বিবিধ

গ্রামের নাম গাববেড়িয়া (প্রথম পর্ব)



চিরঞ্জীব হালদার


[আত্মজৈবনিক কিছু বলার স্পর্ধা নিয়ে এই পর্ব শুরু। কতটা মনোগ্রাহী হবে জানিনা। অনেকদিন ধরে কিছু ঘটনা নিজের ভেতর ক্রমাগত হাডুডু খেলা শুরু করেছে। অব্যক্ত সত্যি ঘটনা গুলো বলার একটা তাগিদ ভেতর থেকে অনেককাল উথালপাতাল করছে। লিখব লিখব করে লেখা হয়ে ওঠেনি। নিয়মিত কবিতা লেখার ফাঁকে এই লিখন কর্ম আলাদা এক মনোযোগের দাবি করে।সেই দাবি কতটা মেটাতে পারবো জানা নেই। সব থেকে বড় কথা আমার মত অখ্যাত অনামী লোকের পক্ষে কতটা ভালো হবে তাও জানা নেই। আদৌ সাহিত্যের অঙ্গনে এর কোন স্থান হবে কিনা তাও অজানা। "চেষ্টা করতে দোষ কি" এই আপ্তবাক্য মাথায় রেখে নিজস্ব জীবনের কিছু ঘটনা নথিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছি।]

আমার জন্ম হয়েছিল মামার বাড়িতে। ১৯৬১ সালে। মামা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার, সেই সঙ্গে প্রাইমারি শিক্ষক ছিলেন। আমরা ছয় ভাই বোন। আমি মেজ। উপরে বড় দিদি। সেজো মামিমার একটি ডাইরি ছিল। সেখানে জন্ম সাল লেখা ছিল ১৯৬১ সালের ২০ সেপ্টেম্বরে বুধবার। রাত ১১:৫৩। আমার জন্মের পাশে লেখাটা জ্বলজ্বল করত। যদিও প্রাইমারি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণী উত্তীর্ণ হওয়ার সময় একটু বয়স কমিয়ে ১৯৬৩-র ৯ই সেপ্টেম্বর লেখা হয় স্কুল সার্টিফিকেটে। তখন আমাকে বড় স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। আমার জন্মের সেই লিখনমালা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

আজ আর মামারা কেহ বেঁচে নেই। মামার সাথে সাথে সেই অগোছালো বইয়ের আলমারিরও পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটেছে।

আমাদের মাটির কাঁচা পাকা দোতলা বাড়িটা একেবারে গ্রামের মধ্যস্থলে। এমন মাটির দেতলা এই গ্রামে আরো দু'এক ঘর ছিল। সেই সময়ে বাড়ির ভিত কংক্রিট দেওয়া, মাটির ছাদ আর খড়ের ছাউনী। দোতালার এমাথা ওমাথা টানা সর্দোল, বয়স্ক তালকাঠের। শুনেছি ঠাকুর্দা করাত কলে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাঠ চেরাই করেন।

পাশের গ্রামের লোকদেবতা বামুনগাজি থানে যেতে গেলে এই বাড়ীটার নজর এড়ানো মুশকিল।

শনি মঙ্গল বারে অনেক পুণ্যার্থী এই বাড়িটি দেখতে দেখতে অনেকেই রাস্তায় হোঁচট খেয়েছেন।এই বাড়িটির সামনে মস্ত বড় এক পুকুর। নাম ঘোষপুকুর। একেবারে শান্ত স্থীতধি। যেটার মালিকানা এখনও বামুনদের।

এই গ্রাম একসময় সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের জমিদারির অংশ ছিল। পরবর্তীকালে ঘোষেদের তত্ত্বাবধানে বামুনেরা সেবাইত হিসেবে এই পুকুরের মালিকানা স্বত্ব পায়। প্রখ্যাত অপেশাদার যাত্রাশিল্পী সত্যেন মুখার্জি এই গ্রামে এখনো পর্যন্ত বয়স্ক ব্যক্তি। এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই গ্রামটি বেশ বর্ধিষ্ণু। শিক্ষার হার চোখে পড়ার মত। উত্তরে গ্রামের প্রবেশপথে এখন স্কুল শতবর্ষের তোরণটি আপনাকে স্বাগত জানাবে। ২০১৬ সালে তার কলেবর এক চমকপ্রদ মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

