটা সুচিন্তিত এবং দৃঢ় প্রচেষ্টা ছিল, সেটা অবশ্যই একটা মহৎ পদক্ষেপ।

- আজকের দাঙ্গার সাথে বেঙ্গল প্যাক্টের কিরকম সম্পর্ক বুঝে উঠতে পারছি না। তাছাড়া আজকে ঠিক কী ঘটেছে সেটা সম্পর্কেও ভালো করে শোনা হয়নি। নজরুলের কণ্ঠে ঔৎসুক্যের প্রকাশ।

- হ্যাঁ, তাইতো। একথা সেকথায় আজকের বিবরণটাই বলা হয়নি। যতটা শুনলাম, সেন্ট্রাল এভিনিউ ধরে হ্যারিসন রোড হয়ে রাজরাজেশ্বরী দেবীর পূজা উপলক্ষে আর্যসমাজীদের এক বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়। বড়বাজারে হ্যারিসন রোডের উপর যে বড় মসজিদ, জুম্মার নামাজ চলাকালীন সেখানে শোভাযাত্রা উপস্থিত হলে মসজিদ থেকে মুসলমানরা বেরিয়ে ব্যান্ড পার্টির বাজনা বন্ধ করতে অনুরোধ করেন। আর্যসমাজীরা তাতে কর্ণপাত না করায় তর্কাতর্কি ধাক্কাধাক্কি থেকে মারপিট শুরু হয়ে যায়। মসজিদের ভেতর থেকে লাঠি আর তরোয়াল নিয়ে কিছু লোক ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদের সঙ্গেও ঝান্ডায় নিশান লাগানো লাঠির অভাব নেই। ভালো রকমেরই মারপিট হয়েছে। দু'চারজন তো মারা গেছে নিশ্চয়। দুই পক্ষ মিলিয়ে ক্ষত-বিক্ষত, হাত-পা ভাঙ্গা, মাথাফাটার সংখ্যা কত হবে বলা মুশকিল। তারপরে তো বুঝতেই পারছেন রাজাবাজার কলুটোলা থেকে মুসলমানরা দফায় দফায় দলে দলে ছুটছে। বড়বাজার ও আশপাশ থেকে বেরিয়েছে অবাঙালি হিন্দুরা। পথচারীর উপর হামলা, মারামারি, দোকানপাট লুঠ এসব উত্তরোত্তর বাড়তে থাকবে।

- রাজরাজেশ্বরী? এতো পুরাণ ঘাঁটাঘাঁটি করেছি, এরকম দেবীর তো নাম শুনিনি। তাছাড়া মসজিদের সামনে দিয়ে জুম্মার সময় ব্যান্ডপার্টি বাজা বাজিয়ে শোভাযাত্রা? আর্যসমাজীদের মধ্যে সাধারণ বোধটুকু জাগ্রত হলো না? অল্প কিছুটা সময় বাজা না বাজালে কী এমন ক্ষতি হতো? আর মসজিদের ভিতরে লাঠি তরোয়ালও রাখা থাকে নাকি?

- কবি সাহেব, আপনি যে আবেগ থেকে মানবিক বোধের কথা ভাবছেন বাস্তব আদৌ তেমন নয়। এরা উভয়পক্ষই জানত যে আজ মসজিদের সামনে দিয়ে শোভাযাত্রা যাবে, মারামারিও হবে। এতক্ষণে নিশ্চয় খেয়াল করেছেন যে, হিন্দু-মুসলমান উভয় পক্ষই কিন্তু অবাঙালী। আর্যসমাজী বলতে মূলত অর্থবান মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের সংগঠন। বড়বাজার তো বটেই, পুরো কলকাতার পাইকারী ব্যবসা একপ্রকার তাদেরই নিয়ন্ত্রণে। অবাঙালি মুসলমানরা মূলত শ্রমিক, কারিগর, টাঙ্গাওয়ালা ছোট দোকানদার ইত্যাদি। তারাও আশেপাশের এলাকাতেই বাস করে। সবাই সবার খবর রাখে। আর ওদের এই বিবাদ তো আজকের নয়। গত সাত-আট বছর ধরে ভিতর ভিতর ওদের বিবাদ আর অদৃশ্য লড়াই চলছে। বারুদ প্রস্তুতই ছিল, আজ সেখানে স্ফুলিঙ্গ পড়েছে। মসজিদের সামনে বাজনা, শোভাযাত্রা একটা উপলক্ষ মাত্র। ঝামেলা আজ না হলে কাল হতো, অন্য শুক্রবারে হতো। দাঙ্গা হতোই। রাজরাজেশ্বরী একটা সুযোগ এনে দিয়েছে মাত্র।

