বিবিধ

ছায়ার সন্ধান



অভিজিৎ রায়


রাতের আলোর গান বেজে ওঠে সকালের অন্ধকারে। দূর থেকে ভেসে আসা আজানের সুরে ধূপের গন্ধের ছোঁয়া লাগে। স্নানঘরে গান জেগে ওঠে। আমারও পরাণ যাহা চায়...। আলোর পরাণে অন্ধকার ঠিক কী চায়? কিছু কি চায়?

চেনা পায়রা এসে জানলায় বসে বকমবকম শুরু করে। অন্ধকারের দেহের ব্যথা সেরে যায়। সে আলোকে ডেকে নিয়ে এসে বারান্দায় বসে। পাশের বাড়ির রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত বাজে। সকালের কাজে বাজারের ব্যাগ হাত বাড়িয়ে নিয়ে ঘর ছাড়ে জীবন। দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে আধখানা খালি ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি ফেরে। ডালে তখন ফোড়ন পড়েছে। কাশতে কাশতে বাথরুমে ঢুকে সেও একটু হিন্দি গানের কলি গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে। ইয়ে জীবন হ্যায়...।

ব্যস্ততায় চশমা, গাড়ির চাবি, রুমাল আর মোজা হারানো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। রুটিনের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি জীবন যন্ত্র হয়ে ওঠে। শরীর যেমন যন্ত্রের মতন সাড়া দেয় রাতের আলোয়, তেমনই দিনের অন্ধকার শুধু নিরাপত্তার উপার্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অবসরে মস্তিষ্কের কাজ বাড়ে। সে শুধু ভাবে আর ভাবনার ভারে ক্লান্তির ওজন বাড়ে। ক্লান্তিকর ব্যস্ততার মাঝে জীবনের দায় বৃদ্ধি পায়, দায়িত্বও। প্রতিটি ডাকে সাড়া দেওয়াও যেন সেই দায় আর দায়িত্বের অংশ। জীবন এসব ভাবতে ভাবতেই কাজের বাজারে ঢুকে পড়ে। লাভ-ক্ষতি, বেতন বৃদ্ধি, পাওনা-গণ্ডা, ধার দেনা, ইএমআই অথবা ডি.এ-'র বাইরে বেরিয়ে একটা ছক্কা হাঁকানোর শখ তার। কিন্তু মগ্নতার বড় অভাব। গ্রীষ্মকালে ডাব আর শীতকালে উষ্ণতার অভাবে মধ্যবিত্তের জীবন হাঁপিয়ে ওঠে। চৌকাঠ পেরিয়ে অন্যঘরের অন্দরমহলে উঁকিঝুঁকি মারার ইচ্ছেগুলো হঠাৎ করেই আতসবাজি হয়ে রাতগুলোকে দিন করে দেয়।

সে আলোয় জীবনের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কখনও সে অন্ধও হয়ে যায়।

অন্ধের কিবা দিন, কিবা রাত! রাতের আলো ও সকালের অন্ধকার বৃথা মুগ্ধতার দাবি জানিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে মৃত্যুর কোলে। জীবনের কানের কাছে বাজতে থাকে --- সুরমাই আঁখিও মেঁ নানহা-মুন্না এক স্বপ্না দে যা রে...।

জীবনের স্বপ্ন আর স্বপ্নের জীবন এক নয়। এক জীবন আস্তিকের আর অন্যটা নাস্তিকের। দ্বিধার দ্বন্দ্ব অথবা দ্বন্দ্বের দ্বিধা জীবনের সঙ্গে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি করতে চায় কিন্তু পারে না। আপোষহীন সন্ধ্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক জীবন আর এক মৃত্যু রাত আর সকালের চাওয়া, পাওয়ার হিসাব কষতে থাকে। আর, এত কিছুর ফাঁকে ভাঁড়ার ঘরের চাল কমে যায়। কমে যায় ব্যাঙ্কের সেভিংস একাউন্টের ব্যালান্স।

ভারসাম্য যত কমে ততই জীবন বিপদে পড়ে। অবসরে কাজের ভারসাম্য হোক অথবা বাঁচার আনন্দে শোকের ভারসাম্য, মৃত্যু শেষ পর্যন্ত মুক্তির কথা বলে। জীবন কি আদৌ মুক্তি চায়? নাকি রাতের আলো আর সকালের অন্ধকারে হাতড়ে বাঁচাই তার মুক্তি?

সব উত্তরের শেষে একটা প্রশ্নের শুরু করার নামই জীবন। এই গোলক ধাঁধায় ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দু'একজনেরই মেলে। তাই আলো, অন্ধকার ফেলে আমরা ছায়ার সন্ধানে ছুটে বেড়াই। যেমন এতক্ষণ ধরে এই দৌড়াদৌড়িতে ক্লান্ত হয়ে পড়া জীবন এখন স্বপ্নের ছায়ায় ঘুমাতে চায়। অন্যথায় রাতের আলো বা সকালের অন্ধকার দেখার সুযোগ তার হবে না।