লক্ষীকান্তপুর স্টেশন থেকে কুলপি রোড ধরে দু' কিলোমিটার এগোলে দয়ারামপুর মোড়। সেখান থেকে সোজা গ্রামীণ সড়ক ধরে দক্ষিণ বরাবর এগোলে যেখানে রাস্তাটা ডানদিকে বাঁক নিয়ে বামুনগাছি চলে গেছে ঠিক সেইখানে পুকুরের অবস্থান। আমাদের বাড়িটা ঠিক এই পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে। রাস্তার উপর। পূব দিকে ভুতোবামনের তিনতলার অট্টালিকা। উত্তরে ধোবাদের বাস। আর পশ্চিমে স্থানীয় স্বনামধন্য বামুনপাড়া। এই পুকুরের পূর্ব পাড় বরাবর প্রাইমারি স্কুল। যেখানে আমার অবৈতনিক প্রাথমিক পাঠ সম্পন্ন হয়। পূর্ব-পশ্চিমে বামনদের বদান্যতায় ও হালদার বাড়ির কিছু মানুষের সদিচ্ছায় গ্রামীণ পাঠাগার রয়েছে। যার বয়স ৯২ বছর পার করেছে। গ্রামের বর্তমান রাস্তাটি পাঠাগার সংলগ্ন মূল রাস্তার উপর। আজ পাঠাগার ও ডাকঘরটি একই ছাদের তলায় অবস্থান করেছে। ১৯৮৪ সালে সত্যেন মুখার্জি ও রেবতিরমন হালদারের মুখ্য পরিচালনায় সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে আমার কিছু ভূমিকা ছিল। সে প্রসঙ্গে পরে বলা যাবে।

আমার আগের তৃতীয় প্রজন্মের গ্রামের মোড়ল বামনপাড়ার অক্ষয় দাদুকে দেখেছি। বেশ বর্ধিষ্ণু পরিবার। এই পশ্চিম পাড়ে এনাদের চালু করা পয়লা বৈশাখের গোষ্ঠ মেলা আজো টিমটিম করে চালু আছে। গোষ্ঠ মেলার মূল কেন্দ্রে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সিমেন্টের বাঁধানো দুটি বটগাছ অশ্বথগাছ বর্তমান। বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক দশায় আজ আর তেমন যৌবনবতী নয়। এক সময় এই গাছ দুটি ছিল মহীরুহ। চারপাশে বাজার বসত। সেই বাজারটি এখন ঘোষ পুকুরে পূর্ব-পশ্চিম কোণে সরে এসেছে। রাস্তার দু'পাশে তার দোকান পাঠ। একটু ভিতরে মাছ বাজার।

আগের বাজারে মনে বটতলায় মাছ বাজার থেকে মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরা খুব চাপের ছিল। আমার হাতে বাজারের থলেটি অনেকবার চিলের ছোঁয়া পেয়েছে। এমন ও হয়েছে বাজার থেকে তেলে ভাজা খেতে খেতে ফেরার পথে চিলের নোখের অতর্কিত ছোঁয়ায় মুখে আঘাত পেয়েছে অনেকেই। পাশেই ক্যাবলা ডাক্তারের ডিসপেনসারি। বামুনপাড়ার জীবনকাকুদের বৈঠকখানায়। একেবারে বটতলার লাগোয়া।

এই গ্রামের অনেকগুলো পাড়া। বামুন পাড়া, ধোবা পাড়া, শিউলি পাড়া কয়াল পাড়া, কুমোর পাড়া ও আরো অনেক পাড়ার সাথে গ্রামের দক্ষিণে বাজার পাড়া। এই বাজার পাড়াটি চালু হয় ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি। পরে সেটা বটতলায় ও এখন সর্বশেষ অবস্থান ঘোষপুকুরে পূর্ব-পশ্চিম কোন জুড়ে। মুসলিম সম্প্রদায়ের বাস এই গ্রামের একেবারে পশ্চিম দিকে। আমাদের সময় এই মল্লিক পাড়াটি একেবারে বিচ্ছিন্ন, কিন্তু গ্রাম লাগোয়া। ডাক মধু গাববেরিয়া। গ্রামের পূর্বদিকে সিকি গাববেরিয়া বলে আরেকটি অংশ আছে। তার পূর্ব দিকে ঢোলা সড়ক। যেটি কুল্পী সড়কের পোলের হাট থেকে সোজা দক্ষিণে চলে গেছে।

আমাদের পাশের বাড়ি ছিল খুড়তুতো দাদুর। খুব আবছা মনে পড়ে এই গ্রামের শখের যাত্রাপালার সাজসজ্জা থাকতো ওই দাদুর বাড়িতে।সেই কুঠি ঘরে ঢাল, তরোয়াল, বল্লম, রাজার পোশাক আরো কত কিছু টিনের ঢাউস বাক্সে রাখা থাকতো। তালা ছাড়াই। খুব ছোটবেলায় চার পাঁচ বছর হবে মায়ের কোলে হালদারবাটির দুর্গামন্ডপে যাত্রাপালার কনসার্ট শুনতে শুনতে ঘুমিয়েছি। আমার খুড়তুতো দাদু ছিলেন এই যাত্রাপালা আধিকারিক গোছের। সেসময় হয়তো তিনি কোন মেয়ের চরিত্রে অভিনয়ও করছেন। আজ আর কেহ বেঁচে নেই যাদের থেকে সত্যাসত্য যাচাই করা যায়। এই গ্রামের উচ্চশিক্ষিত মান্যগণ্যরা সবাই হয় বারুইপুর নয় সোনারপুর অথবা মহানগরের বাসিন্দা।

একমাত্র সত্যেন মুখার্জি তার ভদ্রাসনে টিমটিমে লন্ঠন জ্বালিয়ে দিনাতিপাত করেন।

(ক্রমশ)