- এইজন্যই কি বলছিলেন আপনার আগে থেকে অনুমান ছিল? কিন্তু আমিও তো বেশ কয়েক বছর এই পাড়াতে কাটালাম, আপনার সঙ্গেই কাটালাম। রাজনীতিতে ধর্ম নিয়ে মারামারি চলছে, বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, দেশবন্ধু সম্প্রীতির চেষ্টা চালাচ্ছেন - এসব তো দেখেছি। কিন্তু খোদ কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় এরকম মারামারি কাটাকাটি, আমি কিন্তু আঁচ পাইনি।

মুজফফর আহমেদ খানিক চুপ করে থেকে বললেন - আগেই বলেছি, আপনি কবি মানুষ। আপনার যে জগতে ঘোরাফেরা, মেলামেশা, সেটা তো পুরোটাই বাঙালি সংস্কৃতি জগত। সেখানে সাম্প্রদায়িকতা আছে, উগ্র ধর্মান্ধতা আছে, কিন্তু এইরকম পথে নেমে মারামারি নেই। সেখানে প্রত্যক্ষ সাম্প্রদায়িকতার আঁচ আপনি সেই ভাবে অনুভব করেননি। করার কথাও নয়। তাছাড়া এই দাঙ্গা কিন্তু নতুন বা আশ্চর্যজনক কিছু নয়, এর বীজ রোপিত হয়ে গিয়েছিল ১৯১৮ সালে। আপনি তখনো কলকাতায় আসেননি। সে বছর একই এলাকায় ব্যাপক দাঙ্গা হয়েছিল। গুলিগোলা চলেছিল। আমি নিজে চোখে দেখেছি। আরও অদ্ভুত শোনাবে - এম এন রায় মহাশয় সেই দাঙ্গা থেকেই ভারতবর্ষে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনকে সংগঠিত করার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন।

- বলেন কী? নজরুলের চোখে বিস্ময়। এ তো রহস্য কাহিনীর মতো ব্যাপার! দাঙ্গা থেকে প্রেরণা লাভ?

মুজফফর আহমদ একটু হেসে বললেন, তা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যাপারটা খুব সহজ। সেবারে দাঙ্গাটা হিন্দু-মুসলমানে হলেও লড়াইটা মূলত ছিল মালিক শ্রেণির ব্যবসায়ী মাড়োয়ারি গোষ্ঠীর সাথে বস্তিবাসী দরিদ্র শ্রমিক মুটে-মজুরদের। এই শ্রমিকদের দলে অবাঙালি হিন্দুরাও মুসলমানদের সঙ্গে ছিল। সুতরাং এই দাঙ্গাকে একদিক দিয়ে শ্রেনীসংগ্রাম বলে ভাবাই যায়।

- সাম্প্রদায়িক মারামারি, অথচ হিন্দু লড়ছে হিন্দুর বিরুদ্ধে?

- সেসব অনেক কথা। চলুন আগে স্টোভটা জ্বালাই। রাতের আহারের কিছু বন্দোবস্ত করা যায় কিনা দেখা যাক, তারপর নাহয় শোনা যাবে সেসব কাহিনী। কালকেও কেমন পরিস্থিতি থাকবে, ঘর থেকে আদৌ বেরোনো যাবে কিনা বলা মুশকিল। হয়ত এভাবেই আমাদের গল্প করে কাটাতে হবে।

হিন্দু মুসলমানের উভয় পক্ষেই ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির বাড়বাড়ন্তের খবর নজরুলের অজানা অচেনা নয়। সবার উপরে মানুষ সত্য এই বোধ তাঁর সেই ছোটোবেলা থেকেই মনের ভিতর অজান্তে বিকশিত হয়ে গিয়েছে। যে ধর্মীয় বোধ এবং আচার মানুষের কল্যাণ করে না তা কখনো সঠিক ধর্ম হতে পারে না, তা সে যে কেতাব-গ্রন্থেই লেখা থাক - চুরুলিয়ার পীরের মাজারে দু'বেলা সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের আনাগোনা দেখতে দেখতে কিংবা লেটোদলে নানান ধর্মকথা নিয়ে গান শুনতে শুনতে সেই অনুভূতি তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে গিয়েছে। সেই মন্ত্রকে সামনে রেখেই মাস তিনেক আগে সাম্যবাদী'র অতগুলো কবিতা একটানা লিখে ফেলতে পেরেছেন। 'মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো' - এইরকম দুঃসাহসী লাইন লিখেছেন। সাম্যবাদী'র বিভিন্ন কবিতা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানান সমালোচনা ব্যঙ্গ আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছে। তথাকথিত উদার প্রগতিশীল 'প্রবাসী' পত্রিকা ও তার সহচর 'শনিবারের চিঠি' বারাঙ্গনাকে মা বলে সম্বোধন করা নিয়ে প্রচুর গালাগাল দিয়েছে। ওতে নাকি মাতৃজাতির অবমাননা হয়েছে। ওদিকে ছোলতান, মোহাম্মদী পত্রিকা গোষ্ঠী আলেম-উলেমা মৌলানাদের অবমাননা হয়েছে বলে ক্ষুব্ধ। নজরুল এখন আর গায়ে মাখেন না। নিজের কাছে নিজের বোধের প্রতি, নিজের অনুভবের প্রতি সততা বজায় রেখেই তিনি সবার উপরে মানুষের জয়গান গেয়েছেন, সর্বাহারা নিপীড়িতদের পক্ষে কথা বলেছেন, নারীর মানবিক স্বাধীনতার কথা সোচ্চারে বলেছেন - এটাই তাঁর নিজের সসন্তুষ্টি। আচারনিষ্ঠ ধর্মের বাড়াবাড়িকে আঘাত করে কিভাবে হিন্দু-মুসলমানকে কাছাকাছি আনা যায়, সম্প্রদায়গত বিভেদ ভুলিয়ে কিভাবে ধর্মীয় পরিচয় অপেক্ষা মানুষের পরিচয়কে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা যায় তাই নিয়ে ভেবেছেন, লিখেছেন, বলেছেন। কিন্তু আজ মুজফফর আহমদের বিবরণ ও বিশ্লেষণ শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল বাস্তবের সাম্প্রদায়িকতা আরও জটিল অংক কষে চলে। রুটি-রুজি রোজগারের ক্ষেত্রে মানুষকে ধর্ম ভুলিয়ে দেয় - হিন্দু-মুসলমান একসাথে শোষকের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং - এটাই তো কাম্য ছিল! এটাই তো প্রকৃত মুক্তির সংগ্রাম!

মুজফফর আহমদ শোনালেন - না, সেই অংক বেশিদিন চলে না। সাম্প্রদায়িকতার শিকড় অনেক গভীর, অনেক তার বিস্তার। হ্যাঁ, ১৯১৮ সালের প্রেক্ষিত অনেকটা সেইরকম ছিল। তার যথেষ্ট কারণও ছিল। আপনি তো ভালোই জানেন, কলকাতার ব্যবসাকেন্দ্র বড়বাজার, আর বড়বাজারের মার্কেট পুরোটা ধনিক মাড়োয়ারিদের কুক্ষিগত। আর কে না জানে, দেশে চিরকাল জগতশেঠরাই নবাবদের নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। ১৯১৮ সালে প্রশাসনিক উদ্যোগে কলকাতা কর্পোরেশন বেশ কয়েকটি এলাকায় বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করে। নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য এবং নগরের সৌন্দর্য রক্ষার জন্য রাস্তার ধারে ও আনাচে-কানাচে বেআইনী ঝুপড়ি উচ্ছেদ করাই উচিত। কর্পোরেশন যেসব এলাকায় ঝুপড়ি-বস্তি উচ্ছেদ সংঘটিত করেছিল - যেমন কালিঙ্গা বস্তি, বর্মন বস্তি, পার্ক স্ট্রিট, পার্ক সার্কাস লাগোয়া বিভিন্ন বস্তিগুলিতে ছিল মুখ্যত বিহার ও যুক্তপ্রদেশ থেকে আসা দরিদ্র অবাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের বসবাস। বর্মন বস্তিতে হিন্দু ও মুসলমান পরিবারের সংখ্যা ছিল প্রায় আধাআধি। পাশাপাশি ঝুপড়ি বানিয়ে পরিবার নিয়ে বছরের পর বছর বাস করে আসছিল। এক ধাক্কায় সবার মাথার উপর থেকে ছাদ হারিয়ে প্রকৃত অর্থেই তারা বিভিন্ন ফুটপাতে চরম বিপর্যয় মাথায় নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে বেড়ালো। এটা তো জানেন যে নিরামিষাশী মাড়োয়ারিরা গরু খাওয়া মুসলমানদের বেশ ঘৃণার চোখে দেখত। তাদের গদিতে মজুর খাটা, আশেপাশে থাকা দর্জি, টাঙাওয়ালা প্রভৃতি মুসলমানদের সাথে অচ্ছুৎ ও ইতর শ্রেণীর মতো ব্যবহার করত। এর জন্য মুসলমানদের তো এমনিতেই মাড়োয়ারীদের প্রতি ঘৃণা আর রাগ ছিল। সেটা আরও ব্যাপক রোষানলে পরিণত হলো যখন কিছু প্রভাবশালী অর্থবান মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী, সাংবাদিকতা করতে গিয়ে কিছু নাম আমারও মনে আছে যেমন - রামপ্রতাপ ভিমানী, বলদেও দাস বিড়লা, যুগলকিশোর বিড়লা প্রমুখ কয়েকজন জাকারিয়া স্ট্রিটের আশেপাশে উচ্ছেদকৃত বস্তির জমিগুলি সরকারের কাছ থেকে নামমাত্র দামে কিনে বা লিজ নিয়ে নিজেদের বসবাসের জন্য বড় বড় প্রাসাদ তৈরি করতে লাগলো। নিজেদের মাথার উপর থেকে ছাদ কেড়ে নেওয়া বস্তিবাসীর বিক্ষোভ তো ছিলই - সেপ্টেম্বর মাসে কিছু খুচরো ঝামেলাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ বড়ো আকারে ছড়িয়ে পড়ল। প্রথমে ক্ষোভের অভিমুখ কিন্তু ছিল সরকারের বিরুদ্ধে। ৯ তারিখে মুসলমানদের নেতৃত্বে বস্তিবাসিরা একটা বিশাল মিছিল নিয়ে রাজভবনের অভিমুখে বিক্ষোভ অভিযান সংগঠিত করে।

- সাধারণ বস্তিবাসীরা এরকম পরিকল্পিত ভাবে মিছিল এবং রাজভবন অভিযান সংঘটিত করে ফেলল? এটা যেন কেমন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। নজরুলের কৌতুহলী জিজ্ঞাসা।

- আপনি ঠিকই ধরেছেন। মুজফফর আহমদ ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন। বঙ্গভঙ্গ রদের পর থেকে বেশকিছু মুসলিম নেতার উত্থান হয়েছিল যারা এটাকে মুসলমান বিরোধী কাজ বলে প্রচার করতেন। সরকারের পাশাপাশি এদের প্রচার ও আক্রমণের লক্ষ্য ছিল কলকাতার হিন্দু বাবু শ্রেনী এবং মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের দিকে। কলকাতার অনেক ধনাঢ্য প্রতিষ্ঠিত বাবুদের জমিদারি ছিল পূর্ববঙ্গে, সেটাও একটা হিন্দু বিরোধিতার অন্যতম কারণ। অপরদিকে কিছু মুসলিম ব্যবসায়ী পরিবার নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রতিযোগী মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে লোক খেপানোর ইন্ধন দিতেন, নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অর্থের যোগান দিতেন। মৌলভী নাজিম উদ্দিন আহমেদ, ফজলুর রহমান, মহম্মদ দাউদ প্রমুখ নেতারা সক্রিয় ভাবে বস্তিবাসীদের সংগঠিত করার পিছনে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন মসজিদে শুক্রবারের খুৎবার সময় পরিকল্পিত ভাবে মুসলমানদের খেপিয়ে তোলা হতো। এসব মুসলমান নেতারা মুখ্যত সবাই উর্দুভাষী অবাঙালি। মুসলমানদের নেতৃত্বে মিছিল, রাজভবন অভিযান ইত্যাদি সরকার বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হলেও মাড়োয়ারীদের একটা ভুল পদক্ষেপে ব্যাপারটা মুহুর্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দিকে ঘুরে যায়। মিছিলে পুলিশের আক্রমণে ছত্রভঙ্গ জনতা দোকানপাট ভাঙচুর আর লুঠপাট শুরু করলে জাকারিয়া স্ট্রিটের একটা মাড়োয়ারি ভবন থেকে গুলি ছোড়া হয়, তাতে একজন মুসলমানের মৃত্যু হয়। এতে মুসলমানরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, চারিদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে। জাকারিয়া স্ট্রিটের বড়ো বাড়িগুলোর দিকে ইঁট-পাটকেল ছোঁড়া শুরু হয়। ভিতর থেকে আবারও গুলি চলে, আরো দু-একজন মারা যায়। গোটা কলকাতার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। তিন দিন ধরে ব্যাপক অরাজকতা চলে। সরকারি হিসেবে ৪৩ জন নাগরিকের মৃত্যু ঘটে। এর মধ্যে ৩৬ জন মুসলমান ৭ জন হিন্দু। উল্লেখ্য এই মৃত হিন্দু বা মুসলমানদের ভিতর একজনও বাঙালি ছিল না। বাঙালি হিন্দু-মুসলমান কেউ এদের ভিতর জড়ায়নি - ১৯১৮ সালের দাঙ্গার এটা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

- এখনও কি সেই পরিবেশ আছে? পত্র-পত্রিকায় মৌলবাদীদের ধর্মকেন্দ্রিক যেরকম হুংকার দেখি তাতে তো মনে হয় বাঙালিরা অবাঙালিকেও ছাপিয়ে যাবে। নজরুল হতাশ ভঙ্গিতে বললেন। সেটা আমারও মনে হয়। বিশেষ করে দেশবন্ধুর প্রয়াণের পর কংগ্রেসী, এমনকি স্বরাজ্য দলের লোকজনের মুখ থেকেও যেরকম বাণী উচ্চারিত হচ্ছে তাতে এই বিভাজন স্পষ্ট বোঝা যায়। ১৯১৮ সালের সেই পরিবেশ আর নেই, বিষিয়ে দেওয়া হয়েছে। হিন্দু মহাসভার লোকেরা লিফলেট বিলি করে হিন্দু জাগরণের আহ্বান ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। খেয়াল করে দেখুন - মুসলমানরাই অগ্রণী হয়ে বিক্ষোভ, আক্রমণ ও দাঙ্গা শুরু করল, কিন্তু ওরাই মরেছে বেশি, ৩৭ জন। অর্থাৎ খেপিয়ে তোলা সহজ হলেও শক্তিতে ওরা দুর্বল। আজ বড়বাজারে মসজিদের সামনে রাজরাজেশ্বরীকে কেন্দ্র করে দুই অবাঙালি গোষ্ঠীর মধ্যে যে মারামারি লেগেছে, এবারে তা অবাঙালিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে হয়না। পরিস্থিতি এখন অনেক বদলেছে।

- কিন্তু আঠারো সালের দাঙ্গা থেকে এম এন রায় সাহেব কিভাবে প্রেরণা পেলেন সেটা এখনো স্পষ্ট হলোনা। নজরুল যেন শ্রেণীসংগ্রামের উৎস এবং তার রূপটি কিরকম ছিল এখনো সেটি জানবার প্রতীক্ষায় ছিলেন।

- আপনি নিজেই এতক্ষণে হয়ত এর কারণ অনুমান করে নিতে পেরেছেন, মুজফফর আহমদ বললেন। কারণ তো যথেষ্টই ছিল। ১৯১৮ সালের দাঙ্গা, মিছিল, ধর্মঘট মাত্র তিন দিনের মধ্যেই পুলিশ ও মিলিটারি বাহিনী সামলে দিয়েছিল। কিন্তু ৯ তারিখে রাজভবন অভিযানে পুলিশি আক্রমণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যাপক শ্রমিক বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। পর দিনেই, অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর গার্ডেনরিচের তিনটি কারখানায় প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ না দিয়ে ধর্মঘট পালন করে। হাজার দু'য়েক মানুষ লাঠি তরোয়াল নিয়ে মিছিল করে কলকাতার দিকে অগ্রসর হলে সেনাবাহিনী গুলি চালায়। ১৪ জন শ্রমিক সেখানেই মারা যায়। হাওড়ার বিভিন্ন জুট মিলে, বেলেঘাটা, মেটিয়াবুরুজ প্রভৃতি এলাকাতেও বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, এসব শ্রমিকদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান উভয়ই ছিল - কিন্তু বাঙালির সংখ্যা ছিল খুবই কম। ধর্মনির্বিশেষে শ্রমিক শ্রেণীর এই যে জাগরণ - এটাই তো রুশ বিপ্লবের পূর্ব লক্ষণ! এম এন রায় সাহেব তারই স্বপ্ন দেখা শুরু করে দিয়েছিলেন।

 

(ক্রমশ)

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।